আছে আল্লা আলে রসূল কলে তলের উল হল না
(৩৮)
আছে আল্লা আলে
রসূল কলে
তলের উল হল
না।
অজান এক মানুষের
কারণ
তলে করে আনাগোনা
ৼ
ওসে আল্লা আল্লাদিনী
দুই রূপে নীলে
করেন যিনি
দুই রূপ মাঝার,
রূপ মনোহর
সে রূপ কেউ
বলে না ৼ
নারী পুরুষ
নপুংসক নয়
তার তুলনা তাহারি
হয়
সেরূপ অন্বেষণ,
জানে সেহি জন
শক্তি উপাসনা
ৼ
শক্তি হারা
ভাবুক যে রে
কপট ভাবের উদাসিনীরে
লালন বলে তার,
জ্ঞানচক্ষু আঁধার
রাগের পথ চাইলে
না ৼ
প্রথম স্তবক: আল্লা, রসূল ও অজান মানুষ
"আছে আল্লা আলে রসূল কলে তলের উল
হল না। অজান এক মানুষের কারণ তলে করে আনাগোনা ৼ"
- আছে আল্লা আলে রসূল কলে: আল্লা এবং তাঁর রসূল (নবী মুহাম্মদ) উভয়ই বিদ্যমান। 'কলে' বলতে হয়তো তাঁদের বাণী বা
অস্তিত্বকে বোঝানো হয়েছে।
- তলের উল হল না: কিন্তু
তাঁদের নিচেই বা গভীরে যে মূল রহস্য ('উল' - মূল বা ভিত্তি) তা উন্মোচিত হলো না বা বোঝা গেল না। এটি বোঝায় যে, ঈশ্বর এবং নবীর বাহ্যিক প্রকাশ থাকলেও তাঁদের গভীরতম রহস্য সাধারণ
জ্ঞানে অগোচর।
- অজান এক মানুষের কারণ: অজান
এক মানুষের (অজানা বা অপ্রাপ্য সেই পরম
সত্তা, আদি মানুষ বা পরমাত্মা)
কারণ। এটিই সৃষ্টির মূল কারণ।
- তলে করে আনাগোনা: সেই
অজান মানুষই (সৃষ্টির) মূলে বা গভীরে আনাগোনা করে, অর্থাৎ সক্রিয় থাকে বা সবকিছুর পেছনে কাজ করে।
দ্বিতীয় স্তবক: আল্লাহর দুই
রূপের লীলা
"ওসে আল্লা আল্লাদিনী দুই
রূপে নীলে করেন যিনি দুই রূপ মাঝার, রূপ মনোহর সে রূপ কেউ বলে না
ৼ"
- ওসে আল্লা আল্লাদিনী: সেই
আল্লা (সৃষ্টিকর্তা) এবং আল্লাদিনী (আল্লাহর নারী রূপ, শক্তি
বা সৃষ্টিকারিণী ক্ষমতা)। এটি আল্লাহকে পুরুষ ও নারী উভয় রূপে দেখার বা
পুরুষ-প্রকৃতির সমন্বিত সত্তার ইঙ্গিত।
- দুই রূপে নীলে করেন যিনি: যিনি (সেই পরম সত্তা) এই দুই রূপে (পুরুষ ও প্রকৃতি) লীলা করেন বা কাজ করেন। 'নীলে
করা' মানে লীলা করা বা কার্য সম্পাদন করা।
- দুই রূপ মাঝার, রূপ মনোহর: এই দুই রূপের (পুরুষ ও নারী বা স্রষ্টা ও তাঁর
শক্তি) মাঝখানে যে রূপটি, তা
অত্যন্ত মনোহর (আকর্ষণীয়, সুন্দর)। এটি সেই অদ্বৈত বা
সমন্বিত রূপ, যা পরম সুন্দর।
- সে রূপ কেউ বলে না: সেই
রূপের কথা কেউ মুখে প্রকাশ করে না বা করতে পারে না। এটি রূপকের মাধ্যমে সেই
পরম সত্তার অবর্ণনীয়তা ও রহস্যময়তা প্রকাশ করে।
তৃতীয়
স্তবক: লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে সত্তা ও শক্তি উপাসনা
"নারী পুরুষ নপুংসক নয় তার
তুলনা তাহারি হয় সেরূপ অন্বেষণ, জানে সেহি জন শক্তি উপাসনা ৼ"
- নারী পুরুষ নপুংসক নয়: সেই পরম সত্তা নারীও নন, পুরুষও
নন, আবার নপুংসকও নন। তিনি লিঙ্গভেদের ঊর্ধ্বে।
- তার তুলনা তাহারি হয়: তাঁর
তুলনা কেবল তাঁর দ্বারাই হয়, অর্থাৎ
তিনি অতুলনীয়।
- সেরূপ অন্বেষণ: সেই
রূপের (পরম সত্তার) অনুসন্ধান।
- জানে সেহি জন: সেই
ব্যক্তিই জানে।
- শক্তি উপাসনা: যে
শক্তি উপাসনা করে। এখানে 'শক্তি
উপাসনা' বলতে শুধুমাত্র দেবীর পূজা
নয়, বরং প্রকৃতির মৌলিক শক্তি, সৃষ্টি শক্তি বা পরাশক্তির সাধনাকে বোঝানো হয়েছে, যার মাধ্যমে সেই লিঙ্গহীন পরম সত্তাকে জানা যায়।
চতুর্থ স্তবক: শক্তিহীন ভক্ত ও
জ্ঞানচক্ষুর আঁধার
"শক্তি হারা ভাবুক যে রে কপট
ভাবের উদাসিনীরে লালন বলে তার, জ্ঞানচক্ষু আঁধার রাগের
পথ চাইলে না ৼ"
- শক্তি হারা ভাবুক যে রে: যে ব্যক্তি শক্তি
হারা (আধ্যাত্মিক শক্তি, অন্তর্দৃষ্টি বা প্রকৃত ভক্তি যার নেই), সে কেবলই একজন 'ভাবুক' (ভ্রান্ত চিন্তাবিদ বা অকার্যকর সাধক)।
- কপট ভাবের উদাসিনীরে: সে
আসলে কপট ভাবধারী বা ভানকারী উদাসীন (বৈরাগী)।
- লালন বলে তার, জ্ঞানচক্ষু আঁধার: লালন ফকির বলেন, তার
(সেই শক্তিহীন বা কপট ভক্তের) জ্ঞানচক্ষু (আধ্যাত্মিক দৃষ্টি) অন্ধকারাচ্ছন্ন।
- রাগের পথ চাইলে না: কারণ
সে রাগের পথ (গভীর অনুরাগ, ভক্তি বা প্রেম-ভিত্তিক
সাধনা) অনুসরণ করেনি বা চায়নি। অর্থাৎ, প্রকৃত
শক্তি ও জ্ঞান আসে গভীর অনুরাগ বা ভক্তির মাধ্যমেই।
মূল বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির পরম সত্তাকে লিঙ্গ-পরিচয়ের
ঊর্ধ্বে এক অদ্বিতীয় এবং রহস্যময় 'অজান
মানুষ' হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, কেবল বাহ্যিক ধর্মীয় আচার বা জ্ঞান নয়, বরং
গভীর অনুরাগ (রাগ) এবং শক্তি উপাসনার মাধ্যমেই সেই নিরাকার সত্তাকে উপলব্ধি করা
সম্ভব, যিনি সৃষ্টির মূলে অবস্থান করছেন। শক্তিহীন বা কপট সাধক
কখনোই সেই জ্ঞান লাভ করতে পারে না।