আজো করছে সাঁই ব্রহ্মাণ্ডের অপার নিলে
(৩৩)
আজো করছে সাঁই
ব্রহ্মাণ্ডের অপার নিলে।
নৈরাকারে ভেসেছিল
যেরূপ হালে ৼ
নৈরাকারে গম্ভু
ভারি
আমি কি তাই
বুঝতে পারি
কিঞ্চিৎ প্রকমাণ
তারি
শুনি সংকূলে
ৼ
অ-বিম্বু উথলিয়ে
নির
হয়েছিল নৈরাকার
ডিম্বুরূপ হয়
গো তার
সৃষ্টির ছলে
ৼ
আপ্তত্ত্ব আপনি
ফানা
মিছে করি পড়াশুনা
লালন বলে যাবে
জানা
আপনারে আপনি
চিনিলে ৼ
প্রথম স্তবক: সৃষ্টিকর্তার লীলা
ও নিরাকার রূপ
"আজো
করছে সাঁই ব্রহ্মাণ্ডের অপার নিলে। নৈরাকারে ভেসেছিল যেরূপ হালে
ৼ"
- আজো করছে সাঁই: আজও সাঁই (ঈশ্বর, পরম
সত্তা)।
- ব্রহ্মাণ্ডের অপার নিলে: ব্রহ্মাণ্ডের
(মহাবিশ্বের) অপার বা অসীম লীলা (খেলা)। অর্থাৎ, ঈশ্বর
আজও এই বিশাল মহাবিশ্বে তাঁর অসীম লীলা করে চলেছেন।
- নৈরাকারে ভেসেছিল: তিনি নিরাকার অবস্থায়
(কোনো রূপ বা আকার ছাড়া) ভাসমান ছিলেন।
- যেরূপ হালে: যে অবস্থায় বা রূপে। এটি
সৃষ্টির আদিতে ঈশ্বরের রূপহীন, অপরিমেয় সত্তাকে বোঝায়।
দ্বিতীয় স্তবক: নিরাকারের
গভীরতা ও আংশিক উপলব্ধি
"নৈরাকারে
গম্ভু ভারি
আমি কি তাই বুঝতে পারি কিঞ্চিৎ
প্রকমাণ তারি
শুনি সংকূলে ৼ"
- নৈরাকারে গম্ভু ভারি: নিরাকার সত্তা বা সেই
রূপহীন অবস্থা অত্যন্ত গভীর ও গুরুগম্ভীর (দুর্বোধ্য)।
- আমি কি তাই বুঝতে পারি: আমি কি সেই নিরাকার
সত্তাকে পুরোপুরি বুঝতে পারি? (এটি মানব মনের সীমাবদ্ধতা
প্রকাশ করে)।
- কিঞ্চিৎ প্রকমাণ তারি: তারই কিছু প্রকমাণ
(প্রকাশ বা প্রমাণ) বা আভাস।
- শুনি সংকূলে: আমরা অল্প কিছু বুঝি বা
সংকীর্ণ পরিসরে শুনি। এটি বোঝায় যে, সেই অসীম রহস্যের সামান্য
অংশই মানুষের পক্ষে উপলব্ধি করা সম্ভব।
তৃতীয় স্তবক: সৃষ্টির আদি রূপ
"অ-বিম্বু
উথলিয়ে নির
হয়েছিল নৈরাকার ডিম্বুরূপ
হয় গো তার
সৃষ্টির ছলে ৼ"
- অ-বিম্বু উথলিয়ে নির: 'বিম্বু' বলতে
শুক্র বা বীজকে বোঝায়। 'অ-বিম্বু' হলো যা বীজ থেকে
উৎপন্ন নয়, অর্থাৎ আদিম,
অনাদি সত্তা। সেই অনাদি সত্তা উথলিয়ে
(উচ্ছ্বসিত হয়ে, প্রকাশিত হয়ে) 'নির' (বিশুদ্ধ,
নিরাকার রূপ) ধারণ করে।
- হয়েছিল নৈরাকার: (সেই নির) নিরাকার অবস্থায় ছিল।
- ডিম্বুরূপ হয় গো তার: তারই ডিম্বুরূপ
(আদি ডিম্ব, মহাজাগতিক ডিম্ব বা সৃষ্টির
বীজ) সৃষ্টি হয়। এটি উপনিষদীয় বা পৌরাণিক সৃষ্টির ধারণার সঙ্গে
সাদৃশ্যপূর্ণ,
যেখানে বিশ্বকে এক মহাজাগতিক ডিম্ব থেকে উদ্ভূত বলে
মনে করা হয়।
- সৃষ্টির ছলে: সৃষ্টির ছলনায় বা সৃষ্টির
উদ্দেশ্যেই। অর্থাৎ,
সেই নিরাকার সত্তা নিজেই সৃষ্টির প্রয়োজনে এক
ডিম্বাকার রূপ ধারণ করেন।
চতুর্থ স্তবক: আত্ম-উপলব্ধির পথ
"আপ্তত্ত্ব
আপনি ফানা
মিছে করি পড়াশুনা লালন
বলে যাবে জানা
আপনারে আপনি চিনিলে ৼ"
- আপ্তত্ত্ব আপনি ফানা: আত্ম-তত্ত্ব (নিজেকে
জানার জ্ঞান) নিজেই ফানা (বিলীন
হয়ে যাওয়া, নষ্ট হওয়া বা আত্মবিস্মৃতি)। অর্থাৎ, আমরা নিজের সম্পর্কে
জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছি বা আত্মতত্ত্বকে উপেক্ষা করছি।
- মিছে করি পড়াশুনা: (তাই) আমাদের সমস্ত পড়াশুনা বা
জ্ঞানচর্চা মিথ্যা হয়ে যায়। এটি বাহ্যিক জ্ঞান বা পুঁথিগত বিদ্যার
সীমাবদ্ধতা নির্দেশ করে।
- লালন বলে যাবে জানা: লালন ফকির বলেন, (সেই নিরাকার সত্তা বা সৃষ্টির রহস্য) জানা যাবে।
- আপনারে আপনি চিনিলে: যদি নিজেকেই নিজে চেনা যায় বা উপলব্ধি করা
যায়। এটি লালনের দেহ-তত্ত্বের মূল কথা, যেখানে পরম সত্যকে
মানবদেহের মধ্যেই অনুসন্ধানের কথা বলা হয়েছে।
মূল বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির বলেছেন যে, সৃষ্টিকর্তা আদিতে নিরাকার অবস্থায় ছিলেন এবং তাঁর অসীম
লীলার অংশ হিসেবেই এই বিশ্ব সৃষ্টি হয়েছে। সেই নিরাকার সত্তাকে সম্পূর্ণভাবে বোঝা
মানুষের পক্ষে কঠিন হলেও,
নিজেকে জানার মাধ্যমেই সেই পরম সত্যকে উপলব্ধি করা
সম্ভব। বাহ্যিক জ্ঞান বা পড়াশুনা নয়, বরং আত্ম-উপলব্ধিই হলো সেই রহস্য
উন্মোচনের আসল চাবিকাঠি।