cover

cover

আছে যার মনের মানুষ মনে সেকি জপে মালা

 


(৩৫)

আছে যার মনের মানুষ মনে

সেকি জপে মালা।

অতি নির্জনে সে বসে বসে

দেখছে খেলা

 

কাছে রয় সেই উচ্চস্বরে, ডাকে তারে

কোন পাগেলা।

যে যা বোঝে, সেই তা বুঝে

থাকরে ভোলা

 

যথা যার ব্যথা নেহাত, সেইখানে হাত

ডলামলা।

তেমনি যেন মনের মানুষ

মনে তোলা

 

যে জন দেখে সে রূপ, করিয়ে চুপ

রয় নিরালা।

লালন ভেড়ের লোক জানানো

মুখে হরি হরি বলা


প্রথম স্তবক: অন্তর্মুখী সাধনা

"আছে যার মনের মানুষ মনে সেকি জপে মালা। অতি নির্জনে সে বসে বসে দেখছে খেলা ৼ"

  • আছে যার মনের মানুষ মনে: যার মনের মানুষ (অর্থাৎ, পরমাত্মা বা ঈশ্বর) তার নিজের মনের ভেতরেই বিরাজমান
  • সেকি জপে মালা: সে কি (বাহ্যিকভাবে) মালা জপ করবে? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, যার অন্তরে ঈশ্বর আছেন, তার বাহ্যিক মাল জপের প্রয়োজন নেই)
  • অতি নির্জনে সে বসে বসে: সে (প্রকৃত সাধক) অত্যন্ত নির্জনে, একাকী বসে বসে
  • দেখছে খেলা: (ভেতরে বসে) সেই (মনের মানুষের বা পরম সত্তার) লীলা বা খেলা দেখছে। এটি বোঝায়, প্রকৃত সাধনা হলো অন্তরের গভীরে ডুব দিয়ে পরমাত্মার অনুভব করা

দ্বিতীয় স্তবক: জাগতিক জ্ঞান ও নির্বোধের পথ

"কাছে রয় সেই উচ্চস্বরে, ডাকে তারে কোন পাগেলা। যে যা বোঝে, সেই তা বুঝে থাকরে ভোলা ৼ"

  • কাছে রয় সেই উচ্চস্বরে, ডাকে তারে: সেই (পরমাত্মা) তো কাছেই আছেন, (অথচ তাকে) উচ্চস্বরে কে ডাকে?
  • কোন পাগেলা: (এমন করে) কোন পাগলা বা নির্বোধ ব্যক্তি ডাকে? (এটি বোঝায়, যা কাছেই আছে, তাকে বাইরে চিৎকার করে ডাকার কোনো মানে হয় না)
  • যে যা বোঝে, সেই তা বুঝে: (এই বিষয়ে) যে ব্যক্তি যা বোঝে, সে তাই বুঝেই থাকে (তার নিজস্ব উপলব্ধি অনুযায়ী)
  • থাকরে ভোলা: হে মন, তুমি সহজ-সরল বা ভোলা (নির্বোধ) হয়েই থাকো। (অর্থাৎ, গভীর তত্ত্ব না বুঝে বাহ্যিক আচারে লিপ্ত থাকো)

তৃতীয় স্তবক: অন্তরে বেদনা ও তার সমাধান

"যথা যার ব্যথা নেহাত, সেইখানে হাত ডলামলা। তেমনি যেন মনের মানুষ মনে তোলা ৼ"

  • যথা যার ব্যথা নেহাত: যেখানে যার কষ্ট বা ব্যথা (শারীরিক বা মানসিক) একান্তভাবে বিদ্যমান
  • সেইখানে হাত ডলামলা: সেখানেই সে হাত দিয়ে ডলে বা ম্যাসাজ করে (অর্থাৎ, সরাসরি সেই সমস্যার সমাধান করার চেষ্টা করে)
  • তেমনি যেন মনের মানুষ: ঠিক তেমনিভাবে মনের মানুষ (পরমাত্মা)
  • মনে তোলা: তাকে নিজের মনের মধ্যেই (অনুসন্ধান করে) তুলে ধরতে হয় বা উপলব্ধি করতে হয়। এটি বোঝায়, সমস্যার সমাধান যেমন তার উৎসস্থলেই মেলে, তেমনি মনের মানুষকেও মন থেকেই খুঁজতে হয়

চতুর্থ স্তবক: নীরব সাধনা ও বাহ্যিকতার সমালোচনা

"যে জন দেখে সে রূপ, করিয়ে চুপ রয় নিরালা। লালন ভেড়ের লোক জানানো মুখে হরি হরি বলা ৼ"

  • যে জন দেখে সে রূপ: যে ব্যক্তি সেই (মনের মানুষের) রূপ দর্শন করে বা তাকে উপলব্ধি করে
  • করিয়ে চুপ: সে চুপ করে থাকে, নীরবতা অবলম্বন করে
  • রয় নিরালা: সে একান্তে থাকে, নিভৃতে থাকে। (প্রকৃত উপলব্ধি লোক দেখানো হয় না)
  • লালন ভেড়ের লোক জানানো: লালন (নিজেকে বিনয়ের সাথে 'ভেড়ে' বা নির্বোধ বলে) বলছেন, অন্যদেরকে জানানো বা লোক দেখানো
  • মুখে হরি হরি বলা: শুধু মুখে 'হরি হরি' বলা (নাম জপ করা)। এটি বাহ্যিক ভজন-পূজনের চেয়ে নীরব ও অভ্যন্তরীণ সাধনার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করে

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির বলেছেন যে, প্রকৃত আধ্যাত্মিক সাধনা হলো অন্তর্মুখী। যার হৃদয়ে ঈশ্বর বিরাজমান, তার জন্য বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান, যেমন মালা জপা বা উচ্চস্বরে ডাকা, অপ্রয়োজনীয়। তিনি নীরব আত্মানুসন্ধান এবং নিজের ভেতরের পরমাত্মাকে উপলব্ধি করার ওপর জোর দিয়েছেন, যা জাগতিক প্রদর্শন বা লোক দেখানোর বিষয় নয়


Powered by Blogger.