আছে মায়ের ওতে জগৎপিতা ভেবে দেখ না- হেলা কর না
(৩৬)
আছে মায়ের ওতে
জগৎপিতা
ভেবে দেখ না-
হেলা কর না
বেলা মের না
ৼ
নিষ্কামী নির্বিকারী
হয়ে
দাঁড়াও মায়ের
শরণ লয়ে
বর্তমানে দেখ
চেয়ে
আছে স্বরূপ
রূপ নিশানা ৼ
লামে আলেফ লুকায়
যমন
মানুষে সাঁই
আছে তমন
আকারে সাকার
ঝাপা মন
সামান্যে কি
যায় জানা ৼ
যমন মাতা তমন
পিতা সে
চিরদিন সাগরে
ভাসে
লালন বলে কর
দিশে
ঘরের মধ্যে
ঘরখানা ৼ
প্রথম স্তবক: মায়ের মধ্যে
জগৎপিতা
"আছে
মায়ের ওতে জগৎপিতা ভেবে দেখ না- হেলা কর না বেলা
মের না ৼ"
- আছে মায়ের ওতে জগৎপিতা: মায়ের (প্রকৃতি, সৃষ্টিকারিণী
শক্তি বা মাতৃরূপী ঈশ্বর) মধ্যেই জগৎপিতা (সৃষ্টিকর্তা, পরম
পুরুষ) বিরাজমান। এটি শক্তি (নারী সত্তা) এবং শিব (পুরুষ সত্তা) বা প্রকৃতি ও
পুরুষের একীভূত রূপের ধারণা দেয়, যেখানে সৃষ্টি ও স্রষ্টা
একই উৎস থেকে উদ্ভূত।
- ভেবে দেখ না- হেলা কর না: এই গভীর সত্যটি তুমি
(হে মন) ভালোভাবে ভেবে দেখো। এটিকে অবহেলা করো না।
- বেলা
মের না:
সময় নষ্ট করো না। (সময় থাকতে এই সত্য উপলব্ধির
আহ্বান)।
দ্বিতীয় স্তবক: নিষ্কামী হয়ে
মায়ের শরণ
"নিষ্কামী
নির্বিকারী হয়ে দাঁড়াও মায়ের শরণ লয়ে বর্তমানে
দেখ চেয়ে
আছে স্বরূপ রূপ নিশানা ৼ"
- নিষ্কামী নির্বিকারী হয়ে: সমস্ত কামনা-বাসনা
ত্যাগ করে
নিষ্কামী (ফলাকাঙ্ক্ষাহীন) এবং কোনো
বিকার বা পরিবর্তনহীন নির্বিকারী হয়ে।
- দাঁড়াও মায়ের শরণ লয়ে: সেই মায়ের (পরম
সত্তার) আশ্রয় বা শরণাপন্ন হও।
- বর্তমানে দেখ চেয়ে: বর্তমানের দিকে তাকিয়ে
দেখো, এই মুহূর্তেই উপলব্ধি করার চেষ্টা করো।
- আছে স্বরূপ রূপ নিশানা: (এই বর্তমানে বা তোমার নিজের
মধ্যেই) সেই স্বরূপ (প্রকৃত রূপ) বা নিশানা
(চিহ্ন) বিদ্যমান। অর্থাৎ, পরমাত্মার
অস্তিত্ব ও তার রূপ মানবদেহের মধ্যেই উপলব্ধি করা সম্ভব।
তৃতীয় স্তবক: সাঁইয়ের অদৃশ্য
অবস্থান
"লামে
আলেফ লুকায় যমন মানুষে সাঁই আছে তমন আকারে
সাকার ঝাপা মন
সামান্যে কি যায় জানা ৼ"
- লামে আলেফ লুকায় যমন: আরবি 'লাম' (ل) অক্ষরের মধ্যে যেমন 'আলেফ' (ا) অক্ষরটি লুকানো থাকে (কিছু ক্যালিগ্রাফি স্টাইলে 'লাম' অক্ষরটি
'আলেফ' এর উপর নির্ভর করে গঠিত হয়)। এটি বর্ণমালার মাধ্যমে একটি গভীর
রহস্যকে ইঙ্গিত করে।
- মানুষে সাঁই আছে তমন: ঠিক তেমনিভাবে মানুষের (মানবদেহের) মধ্যেই সাঁই (ঈশ্বর) লুকানো আছেন। এটি
লালনের দেহ-তত্ত্বের মূল কথা।
- আকারে সাকার ঝাপা মন: সাকার (রূপধারী) বস্তুর
মধ্যে মন
ঝাঁপিয়ে পড়ে (আবদ্ধ হয়) বা লিপ্ত থাকে।
- সামান্যে কি যায় জানা: (যদি মন জাগতিক বিষয়েই
আবদ্ধ থাকে) তাহলে কি সেই সামান্য জ্ঞানে বা সাধারণ উপায়ে সেই পরম সত্যকে
জানা যায়? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, সাধারণ জ্ঞানে তা সম্ভব নয়)।
চতুর্থ স্তবক: আত্ম-অনুসন্ধান ও
জীবনের অর্থ
"যমন
মাতা তমন পিতা সে চিরদিন সাগরে ভাসে লালন
বলে কর দিশে
ঘরের মধ্যে ঘরখানা ৼ"
- যমন মাতা তমন পিতা সে: তিনি (পরম সত্তা) যেমন মাতা
(প্রকৃতি বা সৃষ্টিকারিণী), তেমনি পিতা (স্রষ্টা বা পালনকারী)।
অর্থাৎ, তিনি দ্বৈততার ঊর্ধ্বে এক অখণ্ড সত্তা।
- চিরদিন সাগরে ভাসে: সেই সত্তা বা তার প্রকাশ
চিরকাল সাগরে (সংসার সমুদ্র বা অস্তিত্বের মধ্যে) ভাসমান।
- লালন বলে কর দিশে: লালন ফকির বলেন, তুমি
(হে মন)
দিশে করো (জ্ঞান লাভ করো, সঠিক
পথ খুঁজে বের করো)।
- ঘরের মধ্যে ঘরখানা: সেই জ্ঞানটি হলো ঘরের মধ্যে ঘরখানা কে চেনা। এখানে 'ঘর' হলো
মানবদেহ, আর 'ঘরের মধ্যে ঘরখানা' হলো সেই দেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত প্রকৃত
আত্মসত্তা বা পরমাত্মা। এটি আত্মানুসন্ধান এবং নিজের ভেতরের ঈশ্বরকে খুঁজে
পাওয়ার কথা বলে।
মূল বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির মানবদেহকেই পরম সত্তার মন্দির হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন যে, সৃষ্টিকর্তা
কোনো দূরবর্তী সত্তা নন,
বরং তিনি মাতা ও পিতা উভয় রূপে মানবদেহের মধ্যেই
বিদ্যমান। নিষ্কামী হয়ে বর্তমানের দিকে মনোযোগ দিলে এবং নিজের ভেতর অনুসন্ধান
করলেই সেই পরম সত্তাকে উপলব্ধি করা সম্ভব।