অকূল পাড় দেখে মোদের লাগেরে ভয়
(১)
অকূল পাড় দেখে মোদের লাগেরে ভয়।
মাঝি
বেটা বড় ঠেঁটা
হাল
ছেড়ে দিয়ে বগল বাজায় ৼ
উজানভাটি
তিনটি নালে
দমদমা
দম বেদম কলে
তার
পুরো ঘাটে একশব্দ হয়;
গুরুরু
গুরু পবন গুরু
প্রেম
আনন্দে সাঁতার খেলে ৼ
সামনেতে
অপার নদী
পার
হয়ে যায় ছয়জন বাদী
শ্রীরূপ
লীলাময়;
লালন
বলে বলে ভাব জানিয়ে
ডুব দিয়ে সে রত্ন উঠায় ৼ
প্রথম স্তবক:
"অকূল
পাড় দেখে মোদের লাগেরে ভয়। মাঝি বেটা বড় ঠেঁটা হাল ছেড়ে
দিয়ে বগল বাজায় ৼ"
- অকূল: যার কূল বা কিনারা নেই; সীমাহীন, অগাধ।
(এখানে জীবনের বিশালতা বা অজানাকে বোঝানো হচ্ছে।)
- পাড়: কিনারা, সীমা।
- দেখে: দেখে, অবলোকন করে।
- মোদের: আমাদের।
- লাগেরে ভয়: ভয় লাগে, শঙ্কা
হয়। (জীবনের অনিশ্চয়তা বা মৃত্যুর ভয়।)
- মাঝি বেটা: এখানে 'মাঝি' রূপক
অর্থে গুরু, মুর্শিদ বা স্বয়ং ঈশ্বরকে বোঝাতে পারে, যিনি জীবনতরীর
কান্ডারী। 'বেটা' শব্দটি স্নেহ বা ঘনিষ্ঠতা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
- বড় ঠেঁটা: অত্যন্ত বেহায়া, নির্লিপ্ত, বা
উদাসীন। (এখানে 'মাঝি' অর্থাৎ গুরু বা ঈশ্বর যেন জীবনের ভয়াবহতা দেখেও নির্লিপ্ত, যা
ভক্তের কাছে বিস্ময়কর।)
- হাল ছেড়ে দিয়ে: নৌকার হাল ছেড়ে দিয়ে; অর্থাৎ, নিয়ন্ত্রণ
ছেড়ে দিয়ে। (জীবনের দায়িত্ব বা পরিচালনার ভার ছেড়ে দিয়ে।)
- বগল বাজায়: নিশ্চিন্তে বা ফুর্তিতে বগল
বাজানো। (গুরু বা ঈশ্বরের এমন উদাসীনতা যা দেখে সাধারণ মানুষ বিস্মিত হয়।)
দ্বিতীয় স্তবক:
"উজানভাটি
তিনটি নালে দমদমা দম বেদম কলে তার পুরো ঘাটে একশব্দ হয়; গুরুরু
গুরু পবন গুরু প্রেম আনন্দে সাঁতার খেলে ৼ"
- উজানভাটি: উজানে যাওয়া (স্রোতের
প্রতিকূলে) এবং ভাটিতে যাওয়া (স্রোতের অনুকূলে)। এটি জীবনের সুখ-দুঃখ, চড়াই-উতরাই
বা সাধনার বিভিন্ন স্তরকে বোঝাতে পারে।
- তিনটি নালে:
'তিনটি নাল' বা 'ত্রিনাড়ী' যোগ
দর্শনের সাথে সম্পর্কিত। ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না
– এই তিনটি প্রধান নাড়ীর কথা
বলা হয়, যা কুণ্ডলিনী যোগে ব্যবহৃত হয়। এটি মানবদেহের ভেতরের শক্তিপ্রবাহের
প্রতীক।
- দমদমা দম বেদম কলে: 'দম' শ্বাস-প্রশ্বাস বা
প্রাণবায়ু। 'দমদমা দম'
অনবরত শ্বাস-প্রশ্বাসের ক্রিয়াকে বোঝায়। 'বেদম
কলে' মানে প্রাণবায়ুর অবাধ বা প্রবল ক্রিয়া। এটি যোগ সাধনার প্রাণায়াম
বা শ্বাসের উপর নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দেয়।
- তার পুরো ঘাটে: সেই তিনটি নাড়ী বা
প্রাণবায়ুর পুরো স্থানে, দেহের অভ্যন্তরে।
- একশব্দ হয়: একটি বিশেষ ধ্বনি বা শব্দ
প্রতিধ্বনিত হয়। এটি আধ্যাত্মিক সাধনার অনাহত ধ্বনি বা ওঁকারের মতো কোনো
দিব্যধ্বনি হতে পারে।
- গুরুরু গুরু: এখানে 'গুরু
গুরু' ধ্বনি হলো বাতাসের শব্দ বা এক প্রকার গম্ভীর ধ্বনি। এটি পবন অর্থাৎ
প্রাণবায়ুর গভীর ধ্বনি।
- পবন গুরু: পবন মানে বাতাস বা
প্রাণবায়ু। এটি সেই প্রাণবায়ুকে গুরু রূপে কল্পনা করা হয়েছে, যা
সাধকের ভেতর থেকে শক্তি যোগায়।
- প্রেম আনন্দে সাঁতার খেলে: প্রেমময় আনন্দ বা
ভক্তির গভীর সমুদ্রে সাঁতার কাটা। অর্থাৎ, সাধনার মাধ্যমে প্রাপ্ত
দিব্য আনন্দময় অবস্থা।
তৃতীয় স্তবক:
"সামনেতে
অপার নদী পার হয়ে যায় ছয়জন বাদী শ্রীরূপ লীলাময়; লালন
বলে বলে ভাব জানিয়ে ডুব দিয়ে সে রত্ন উঠায় ৼ"
- সামনেতে অপার নদী: সামনে রয়েছে বিশাল, অসীম
নদী। (এটি ভবদধি বা সংসার সমুদ্রের প্রতীক, যা পার হওয়া কঠিন।)
- পার হয়ে যায় ছয়জন বাদী: এখানে 'ছয়জন
বাদী' বলতে মানব দেহের ষড়রিপুকে বোঝানো হতে পারে: কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য।
এই রিপুগুলো আমাদের আত্মিক যাত্রায় বাধা সৃষ্টি করে। 'বাদী' মানে
প্রতিবাদী বা শত্রু।
- শ্রীরূপ লীলাময়: পরম সত্তার সুন্দর বা দিব্য
রূপ এবং তাঁর লীলা বা খেলা। এই ছয় রিপুকে জয় করে সেই লীলাময়ের দর্শন লাভ
করা।
- লালন বলে বলে ভাব জানিয়ে: লালন ফকির তার গানের
মাধ্যমে তার ভেতরের অনুভূতি, চিন্তা বা দর্শন প্রকাশ করে।
- ডুব দিয়ে সে রত্ন উঠায়: গভীর জ্ঞান বা
আধ্যাত্মিক সত্যের সমুদ্রে ডুব দিয়ে অমূল্য রত্ন (যেমন ঈশ্বর প্রেম, আত্মজ্ঞান
বা মুক্তি) খুঁজে বের করা।
এই গানটি লালনের আধ্যাত্মিক দর্শন, জীবনের অনিশ্চয়তা, মানব দেহের রহস্য এবং সাধনার মাধ্যমে পরম সত্তার উপলব্ধি লাভ করার এক গভীর বর্ণনা।