cover

cover

অজান খবর না জানিলে কিসের ফকিরি





(২)

অজান খবর না জানিলে কিসের ফকিরি।

সে নূরে নূর নবী আমার

তাহে আরশ বাড়ি

 

বলব কি সে-নূরের ধারা

নূরেতে নূর আছে ঘেরা

ধরতে গেলে না যায় ধরা

যৈছেরে বিজরি

 

মূলাধারের মূল সেহি নূর

নূরের ভেদ অক‚ল সমুদ্দূর

যার হয়েছে প্রেমের অঙ্কুর

ঝলক দিচ্ছে তারি

 

সিরাজ সাঁই বলে রে লালন

করগে আপন দেহের বলন

নূরে নীরে করে মিলন

থাক রে নেহারি


প্রথম স্তবক:

"অজান খবর না জানিলে কিসের ফকিরি। সে নূরে নূর নবী আমার তাহে আরশ বাড়ি ৼ"

  • অজান খবর: না জানা খবর, অজানা তথ্য বা জ্ঞান। (এখানে 'অজান খবর' বলতে আত্মজ্ঞান, পরম সত্তার রহস্য, বা সৃষ্টির গূঢ় রহস্য বোঝানো হয়েছে।)
  • না জানিলে: যদি না জানা যায়
  • কিসের ফকিরি: কিসের বা কীসের জন্য এই ফকিরি বা সাধনা? (যদি আত্মজ্ঞান বা পরম সত্তার রহস্য জানা না যায়, তাহলে ফকিরি সাধনার কোনো মূল্য থাকে না।)
  • সে নূরে নূর নবী আমার: 'নূর' মানে আলো বা জ্যোতি। এখানে 'নূর' বলতে ঐশ্বরিক জ্যোতি বা পরম সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। 'নূরে নূর নবী' অর্থাৎ সেই ঐশ্বরিক জ্যোতি থেকেই নবীর (বা আধ্যাত্মিক পথের প্রদর্শকের) সৃষ্টি। নবী এখানে ব্যক্তির ভেতরের দিব্য জ্ঞান বা ঈশ্বরকেও বোঝাতে পারেন
  • তাহে আরশ বাড়ি: 'আরশ' ইসলাম ধর্মানুসারে ঈশ্বরের সিংহাসন বা বাসস্থান। 'তাহে আরশ বাড়ি' মানে সেই জ্যোতিতেই ঈশ্বরের বাসস্থান বিদ্যমান। এটি বোঝায় যে পরম সত্তা এবং তাঁর লীলাক্ষেত্র (আরশ) এই জ্যোতির মধ্যেই নিহিত

দ্বিতীয় স্তবক:

"বলব কি সে-নূরের ধারা নূরেতে নূর আছে ঘেরা ধরতে গেলে না যায় ধরা যৈছেরে বিজরি ৼ"

  • বলব কি সে-নূরের ধারা: সেই ঐশ্বরিক জ্যোতির প্রকৃতি বা প্রবাহ সম্পর্কে কী বলব। (এটি জ্যোতির ব্যাখ্যাতীত প্রকৃতিকে ইঙ্গিত করে।)
  • নূরেতে নূর আছে ঘেরা: জ্যোতির ভেতরেই জ্যোতি আবৃত হয়ে আছে। (এটি বোঝায় যে পরম সত্তা নিজের মধ্যেই নিজেকে গোপন করে রেখেছেন, অথবা দিব্য জ্ঞান এতই সূক্ষ্ম যে তা সহজে উপলব্ধি করা যায় না।)
  • ধরতে গেলে না যায় ধরা: তাকে ধরতে চেষ্টা করলে ধরা যায় না, অর্থাৎ তাকে সহজে উপলব্ধি করা যায় না বা ধারণ করা যায় না
  • যৈছেরে বিজরি: যেমনটি বিজলি বা বিদ্যুৎ। (বিজলি যেমন ক্ষণস্থায়ী, দ্রুত অদৃশ্য হয়ে যায় এবং তাকে ধরা যায় না, তেমনি সেই দিব্য জ্যোতিকেও সহজে উপলব্ধি করা যায় না।)

তৃতীয় স্তবক:

"মূলাধারের মূল সেহি নূর নূরের ভেদ অকূল সমুদ্দূর যার হয়েছে প্রেমের অঙ্কুর ঝলক দিচ্ছে তারি ৼ"

  • মূলাধারের মূল সেহি নূর: 'মূলাধার' হলো যোগশাস্ত্রে বর্ণিত ছয়টি চক্রের প্রথমটি, যা মেরুদণ্ডের শেষ প্রান্তে অবস্থিত। এটি সকল শক্তির উৎস। এখানে বলা হচ্ছে, সেই ঐশ্বরিক জ্যোতিই মূলাধারের মূল বা উৎস। অর্থাৎ, এই দিব্য শক্তি দেহের মধ্যেই নিহিত
  • নূরের ভেদ অকূল সমুদ্দূর: সেই জ্যোতির রহস্য বা ভেদ এক বিশাল, কূলহীন সমুদ্রের মতো। (অর্থাৎ, এই দিব্য জ্ঞানের গভীরতা অপরিমেয় এবং তাকে পুরোপুরি বোঝা অসম্ভব।)
  • যার হয়েছে প্রেমের অঙ্কুর: যার হৃদয়ে পরম সত্তার প্রতি ভালোবাসা বা ভক্তির জন্ম হয়েছে
  • ঝলক দিচ্ছে তারি: সেই ব্যক্তিই সেই জ্যোতির ঝলক বা এক ঝলক দর্শন লাভ করতে পারে। (যাদের মনে প্রকৃত প্রেম ও ভক্তি জন্মেছে, তারাই এই দিব্য জ্ঞান বা পরম সত্তার উপলব্ধি লাভ করতে সক্ষম হয়।)

চতুর্থ স্তবক:

"সিরাজ সাঁই বলে রে লালন করগে আপন দেহের বলন নূরে নীরে করে মিলন থাক রে নেহারি ৼ"

  • সিরাজ সাঁই বলে রে লালন: লালনের গুরু সিরাজ সাঁই (বা সিরাজ শাহ) লালনকে উদ্দেশ্য করে বলছেন। এটি লালনের গানে গুরু বন্দনার একটি সাধারণ রূপ
  • করগে আপন দেহের বলন: তোমার নিজের দেহের মধ্যেই এই সব রহস্যের অন্বেষণ করো। 'বলন' বলতে বলা, প্রকাশ করা বা অনুসন্ধান করা বোঝায়। এখানে দেহকে বিশ্লেষণ বা অনুসন্ধান করার কথা বলা হয়েছে, কারণ লালনের দর্শনে দেহকে ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র সংস্করণ মনে করা হয়
  • নূরে নীরে করে মিলন: 'নূর' মানে জ্যোতি বা আত্মিক জ্ঞান, আর 'নীর' মানে জল বা পার্থিব অস্তিত্ব। এটি বোঝায় যে আত্মিক জ্ঞান (নূর) এবং পার্থিব অস্তিত্ব (নীর) বা দেহের মধ্যে যে মিলন ঘটে, তা অনুভব করো। এটি দেহেই পরম সত্তার উপলব্ধির ইঙ্গিত দেয়
  • থাক রে নেহারি: সেই মিলনকে গভীর মনোযোগ দিয়ে উপলব্ধি করো বা প্রত্যক্ষ করো। 'নেহারি' মানে দেখা, নিরীক্ষণ করা

এই গানটি লালনের দেহকেন্দ্রিক সাধনা এবং পরম সত্তার উপলব্ধির এক চমৎকার দৃষ্টান্ত। এটি বোঝায় যে পরম জ্ঞান বা আল্লাহ বাইরে কোথাও নেই, বরং মানুষের দেহের মধ্যেই তার অনুসন্ধান করতে হয়

Powered by Blogger.