cover

cover

অনাদির আদিতে শ্রীকৃষ্ণনিধি

 



(৩)

অনাদির আদিতে শ্রীকৃষ্ণনিধি
তার কি আছে কিছু গৌরবখেলা
ব্রহ্মরূপে সে অটল বসে
নীলাবাকারি তার অংশকলা

 

সত্য সত্য স্বয়ং বেদ আগম বলে
সচ্চিদানন্দ রূপ পূর্ণ ব্রহ্ম হয়
জন্মমৃত্যু যার এই ভবের পার
সে তো নয় স্বয়ং নন্দলালা

 

পূর্ণরূপ কৃষ্ণ রসিক সে জন
শক্তির উদয় শক্তিতে সুজন
মহাত্মারে সদা চিত্ত আকর্ষিণ
বেদারে তারে বিষ্ণু বল

 

কহে কুলগুরুর কেমন ভাগ্যবান
দেখিলে সে রূপ পেয়ে চক্ষুদান
সেবারে নিবারি যে অজ্ঞান
লালন বলে সেতো প্রেমে ভোলা


প্রথম স্তবক:

"অনাদির আদিতে শ্রীকৃষ্ণনিধি তার কি আছে কিছু গৌরবখেলা। ব্রহ্মরূপে সে অটল বসে নীলাবাকারি তার অংশকলা ॥"

  • অনাদির আদিতে: যা কিছুর শুরু নেই, তারও শুরুতে; অর্থাৎ সৃষ্টিরও পূর্বে, মহাকালের ঊর্ধ্বে
  • শ্রীকৃষ্ণনিধি: শ্রীকৃষ্ণ, যিনি সকল ঐশ্বর্য ও রত্নের আধার। এখানে কৃষ্ণকে পরম সত্তা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে
  • তার কি আছে কিছু গৌরবখেলা: সেই পরম সত্তা শ্রীকৃষ্ণের কি (সাধারণ অর্থে) কোনো বাহ্যিক গৌরব বা লীলা আছে? (প্রশ্নটি আসলে নেতিবাচক অর্থে ব্যবহৃত, বোঝাতে চাওয়া হচ্ছে তাঁর মহিমা এতটাই অপ্রমেয় যে তা সাধারণ গৌরব-ক্রীড়ার ঊর্ধ্বে।)
  • ব্রহ্মরূপে সে অটল বসে: সেই শ্রীকৃষ্ণই ব্রহ্মরূপে (পরম সত্তা হিসেবে) অটল বা স্থিরভাবে বিরাজমান। এখানে শ্রীকৃষ্ণকে নিরাকার ব্রহ্মের সাথে একীভূত করা হয়েছে
  • নীলাবাকারি তার অংশকলা: 'নীলাবাকারি' বলতে এখানে সম্ভবত 'লীলাবতারী' বা 'লীলা বিকারি' বোঝানো হয়েছে, অর্থাৎ যিনি বিভিন্ন লীলা বা রূপ ধারণ করেন। 'অংশকলা' হলো তাঁরই অংশবিশেষ বা প্রকাশ। অর্থাৎ, ব্রহ্মরূপী কৃষ্ণেরই বিভিন্ন লীলা বা অবতারসমূহ অংশমাত্র

দ্বিতীয় স্তবক:

"সত্য সত্য স্বয়ং বেদ আগম বলে সচ্চিদানন্দ রূপ পূর্ণ ব্রহ্ম হয় জন্মমৃত্যু যার এই ভবের পার সে তো নয় স্বয়ং নন্দলালা ॥"

  • সত্য সত্য স্বয়ং বেদ আগম বলে: স্বয়ং বেদ এবং আগম শাস্ত্রসমূহ (তান্ত্রিক শাস্ত্র) এই কথা সত্য বলে ঘোষণা করে। (এটি লালনের যুক্তির ভিত্তি হিসেবে শাস্ত্রের প্রমাণ উপস্থাপন।)
  • সচ্চিদানন্দ রূপ পূর্ণ ব্রহ্ম হয়: সেই পরম সত্তা সৎ (সত্তা, চিরন্তন অস্তিত্ব), চিৎ (চেতনা, জ্ঞান) এবং আনন্দ (পরম সুখ) - এই তিন গুণের সমন্বয়ে গঠিত পূর্ণ ব্রহ্ম
  • জন্মমৃত্যু যার এই ভবের পার: যার কোনো জন্ম বা মৃত্যু নেই এবং যিনি এই ভব বা সংসার চক্রের (পুনর্জন্মের) ঊর্ধ্বে
  • সে তো নয় স্বয়ং নন্দলালা: সেই পরম সত্তা (যিনি জন্ম-মৃত্যুহীন) শুধুমাত্র মথুরার গোপাল বা নন্দের পুত্র নন্দলালা (শিশু কৃষ্ণ) নন। এটি বোঝায় যে, নন্দলালার বাল্যরূপ কৃষ্ণের এক বিশেষ লীলা, কিন্তু তিনি তাঁর পূর্ণ ব্রহ্মস্বরূপের এক ক্ষুদ্র অংশ মাত্র। আসল সত্তা এরও ঊর্ধ্বে

তৃতীয় স্তবক:

"পূর্ণরূপ কৃষ্ণ রসিক সে জন শক্তির উদয় শক্তিতে সুজন মহাত্মারে সদা চিত্ত আকর্ষিণ বেদারে তারে বিষ্ণু বল ॥"

  • পূর্ণরূপ কৃষ্ণ রসিক সে জন: যিনি কৃষ্ণের পূর্ণরূপ বা তাঁর ব্রহ্মস্বরূপ উপলব্ধি করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত রসিক বা জ্ঞানী ব্যক্তি। (এখানে 'রসিক' বলতে পারমার্থিক জ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি বোঝানো হয়েছে।)
  • শক্তির উদয় শক্তিতে সুজন: সেই পরম সত্তা থেকেই শক্তির (যেমন প্রকৃতি বা মহামায়া) উদয় হয় এবং সেই শক্তির দ্বারাই সবকিছু সৃষ্টি হয় ('সুজন' - সু-সৃষ্টি)
  • মহাত্মারে সদা চিত্ত আকর্ষিণ: তিনি (পরম সত্তা) মহাত্মা বা সাধু ব্যক্তিদের মনকে সর্বদা আকর্ষণ করেন
  • বেদারে তারে বিষ্ণু বল: বেদ যাঁকে বিষ্ণু বলে উল্লেখ করে (অর্থাৎ বিষ্ণু পরম ব্রহ্মেরই এক রূপ), সেই পরম সত্তার কথাই এখানে বলা হচ্ছে

চতুর্থ স্তবক:

"কহে কুলগুরুর কেমন ভাগ্যবান দেখিলে সে রূপ পেয়ে চক্ষুদান সেবারে নিবারি যে অজ্ঞান লালন বলে সেতো প্রেমে ভোলা ॥"

  • কহে কুলগুরুর কেমন ভাগ্যবান: (আমার) কুলগুরু (আধ্যাত্মিক শিক্ষক বা পূর্বসূরি) বলেন, তিনি কত ভাগ্যবান
  • দেখিলে সে রূপ পেয়ে চক্ষুদান: যিনি সেই পরম সত্তার (কৃষ্ণের বা ব্রহ্মের) রূপ দর্শন করে জ্ঞানচক্ষু লাভ করেছেন (আধ্যাত্মিক অন্তর্দৃষ্টি লাভ করেছেন)
  • সেবারে নিবারি যে অজ্ঞান: সেই দর্শনের ফলে যার অজ্ঞানতা দূর হয়ে যায়। 'সেবারে নিবারি' বলতে সম্ভবত 'সেই মুহূর্তে নিবৃত্ত হয়' বা 'সেই বারে দূর হয়' বোঝানো হয়েছে
  • লালন বলে সেতো প্রেমে ভোলা: লালন ফকির বলেন, সেই ব্যক্তি (যিনি এই দিব্যজ্ঞান লাভ করেছেন) আসলে প্রেমে মগ্ন বা আত্মভোলা হয়ে গেছেন। 'ভোলা' মানে আত্মবিস্মৃত, প্রেমের গভীরে বিভোর

এই পদটি লালনের গভীর দার্শনিক চিন্তাধারার পরিচয় বহন করে, যেখানে তিনি বৈষ্ণব ভক্তি এবং অদ্বৈত বেদান্তকে একীভূত করার চেষ্টা করেছেন। তিনি কৃষ্ণকে নিরাকার ব্রহ্মের একটি প্রকাশ এবং সমস্ত লীলার উৎস হিসেবে দেখিয়েছেন



Powered by Blogger.