লালন শাহ ও তাঁর গান
লালন
শাহ ও তাঁর গান
লালন
শাহ ছিলেন সুরের বাউল। তিনি ছিলেন এক অনন্যসাধারণ প্রতিভা। তিনি একাধারে কবি, সুরকার ও
গায়ক। তিনি গান রচনা করেছেন। সে গানের তিনি সুর দিয়েছেন। আর নিজের কণ্ঠে গেয়ে
মানুষকে শুনিয়েছেন।
সংগীত
জগতে লালনের অবদান তুলনাবিহীন। তিনি যে সকল গান গাইতেন তার নাম বাউল। বাউল গান
মূলত ভাব ও তত্ত্ব প্রধান। বাউল গানে নিজের মাঝে নিজেকে আপন করে পাবার একটা
ভাব রয়েছে। লালনের মনও সেই মানুষের খোঁজ করেছে। আর এই মনের মানুষই তাঁকে ভাবুক
করেছে। তাঁর রচিত গানে সেই ভাবেরই প্রতিফলন ঘটেছে। তাই বাউল গান ‘ভাবগান’ নামেও
পরিচিত।
লালনের
গান সংগীত জগতের এক অভিনব সৃষ্টি। তাঁর গানের সুরে দৈন্য নেই। তাঁর গানগুলো একটি
বিশেষ ঠাঁটে বা ঢংয়ে রচিত। গানের সুরের মধ্যে একটি বৈচিত্র্য রয়েছে। তাঁ গান
ভাবপ্রধান হলেও সুর ও তালের মিলনে এই গান সত্যি অপূর্ব। তাঁর গানে রয়েছে ভক্তিরসের
আবেশ। রয়েছে বিহ্বলতা। এই বিহ্বলতা শুধু গায়ক নয়,
শ্রোতার মনেও শিহরণ তোলে। গায়ক যখন তন্ময় হয়ে গান গায় শ্রোতা তখন বিহ্বল হয়ে শোনে। তাঁর গানে বাংলার সোঁদা মাটির গন্ধ রয়েছে। মানুষের মনের সুর
ব্যক্ত হয়েছে। তাঁর গান তাই মানুষকে অভিভূত করে, মানুষের
হৃদয়কে বিগলিত করে।
লালনের
গান তত্ত্ববহুল। তাঁর গানের মূল বিষয় দেহতত্ত্ব ও আত্মতত্ত্ব। তাঁর গান সাধন-সংগীত। তাই এর ভাব অস্পষ্ট। গানে একটা আলো-আঁধারের খেলা
বিদ্যমান।
লালনের
গানে সুফি ও দেশজ ভাব রয়েছে। সুফিরা সংগীত ভালোবাসতেন। সংগীতের ভিতর দিয়ে তাঁরা
নিজেদের মনের ভাব প্রকাশ করতেন। সংগীতের অসীম ক্ষমতার কথা তাঁরা বিশ্বাস করতেন। সংগীত যেন পাথরে লুকানো আগুন। পাথরে পাথরে ঘষলে আগুন বের হয়।
সংগীতও তেমনসি একরকমের পাথার। আত্মার সঙ্গে ঘষা লাগলেই আগুন জ্বলে ওঠে। সোনা আগুনে পুড়ে বিশুদ্ধ হয়। তেমনি সংগীতের আগুনে হৃদয় হয়ে ওঠে
আয়না। আর সেই আয়নায় জগতের সৌন্দর্য ধরা পড়ে। তাই সুফিদের কাছে সংগীতের কদর ছিল
অসামান্য। লালন শাহ এই সংগীতেরই সাধনা করেছেন।
উচ্চাঙ্গ
সংগীতের সঙ্গে বাউল গানের পার্থক্য রয়েছে। উচ্চাঙ্গ গানে অনেক কারুকার্য আছে। বাউল
গানে সে রকম নেই। উচ্চাঙ্গ সংগীতে আছে সুরের যাদু আর বাউল গানে আছে সুর, বাণী ও
ভাবের মায়াজাল। বাউল গান মানুষের প্রাণ ব্যাকুল করে তোলে। বাউল গানের সাধনা
মানুষের মধ্যে একাগ্রতা আনে। উচ্চাঙ্গ সংগীত সুরপ্রধান, কিন্তু
বাউল গান বাণীপ্রধান।
লালনের
গানে বাউলের এই তিনটি বিশেষত্বের মহামিলন ঘটেছে। তাঁর গানের বাণীতে মানুষ মোহমুগ্ধ
হয়েছে। তাঁর গানের সুরে হয়েছে অভিভূত। তাঁর গানের ভাবে হয়েছে মন্ত্রমুগ্ধ। লালনের গানের ভাব পরমাত্মা আল্লাহ্-রাসূলকে
কেন্দ্র করে আবর্তিত।
লালনের
গানে কয়েকটি বৈশিষ্ট্য রয়েছে। প্রতি গানে একটি পদবিন্যাস রয়েছে। এই বিশেষ পদগুলো
সমগ্র গানের মধ্যে কয়েকবার গীত গয়। তাঁর গানের বাঁধুনি অত্যন্ত সরল।
লালনের
গানে রয়েছে একটা মুক্তির ভাব। লালন হৃদয়ের কবি। সীমা ও অসীমের মিলন ঘটেছে তাঁর
হৃদয়ে। তাই লালন একটি বিশেষ ধারার কবি। তিনি একধারে সাধক, কবি এবং
অন্যধারে গায়ক। তাই তাঁকে ‘কবি-গায়ক’ বলা চলে। আবার তাঁকে বাউল ‘কবিগুরু’ বলা চলে।
লালন নিজের
হাতে কিছু লিখতেন না। তিনি মুখে মুখে রচনা করতেন। সাথে সাথে তাতে সুর সংযোজন
করতেন। শিষ্যরা সেই গান মুখস্থ করে নিতেন। তবে তাঁর বেশির ভাগ গানই মানিক পণ্ডিত নামে এক শিষ্য লিখে রাখতেন। শিষ্যের মানিক পণ্ডিত নামটিও
লালনই দিয়েছিলেন।
লালন
শাহকে পারস্যের কবি মওলানা রুমীর সঙ্গে তুলনা করা চলে। লালন রুমীর মতোই মরমী সাধক
ও রুমীর মতোই কবি ছিলেন।
লালনকে
বাংলা সাহিত্যে-গজল গীতির আদি গুরু বলা যেতে পারে।
আসলে লালন-গীতি ফারসী গজল-গীতিরই নামান্তর। এদিক দিয়ে তিনি ফারসী কবি হাফিজ, খৈয়াম ও
রুমীর ওয়ারিস। তেমনি গজল গানে নজরুল ইসলামও লালনের ওয়ারিস। আবার বাউল গীতিতে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লানের ওয়ারিস। তাই রবীন্দ্রনাথ রহস্য করে নিজেকে ‘রবীন্দ্র
বাউল’ বলে পরিচয় দিয়েছেন। রবীন্দ্রনাথ নিজেই স্বীকার করেছেন-‘আমার অনেক গানেই আমি
বাউলের সুর গ্রহণ করেছি এবং অনেক গানে অন্য রাগরাগিণীর সঙ্গে আমার জ্ঞাত বা
অজ্ঞাতসারে বাউল সুরের মিলন ঘটেছে।’ রবীন্দ্রনাথ তাই লালন শাহর নিকট ঋণী। তিনি
লালনের গানের দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। আবার নজরুল ইসলামের গজলেও লালন
শাহর সুর ও বাণীর মিলন ঘটেছে। রবীন্দ্রনাথ লালনকে সুধী সমাজের সঙ্গে পরিচয়
করিয়েছিলেন। তিনি লালনের ছেঁউড়িয়ার আখড়া থেকে একটি গানের খাতা সংগ্রহ করেন। তা
থেকে কুড়িটি গান ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় প্রকাশ করেন। আর এভাবেই লালনের গানের পরিচিতি
ঘটে। মোট কথা, লালন-গীতি
একাধারে বাংলা ভজন,
ইসলামী, মারফতি-মুর্শিদী
ও গজল-গীতির উৎসমুখ খুলে দিয়েছিল।
লালন
একজন অসাধারণ পণ্ডিত ধর্মতত্ত্বজ্ঞ ছিলেন। তিনি আরবী ও
ফারসী ভাষাতে দক্ষ ছিলেন। হিন্দু ও মুসলিম উভয় শাস্ত্রেই তাঁর অগাধ পাণ্ডিত্য ছিল। কোরআন ও হাদিস সম্পর্কে তাঁর জ্ঞান ছিল সুগভীর। তাই তিনি অতি সহজেই
কোরআন ও হাদিসের বয়াৎ সুন্দরভাবে বাংলা গানে সংযোজিত করতে পেরেছিলেন। তিনি সর্বেশ্বরবাদী সুফিদের দলে ছিলেন। ছেঁউড়িয়ার মক্তবে তিনি নিজেই কোরআন শিক্ষক হিসেবে
তালিম দিতেন।
লালন
শাহর শিষ্যদের মধ্যে দুদ্দু শাহ, পাঞ্জু শাহ, শুকুর শাহ, শীতল শাহ, ভোলাই শাহ, মনিরুদ্দিন
শাহ, মানিক
শাহ ওরফে মানিক পণ্ডিত প্রমুখের নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
তাঁর ভাব-শিষ্য হিসেবে সিলেটের হাসন রাজার নামও উল্লেখযোগ্য। দুদ্দু শাহকে লালন
সবচেয়ে বেশি স্নেহ
করতেন। দুদ্দু শাহ ছাড়া লালন শাহ এবং লালন শাহ ছাড়া দুদ্দু শাহর কথা কল্পনাই করা
যেত না। দুদ্দু শাহর আসল নাম ছিল দবীরউদ্দিন। লালনের কাছে দীক্ষা গ্রহণের পর তাঁর
নাম দুধমল্লিক বা দুদ্দু শাহ।
লালন
শাহ আল্লাহ্ বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি একজন কামেল দরবেশ ও
সুফি সাধক ছিলেন। কোনো ধর্মের প্রতি তাঁর বিদ্বেষ ছিল না। সব মানুষই তাঁর কাছে ছিল
ভাই। কেননা কোরআনের প্রকৃত শিক্ষাই তাই।
লালন
শাহ অতি সদাচারী, স্বল্পভাষী
ও বিনয়ী ছিলেন। তাঁর একমাত্র অস্ত্র ছিল বাউল গান। এই অস্ত্রের কাছে তাঁর ভীষণ শত্রুও পরাজিত হতো। বাউলদের উপজীবিকা ভিক্ষা মাত্র হলেও লালন ভিক্ষাকেই জীবিকা
নির্বাহের একমাত্র অবলম্বন করেননি। তিনি দস্তুরমতো পরিশ্রম করে জীবনধারণ করতেন।
মৃত্যুকালে তাঁর দু’হাজারেরও বেশি টাকা জমা ছিল। সব টাকাই তিনি নিজে উপার্জন
করেছিলেন। তিনি এই টাকা তাঁর স্ত্রী, ধর্ম-কন্যা ও প্রিয় শিষ্য শীতল
শাহকে দান করেছিলেন। কিছু অংশ সৎকাজে ব্যয়ের নির্দেশও দিয়েছিলেন।
লালনের
ভক্তরা তাঁকে প্রাণের চাইতে ভালোবাসতেন। তিনিও তাঁদের তেমনি ভালোবাসতেন। তিনি
নিঃসন্তান ছিলেন। এই ভক্তরাই ছিল তাঁর প্রকৃত সন্তান।
ব্যক্তিগত
জীবনে লালন শাহ খুব রসিক ছিলেন। সাধারণ কথাবার্তার মধেও তাঁর রসিক মনের পরিচয়
পাওয়া যেত।
লালনের
সমকক্ষ কবি সেকালে ছিল না বললেই চলে।
লালন
শাহ ছিলেন একজন মহাপুরুষ। মৃত্যুকালের একটা ঘটনা থেকে তার প্রমাণ মিলে।
“মৃত্যুর
প্রায় এক মাস পূর্বে তাঁর পেটের ব্যারাম হয়।... দুগ্ধ ভিন্ন পীড়িত অবস্থায় কিছু
খাইতেন না। মাছ খাইতে চাহিতেন। পীড়িত কালে, পরমেশ্বরের নাম পূর্ববৎ সাধন
করিতেন। মধ্যে মধ্যে গানে উন্মত্ত হইতেন। ধর্মের আলাপ পাইলে নববলে বলীয়ান হইয়
রোগের যাতনা ভুলিয়া যাইতেন।... মরণের পূর্ব রাত্রিতেও প্রায় সমস্ত সময় গান করিয়া
আটটার সময় শিষ্যগণকে বলেন, ‘আমি চলিলাম’। ইহার কিয়ৎকাল পরে শ্বাসরোধ হয়।”
লালন
শাহ ১১৬ বৎসর বয়সে মানবলীলা সংবরণ করেন।
লালন
শাহর জন্ম-মৃত্যু ও জাত-ধর্ম নিয়ে মতবিরোধ আছে। লালন তাঁর ছদ্মনাম বলেও অনেকে মত
পোষণ করেন। লালনের জীবন বৃত্তান্ত সম্বন্ধে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্য সংগ্রহ করা আজো
সম্ভব হয়নি। তাঁর সম্বন্ধে সকল কাহিনীই জনশ্রুতি। তাই লালনের
প্রকৃত জীবন-কথা আরও রহস্যাবৃত।
কেউ
বলেন, লালন
মুসলিম-সন্তান। তিনি যশোর জেলার ঝিনাইদহ জেলার হরিশপুর গ্রামে এক চাষী পরিবারে
জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পুরে নাম লালন শাহ দেওয়ান। তাঁ পিতার নাম দরীবুল্লাহ্ দেওয়ান, মাতার নাম
আমেনা বেগম। তাঁর দাদার নাম গোলাম কাদের দেওয়ান।
আবার
কেই বলেন, লালন
হিন্দু-সন্তান। পরে মুসলমান হন। তাঁর জন্মস্থান কুষ্টিয়া জেলার ভাঁড়ারা বা ভান্ডারিয়া গ্রামে। লালনের গুরুর নাম সিরাজ শাহ। তিনি কুষ্টিয়ার কুমারখালি গ্রামের
এক পালকি বাহক ছিলেন। মতান্তরে, তিনি যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামের
বাসিন্দা।
অধিকাংশেরই
মতে, সিরাজ
শাহর কাছে হিন্দু-সন্তান লালন ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন ও দরবেশ লালন বা লালন শাহ বা
সাঁইজী নামে পরিচিত হন।
লালন-জীবনীকে
ঘিরে অনেক গল্প-কাহিনী ও কিংবদন্তি গড়ে উঠেছে।
লালন-জীবনীর
তেমনি একটি কাহিনী :
সাঁইজীর
বাল্যনাম লালন দাস। তিনি বাউল দাস নামে এক ব্যক্তির সঙ্গে গঙ্গাস্নানে যান। তখন রেলগাড়ি ছিল না। তীর্থযাত্রীদের নৌকোয় যাতায়াত করতে হতো। লালন
দাস গঙ্গাস্নান শেষ করে ঘরে ফিরে আসছিলেন। পথে বসন্ত রোগে
গুরুতরভাবে আক্রান্ত হন। তাঁ সংজ্ঞা লোপ পায়। তিনি মৃতবৎ হয়ে পড়েন। সঙ্গীরা মনে
করলো তিনি মারা গেছেন। তাঁর অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া শেষ করে তাঁকে নদীতে ফেলে দিলো।
তারা দেশে ফিরে গেলো। লালনের সংজ্ঞাহীন দেহ নদীর তীরে উঠে পড়লো। এক মুসলমান রমণী
তাঁকে দেখতে পান। তিনি ছিলেন তন্তুবায় বা জোলা সম্প্রদায়ভুক্ত। তিনি খুব দয়াবতী
ছিলেন। লালনকে তিনি নিজের ঘরে নিয়ে যাবার ব্যবস্থা করেন। অক্লান্ত সেবা-শুশ্রূষা
দিয়ে তাঁকে ভালো করে তোলেন। এ সময়ে যশোর জেলার ফুলবাড়ি গ্রামে সিরাজ
শাহ নামে এক দরবেশ বাস করতেন। তিনি সে সময়ে ভ্রমণে বের হয়েছিলেন। মুসলমান রমণীর
ঘরে লালনের সঙ্গে তাঁর দেখা হলো। তিনি লালনকে অনেক উপদেশ দিলেন। লালন তাঁর কথা
শুনে মুগ্ধ হন এবং শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন।
লালন
আরোগ্য লাভের পর নিজের গ্রামে ফিরে গেলেন। ইতিমধ্যে লালনের মৃত্যু সংবাদ সেখানে
পৌঁছে গিয়েছিলো। কিন্তু লালনকে সশরীরে দেখতে পেয়ে তাঁর মা ও স্ত্রী তাঁকে চিনতে
পারলেন। গ্রামের লোকদেরও তাঁকে চিনতে কষ্ট হলো না। লালনও তাঁর গ্রামের সবাইকে
চিনতে পারলেন। লালন সব কথা খুলে বললেন। কিন্তু লালন মুসলমানের ঘরে অন্ন ভোজন
করেছিলেন এবং তাঁর মৃত্যু হয়েছিলো বলে গ্রামবাসীরা তাঁর মাকে শ্রাদ্ধ করে
প্রায়শ্চিত্ত করতে বললো। কিন্তু মা গরীব ছিলেন। তার টাকা পয়সা ছিল না। তিনি
প্রায়শ্চিত্ত করতে পারলেন না। ফলে তাঁকে পুত্র লালনকে পরিত্যাগ করতে হলো।
লালন
স্ত্রী ও মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিলেন। তিনি ছেঁউড়িয়া গ্রামে গিয়ে আখড়া পাতলেন।
সেখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে লাললেন।
কয়েক
বৎসর পর লালনের স্ত্রী ও মায়ের মৃত্যু হয়।
সাঁইজীর
নিকট জাতিভেদ ছিল না। হিন্দু, মুসলমান খ্রিষ্টান সবাই সমানভাবে ধর্মপিপাসু। সকল ধর্মের
লোক তাঁর দরবারে যাতায়াত করতেন। তাই সাঁইজী লালন কোন ধর্মের মানুষ ঠাহর করা কারো
সাধ্য ছিল না। সাঁইজি হিন্দু কি মুসলমান এখথা কেউ বলতে পারে না। এমনকি তিনি নিজেও
বলেছেন,
সব
বলে লালন ফকির হিন্দু কি যবন,
লালন
বলেন আমার আমি না জানি সন্ধান।
অন্য
কাহিনী:
সিরাজ
হরিশপুর গ্রামের একজন গরীব বেহারা। তিনি এক এতিম ছেলেকে কুড়িয়ে পেলেন। ছেলেটি
দেখতে খুব সুন্দর। তাঁর কপাল চওড়া। চোখে-মুখে প্রতিভার দীপ্তি। পরে ছেলেটির পরিচয়
পাওয়া গেল। সে এ গ্রামের দরীবুল্লাহ দেওয়ানের পুত্র। দরীবুল্লাহ বেঁচে নেই। সংসারে
ছেলেটির দুই ভাই ও এক ভাবী আছে। তারাও খুব গরীব। ছেলেটি ভাইয়ের সংসারে থাকতে পারলো
না। ছেলেটির গলার সুর ছিল খুব মধুর। আর সিরাজও ছিল গান পাগলা। সিরাজ ছেলেটির গান
শুনে মুগ্ধ হলেন। তিনি তাকে নিজের ঘরে আশ্রয় দিলেন। সংসারে সিরাজের স্ত্রী ছাড়া আর
কেউ নেই। তিনি ছেলেটিকে পোষ্য নেবেন ঠিক করলেন। তাঁর স্ত্রীও রাজি হলো।
পরবর্তীকালে এই এতিম ছেলেটিই ফকির লালন শাহ রূপে বিখ্যাত হয়েছিলেন। আর সিরাজ
বেহারা লালন-গুরু সিরাজ শাহ নামে পরিচিত হয়েছিলেন।
লালন
সিরাজ শাহকে খুব শ্রদ্ধা করতেন। তিনি নিজেকে তাঁর পুত্র বলেই পরিচয় দিতেন। এটা ছিল
তাঁর আধ্যাত্মজীবনের প্রতীক। কারণ জন্মদাতা পিতার চেয়ে দীক্ষাদাতা গুরুর গুরুত্ব
মোটেই কম নয়।
আরও
একটি কাহিনী:
লালন
কায়স্থ বলে পরিচিত ছিলেন। তিনি একবার নবদ্বীপে বসবাস করছিলেন। সেখানে লালনের এক
স্মরণীয় ঘটনা ঘটলো। তিনি ‘পদ্মবতী’ নামে এক কায়স্থ মহিলাকে মা বলে ডাকতেন।
পদ্মবতীর ছেলে মাত্র কিছুদিন হলো মারা গেছে। তিনি পুত্র-শোকে কাতর। যুবন লালনের
মুখে তিনি মৃত ছেলের আদল দেখতে পেলেন। তিনি লালনকে ধর্ম-পুত্ররূপে গ্রহণ করতে
চাইলেন। লালন রাজি হলেন। পদ্মবতীকে লালন মাতৃরূপে গ্রহণ করলেন। মাতা-পুত্ররূপে
তাঁরা বসবাস করতে লাগলেন।
লালনের
জীবন-কথা নিয়ে এমনি ধরনের অনেক কিংবদন্তির শেষ নেই।
লালন
শাহর প্রিয় শিষ্য দুদ্দু শাহর কলমী পুথির ঘটনা অনুসারে লালন ১১৭৯ বাংলা সালের ১ল
কার্তিক বা ১৭৭২ ইংরেজি সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১২৯৫ বাংলা সালের ১লা কার্তিক বা
১৮৮৮ ইংরেজি সালে মৃত্যুবরণ করেন।
লালন
শাহ চিরকালের এক চিরস্মরণীয় নাম
লালনের
গান সম্পর্কে এবার কিছু কথা।
খাঁচর
ভিতর অচিন পাখি
ক্যামনে আসে যায়
ধরতে
পারলে মনো-বেড়ি
দিতাম
তাহার পায়।
বিখ্যাত
এই গানটির রচয়িতা সুরের বাউল লালন শাহ। বাউল সংগীতের তিনি গুরু। অসম্ভব জনপ্রিয়
তাঁর গান। বাংলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে লালনের গান। বিচিত্র তাঁর গানের বাণী।
অদ্ভুত তার গানের সুর। লালন বিশ্বাস করতেন,
সবার
উপর মানুষ সত্য
তাহার
উপরে নাই।
লালন
সংগীতপ্রিয় মানুষ ছিলেন। তিনি গান বাঁধতে গান গাইতে পারতেন। তাঁর প্রায় সমস্ত গানই
অধ্যাত্মিক। যার ভেতরকার মর্মবাণী খুব গভীর। তিনি মানুষের একাল-সেকাল, জন্ম-মৃত্যু
নিয়ে আশ্চর্য সব গান লিখেছেন। সৃষ্টিকর্তার গুণকীর্তন করে তিনি অনেক গান লিখেছেন।
এই প্রকারের গানে আল্লাহ্-রাসূল প্রসঙ্গ রূপায়িত হয়েছে। লালন লিখেছেন,
এলাহি
আলমিন গো আল্লাহ্
বাদ্শাহ
আলসাপনা তুমি
ডুবায়ে
ভাসাতে পার
ভাসায়ে
কিনারা দাও কারো
রাখ
মোর হাত তোমার
তাইত
তোমায় ডাকি আমি।
রাসূল
(স:) সম্পর্কে লিখেছেন,
নবী
না চিনিলে কি আল্লাহ্ পাবে
নবী
দীনের চাঁদ আজ দেখনারে ভেবে ৼ
সৃষ্টিকর্তার সৃষ্টির রহস্য সম্পর্কে লালন তাঁর গানে বহু
তথ্য দিয়েছেন। তাঁর সেই গান শুধুই গান নয়, তা সকল মানুষের জন্যে অমর বাণী।
তিনি লিখেছেন,
সাঁই
আমার কখন খেলে কোন খেলা।
জীবের
কি সাধ্য আছে গ’নে পড়ে তাই বরা ৼ
কখন
ধরে আকার
কখন
রয় নিরাকার
কেউ
বলে ভেবে হই ঘোলা ৼ
লালন
তাঁর গানে বেশি বলেছেন মানুষের কথা। তিনি বলেছেন,
১. মানুস তত্ত্ব সত্য হয় যার মনে।
সে কি অন্য তত্ত্ব মানে ৼ
২. মানুস ভজলে মানুষ হবি
মানুষ ছেড়ে খ্যাপারে তুই মূল হারাবি ৼ
৩. দেখ না মন ঝাকমারিয়া এই
দুনিয়াদারি।
পরিয়ে কোম্পানি-ধ্বজা
মজা উড়ালো ফকিরি ৼ
৪. না হলে মন সরলা, কি ধন মেলে
কোথা ধু’ড়ে।
হাতে হাতে বেড়ও কেবল তৌবা পড়ে ৼ
৫. সত্য বল্ সুপথে চল্ ওরে আমার মন
সত্য সুপথ না চিনিলে পাবে না মানুষের দরশন ৼ
৬. মনরে বুঝাবো কত।
যে পথে মরণ ফাঁসী
সেই পথে মন সদায় রত ৼ
এমনি
কত না গান রচনা করেছেন তার যেন শেষ নেই। লালন তাই তাঁর গানের মধ্যে হয়ে আছেন অমর।
লালনের সব
গান সংগ্রহ করে এক মলাটে আবদ্ধ করা রীতিমতো দুরূহ কাজ। এই দুরূহ কাজটি অতি যত্ন ও গুরুত্ব
সহকারে সর্বাধিক ৮৫১টি গান সংগ্রহ করে সংকলিত হয়েছে ‘লালন সমগ্র’। ‘গীতাঞ্জলি’
প্রকাশনা সংস্থার প্রিয়ভাজন রফিকুজ্জামান হুমায়ুন সে দুরূহ কাজটি সুসম্পন্ন করে
প্রকাশ করে প্রকাশ করেছেন ‘লালন সমগ্র’। এই সংকলনটি সংগীতানুরাগী ও সংগীতবোদ্ধাদের
অশেষ উপকারে আসবে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
|
‘তারিতা’ ১৩০/১ ওয়াপদা রোড পশ্চিম রামপুরা ঢাকা-১২১৯ |
মোবারক হোসেন খান |
