আছে রে ভাবের গোলা আসমানে তার মহাজন কোথা
(৩২)
আছে রে ভাবের
গোলা আসমানে
তার মহাজন কোথা।
কে জানে কারে
শুধায় সেই কথা ৼ
জমিনেতে মেওয়া
ফলে
আসমানে বরিষণ
হলে
কমে না আর কোন
কালে
তার মন-লতা
ৼ
রবি শশী হয়
সৃষ্টি
কারণ দেখ সেই
গোলটি
নেগবান তার
দুইটি
আছে যে যথা
ৼ
ধন্য ধনী ধন্য
কারবার
চেয়ে দেখলাম
না তার বাড়িঘর
লালন বলে জন্ম
আমার
যায় বৃথা ৼ
প্রথম স্তবক: ভাবের গোলা ও
মহাজনের প্রশ্ন
"আছে রে
ভাবের গোলা আসমানে তার মহাজন কোথা। কে জানে
কারে শুধায় সেই কথা ৼ"
- আছে রে ভাবের গোলা আসমানে: আকাশে (বা ঊর্ধ্বে, অসীমে) ভাবের গোলা রয়েছে। 'ভাবের
গোলা' বলতে এখানে সৃষ্টি, জ্ঞান, আনন্দ বা আধ্যাত্মিক
ভাবের উৎস বা ভাণ্ডারকে বোঝানো হয়েছে।
- তার মহাজন কোথা: সেই ভাবের গোলার 'মহাজন' (সৃষ্টিকর্তা,
মূল সত্তা বা ঈশ্বর) কোথায়?
- কে জানে কারে শুধায় সেই কথা: এই
গভীর প্রশ্নটি কে জানে এবং কাকে জিজ্ঞাসা করা যায়? (অর্থাৎ,
এই রহস্য কেউই জানে না বা এর কোনো নির্দিষ্ট
উত্তরদাতা নেই)।
দ্বিতীয় স্তবক: সৃষ্টির ক্রম ও
তার উৎস
"জমিনেতে
মেওয়া ফলে
আসমানে বরিষণ হলে কমে না
আর কোন কালে
তার মন-লতা ৼ"
- জমিনেতে মেওয়া ফলে: পৃথিবীতে (বা জাগতিক স্তরে) মেওয়া
(ফল বা ফসল) উৎপন্ন হয়। এটি সৃষ্টির ফল বা প্রকাশকে
বোঝায়।
- আসমানে
বরিষণ হলে: যখন আকাশ থেকে (দিব্য জগৎ থেকে) বরিষণ
(বৃষ্টি বা ঐশ্বরিক কৃপা) হয়।
- কমে
না আর কোন কালে: তখন (সেই মেওয়ার ফলন) আর কোনো সময়ে
কমে না। অর্থাৎ,
ঐশ্বরিক কৃপায় সৃষ্টি ও প্রকাশ অনন্তকাল ধরে চলতে
থাকে।
- তার
মন-লতা:
সেই 'ভাবের গোলা'র
বা মহাজনের মন-লতা। 'মন-লতা' বলতে
তাঁর ইচ্ছা, আকাঙ্ক্ষা বা সৃষ্টি-শক্তিকে বোঝায় যা কখনো ফুরিয়ে যায় না।
তৃতীয় স্তবক: রবি শশী ও তাদের
নিয়ন্ত্রণ
"রবি শশী হয় সৃষ্টি কারণ দেখ সেই গোলটি নেগবান তার দুইটি আছে যে যথা ৼ"
- রবি শশী হয় সৃষ্টি: সূর্য (রবি) এবং চন্দ্র
(শশী) উভয়ই সৃষ্টি হয়েছে।
- কারণ দেখ সেই গোলটি: এই সৃষ্টির কারণ হলো সেই গোলটি
(অর্থাৎ, মহাবিশ্বের বা সৃষ্টির
গোলাকার রূপ, বা সেই পরম সত্তার একত্ব)।
- নেগবান তার দুইটি: তার (সেই গোল বা সৃষ্টির) দুইটি নেগবান
(রক্ষক বা তত্ত্বাবধায়ক) আছে। এটি সম্ভবত দিন ও রাত, আলো
ও আঁধার, বা পুরুষ ও প্রকৃতি এই দ্বৈত শক্তিকে বোঝায় যা সৃষ্টির ভারসাম্য
রক্ষা করে।
- আছে যে যথা: তারা যেখানে থাকার কথা, সেখানেই
আছে, অর্থাৎ সবকিছু সুশৃঙ্খলভাবে চলছে।
চতুর্থ স্তবক: আত্ম-আক্ষেপ ও
জন্ম বৃথা
"ধন্য
ধনী ধন্য কারবার চেয়ে দেখলাম না তার বাড়িঘর লালন
বলে জন্ম আমার
যায় বৃথা ৼ"
- ধন্য ধনী ধন্য কারবার: সেই পরম সত্তার ধন বা
ঐশ্বর্য ধন্য,
এবং তাঁর কারবার (সৃষ্টির
প্রক্রিয়া বা জগৎ পরিচালনা) ধন্য।
- চেয়ে দেখলাম না তার বাড়িঘর: কিন্তু
আমি (লালন) তাঁর বাড়িঘর (অর্থাৎ, তাঁর
প্রকৃত স্থান,
তাঁর স্বরূপ বা অস্তিত্ব) চেয়েও দেখতে পেলাম না।
এটি পরম সত্তাকে উপলব্ধি করতে না পারার আক্ষেপ।
- লালন বলে জন্ম আমার: লালন ফকির বলেন, আমার
জীবন বা জন্ম।
- যায় বৃথা: বৃথা হয়ে যাচ্ছে বা নিষ্ফল
হচ্ছে। এটি জ্ঞানের অভাব এবং মূল সত্যকে উপলব্ধি করতে না পারার চরম অনুশোচনা।
মূল বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির মহাজনের (সৃষ্টিকর্তার) সৃষ্টিরহস্যের মহিমা স্বীকার করেছেন, কিন্তু
একই সাথে সেই রহস্যময় সত্তাকে উপলব্ধি করতে না পারার জন্য নিজের আক্ষেপ প্রকাশ
করেছেন। তিনি এই জগতের শৃঙ্খলা এবং সৃষ্টির অপূর্ব লীলার প্রশংসা করলেও, তার মূল
উৎসকে না জানার কারণে নিজের জীবনকে বৃথা মনে করছেন।