cover

cover

অনুরাগের ঘরে মারগা চাবি


 (৪)

অনুরাগের ঘরে মারগা চাবি
যদি রূপনগরে যাবি

 

শুধু মন তোমায় বলি
তুই আমারে ডুবাইলি
পরের ধনে লোভ করিলি
সে ধন আর ক’দিন খাবি

 

নিঃস্বজনে নাম নিরাকার
নাইরে তার আকার সাকার
বিনা বীজে উৎপত্তি তার
দেখলে মানুষ পাগল হবি

 

সিরাজ সাঁই সর্বদেশে বলে
গাছ রয়েছে অগাধ জলে
টেঁটে খেলে ফুলে ফলে
লালন বাউল করলেও দেখিতে পাবি


প্রথম স্তবক:

"অনুরাগের ঘরে মায়া চাবি যদি রূপনগরে যাবি।"

  • অনুরাগের ঘরে: অনুরাগ মানে প্রেম, ভক্তি, বা গভীর আকর্ষণ। 'অনুরাগের ঘর' বলতে হৃদয়ের গভীরে লুকিয়ে থাকা শুদ্ধ প্রেম বা আধ্যাত্মিক অনুভূতিকে বোঝানো হয়েছে
  • মায়া চাবি: 'মায়া' মানে মোহ, বিভ্রম বা জাগতিক আসক্তি। এখানে 'মায়া চাবি' বলতে সেই মায়াজাল বা পার্থিব আকাঙ্ক্ষাকে বোঝানো হয়েছে যা সেই 'অনুরাগের ঘরে' প্রবেশের পথ বন্ধ করে রেখেছে, বা যা ভেদ করে যেতে হয়
  • যদি রূপনগরে যাবি: 'রূপনগর' হলো রূপক অর্থে পরম সত্তার ধাম, ঈশ্বর বা আত্ম-উপলব্ধির স্থান। এটি একটি আধ্যাত্মিক গন্তব্য। অর্থাৎ, যদি তুমি পরম সত্যের (রূপনগর) দিকে যেতে চাও

দ্বিতীয় স্তবক:

"শুধু মন তোমায় বলি তুই আমারে ডুবাইলি পরের ধনে লোভ করিলি সে ধন আর ক’দিন খাবি।"

  • শুধু মন তোমায় বলি: লালন এখানে তার নিজের মনকে উদ্দেশ্য করে কথা বলছেন, যা ফকিরি গানে একটি সাধারণ প্রথা
  • তুই আমারে ডুবাইলি: তুই আমাকে (জীবনের মোহমায়ায়) ডুবিয়ে দিলি, অর্থাৎ ভুল পথে চালিত করলি বা ধ্বংসের পথে নিয়ে গেলি
  • পরের ধনে লোভ করিলি: 'পরের ধন' বলতে জাগতিক সম্পদ, যশ, খ্যাতি বা ক্ষণস্থায়ী ভোগকে বোঝানো হয়েছে, যা প্রকৃত আত্মিক ধন নয়। মন সেই নশ্বর বস্তুর প্রতি লোভ করেছে
  • সে ধন আর ক’দিন খাবি: সেই নশ্বর বা পার্থিব সম্পদ আর কতদিন ভোগ করবে? এটি নশ্বরতার প্রতি ইঙ্গিত এবং জাগতিক লোভের অর্থহীনতা বোঝায়

তৃতীয় স্তবক:

"নিঃস্বজনে নাম নিরাকার নাইরে তার আকার সাকার বিনা বীজে উৎপত্তি তার দেখলে মানুষ পাগল হবি।"

  • নিঃস্বজনে নাম নিরাকার: 'নিঃস্বজন' অর্থাৎ যার কোনো আত্মীয়-স্বজন নেই, বা যাকে একাকী বলে মনে হয়। 'নাম নিরাকার' বলতে পরম সত্তাকে বোঝানো হয়েছে, যার কোনো নির্দিষ্ট নাম বা রূপ নেই। তিনিই সর্বব্যাপী এবং নিঃসঙ্গ
  • নাইরে তার আকার সাকার: তাঁর কোনো নির্দিষ্ট রূপ বা মূর্তি নেই। 'আকার সাকার' বলতে কোনো নির্দিষ্ট আকৃতি বোঝায়
  • বিনা বীজে উৎপত্তি তার: তাঁর কোনো কারণ বা উৎস নেই, অর্থাৎ তিনি স্বয়ম্ভূ, অনাদি ও অনন্ত। সাধারণ সৃষ্টির মতো তাঁর কোনো বীজের (যেমন পিতা-মাতা) প্রয়োজন হয় না
  • দেখলে মানুষ পাগল হবি: যদি কেউ তাঁর প্রকৃত রূপ বা সত্তাকে উপলব্ধি করে, তাহলে সে মুগ্ধ হয়ে বা জ্ঞান হারিয়ে পাগলপ্রায় হয়ে যাবে। এটি তাঁর মহিমা ও অপ্রমেয়তাকে নির্দেশ করে

চতুর্থ স্তবক:

"সিরাজ সাঁই সর্বদেশে বলে গাছ রয়েছে অগাধ জলে টেঁটে খেলে ফুলে ফলে লালন বাউল করলেও দেখিতে পাবি।"

  • সিরাজ সাঁই সর্বদেশে বলে: লালনের গুরু সিরাজ সাঁই (বা সিরাজ শাহ) সব জায়গায় বা সবার কাছে এই সত্য কথাটি বলেন
  • গাছ রয়েছে অগাধ জলে: এটি একটি রূপক। 'গাছ' এখানে মানব দেহ বা আত্মাকে বোঝাতে পারে, আর 'অগাধ জল' হলো ভবসাগর বা সৃষ্টির অপার রহস্য। অর্থাৎ, পরমাত্মা বা দিব্য জ্ঞান দেহের মধ্যেই গভীর সমুদ্রে লুকায়িত আছে
  • টেঁটে খেলে ফুলে ফলে: 'টেঁটে' বলতে এখানে দৃঢ়ভাবে বা সঠিক পন্থায় চেষ্টা করলে বোঝায়। 'ফুলে ফলে' মানে এর সুফল বা পরিণতি পাওয়া যায়। অর্থাৎ, সঠিক সাধনা করলে এই দেহের মধ্যেই সেই দিব্য জ্ঞান বা আত্মার ফল লাভ করা সম্ভব
  • লালন বাউল করলেও দেখিতে পাবি: লালন ফকির বলেন, যদি তুমি বাউল (অর্থাৎ পার্থিব সব কিছু ত্যাগ করে আধ্যাত্মিক পথে নিজেকে সমর্পণ করো) হও, তবে তুমিও এই সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে। 'বাউল করা' মানে এখানে প্রচলিত সামাজিক প্রথা ও সংস্কার ত্যাগ করে আত্মানুসন্ধানের পথে ব্রতী হওয়া

এই গানটি লালনের আত্ম-অনুসন্ধান, জাগতিক মোহ ত্যাগ এবং দেহের মধ্যেই পরম সত্তার উপলব্ধির গভীর দর্শনকে ফুটিয়ে তোলে





Powered by Blogger.