cover

cover

আছে দিন দুনিয়ায় অচিন মানুষ একজনা

 


(৩৪)

আছে দিন দুনিয়ায় অচিন মানুষ একজনা।

কাজের বেলায় পরশমণি

আর সময় তারে চেন-না

 

নবী আলী এই দুইজনে

কালমাদাতা কুল আরফিনে

বে-কালমায় সে অচিনজনে

পীরের পীর হয় জানে

 

যেদিনে সাঁই ডিম্বুভরে

ভেসেছিলেন একেশ্বরে

অচিন মানুষ এসে তারে

দোসর হল তৎক্ষণাৎ

 

কেউ তারে জেনেছে দড়

খোদার ছোট নবীর বড়

লালন বলে নড় চড়

সে নইলে কুল পাবা না


আপনি লালন ফকিরের একটি অত্যন্ত গভীর এবং রহস্যময় গান দিয়েছেন, যেখানে তিনি "অচিন মানুষ" নামক এক পরম সত্তার কথা বলেছেন। এই অচিন মানুষটি হলেন সেই নিরাকার সত্তা, যিনি সৃষ্টির মূলে এবং নবী-রাসুলগণেরও আদি উৎস। গানটি সৃষ্টিকর্তা, নবী এবং সৃষ্টির রহস্য নিয়ে বাউল দর্শনের গভীর তত্ত্ব তুলে ধরেছে।


প্রথম স্তবক: অচিন মানুষের পরিচয়

"আছে দিন দুনিয়ায় অচিন মানুষ একজনা। কাজের বেলায় পরশমণি আর সময় তারে চেন-না ৼ"

  • আছে দিন দুনিয়ায়: এই দিন-দুনিয়ায় (পৃথিবী ও পরকাল, বা সমগ্র সৃষ্টিতে)
  • অচিন মানুষ একজনা: একজন অচিন মানুষ আছেন। 'অচিন মানুষ' বলতে এখানে পরমাত্মা, যিনি অজানা, অপ্রাপ্য এবং সাধারণ দৃষ্টিতে অদৃশ্য। তিনি এক ও অদ্বিতীয়
  • কাজের বেলায় পরশমণি: যখন কাজের প্রয়োজন হয় (অর্থাৎ, সৃষ্টির জন্য বা কোনো কার্যসিদ্ধির জন্য), তখন তিনি পরশমণি (যা লোহাকে সোনা করে দেয়) এর মতো কার্যকরী হন। অর্থাৎ, তাঁর স্পর্শে সব অসম্ভব সম্ভব হয়, তিনি রূপান্তরকারী শক্তি
  • আর সময় তারে চেন-না: (কিন্তু) সাধারণ সময়ে তাঁকে চেনা যায় না বা উপলব্ধি করা যায় না। এটি পরমাত্মার রহস্যময়তা এবং তাঁর অপ্রাপ্যতার ইঙ্গিত

দ্বিতীয় স্তবক: নবী, আলী ও অচিন মানুষ

"নবী আলী এই দুইজনে কালমাদাতা কুল আরফিনে বে-কালমায় সে অচিনজনে পীরের পীর হয় জানে ৼ"

  • নবী আলী এই দুইজনে: নবী (হযরত মুহাম্মদ সা.) এবং আলী (তাঁর জামাতা ও ইসলামে বিশেষ সম্মানিত ব্যক্তি) এই দুজনই
  • কালমাদাতা কুল আরফিনে: তাঁরা হলেন কালমাদাতা (বাণীর বা জ্ঞানের দাতা) এবং কুল আরফিনে (আরিফগণের কুল বা বংশ, অর্থাৎ যারা জ্ঞানী ও দ্রষ্টা, তাদের উৎস)। এটি তাঁদের আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব ও বংশপরম্পরার ইঙ্গিত
  • বে-কালমায় সে অচিনজনে: কিন্তু সেই অচিন মানুষ হলেন বে-কালমা (বাণীহীন, বাক্যহীন বা অকথ্য)। তিনি সকল বাণীর ঊর্ধ্বে
  • পীরের পীর হয় জানে: তিনিই সকল পীরের (আধ্যাত্মিক গুরু) পীর অর্থাৎ আদি গুরু। এটি অচিন মানুষের সর্বজনীন ও আদিম সত্তাকে নির্দেশ করে

তৃতীয় স্তবক: সৃষ্টির আদিম রূপ

"যেদিনে সাঁই ডিম্বুভরে ভেসেছিলেন একেশ্বরে অচিন মানুষ এসে তারে দোসর হল তৎক্ষণাৎ ৼ"

  • যেদিনে সাঁই ডিম্বুভরে: যেদিন সাঁই (ঈশ্বর) ডিম্বুভরে (মহাজাগতিক ডিম্ব রূপে) ছিলেন। এটি সৃষ্টির আদিতে বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের এক আদিম, বীজাকার ধারণাকে বোঝায়
  • ভেসেছিলেন একেশ্বরে: তিনি (সাঁই) সেই অবস্থায় একাকী (একশ্বরে) ভাসমান ছিলেন
  • অচিন মানুষ এসে তারে: সেই সময়ই অচিন মানুষ (সেই পরম সত্তা)
  • দোসর হল তৎক্ষণাৎ: তাঁর (সাঁইয়ের) দোসর (সঙ্গী, সহায়) হয়ে তৎক্ষণাৎ উপস্থিত হলেন। এটি বোঝায় যে, সৃষ্টির আদিতেই এই অচিন মানুষের অস্তিত্ব ছিল এবং তিনি সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ঈশ্বরের সঙ্গী বা সহায়

চতুর্থ স্তবক: অচিন মানুষের মাহাত্ম্য ও মুক্তির পথ

"কেউ তারে জেনেছে দড় খোদার ছোট নবীর বড় লালন বলে নড় চড় সে নইলে কুল পাবা না ৼ"

  • কেউ তারে জেনেছে দড়: কেউ কেউ তাঁকে (অচিন মানুষটিকে) খুব দৃঢ়ভাবে বা গভীরভাবে জেনেছে
  • খোদার ছোট নবীর বড়: (তাঁকে এমনভাবে দেখা হয়েছে যে,) তিনি খোদার (আল্লাহর) চেয়ে ছোট (প্রকাশের দিক থেকে গৌণ) কিন্তু নবীর (মুহাম্মদ সা.) চেয়ে বড় (আদিমত্বের দিক থেকে)। এটি অচিন মানুষের রহস্যময় অবস্থানকে বোঝায়, যিনি সৃষ্টি ও সৃষ্টির প্রকাশ উভয়েরই ঊর্ধ্বে
  • লালন বলে নড় চড়: লালন ফকির বলেন, তুমি (হে মন) নড়াচড়া করো (অনুসন্ধান করো, তাকে পাওয়ার চেষ্টা করো)
  • সে নইলে কুল পাবা না: যদি সেই অচিন মানুষকে উপলব্ধি না করা যায়, তাহলে এই ভব-সমুদ্রে কোনো কূল (কিনার বা মুক্তি) পাওয়া যাবে না। এটি অচিন মানুষ বা আত্মোপলব্ধির গুরুত্বকে চরমভাবে তুলে ধরেছে

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির অচিন মানুষ নামক এক রূপক সত্তার মাধ্যমে পরম ব্রহ্ম বা আদি কারণের পরিচয় তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন যে, এই অচিন মানুষই সৃষ্টির মূলে, নবী-রাসুলগণেরও আদি উৎস, এবং তাঁকে উপলব্ধি না করতে পারলে এই ভববন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব নয়। এটি একটি গভীর আধ্যাত্মিক আহ্বান, যা আত্মানুসন্ধানের মাধ্যমে পরম সত্যকে জানার কথা বলে


Powered by Blogger.