cover

cover

আমি বাঁধি কোন মোহনা

 


(৮৯)

আমি বাঁধি কোন মোহনা।

আমার দেহ নদীর বেগ গেল না

 

নদীতে নামি নামি আশায় করি

মাঝখানে সাপের হাড়ি

কুমিরেই থানা;

ছয় কুমিরেই যুক্তি করে

ঐ নদীতে দিচ্ছে হানা

 

কালিদার পূর্ব ঘাটে

তিন নালে এক ফুল ফুটে

সে ফুল তুলতে যেয়োন না;

সে ফুল তুলি তুলি আশায়

ছয় পাগলের গোল গেল না

 

বে-যোগেতে চান করিতে যায়

সে তো মানুষ মরা খায়

সে ঘাটের ছন্দি জানে না;

লালন কয় সে ঘাটে ইন্দ্ররিপু

আমি তারে চিনি না


স্তবকভিত্তিক ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ

১. প্রথম স্তবক: নিয়ন্ত্রণের অভাব

"আমি বাঁধি কোন মোহনা। আমার দেহ নদীর বেগ গেল না ৼ"

  • মোহনা: নদীর মিলনস্থল বা বাঁধ। এখানে আত্মনিয়ন্ত্রণের শক্তি বোঝানো হয়েছে
  • দেহ নদীর বেগ: মানুষের জৈবিক চাহিদা, আবেগ এবং অস্থিরতা
  • সারকথা: লালন আক্ষেপ করছেন যে, তিনি হাজার চেষ্টা করেও তাঁর দেহের চঞ্চলতা ও প্রবৃত্তির স্রোতকে কোনো 'বাঁধ' বা নিয়ম দিয়ে থামাতে পারছেন না

২. দ্বিতীয় স্তবক: ষড়রিপুর আক্রমণ

"নদীতে নামি নামি আশায় করি মাঝখানে সাপের হাড়ি কুমিরেই থানা; ছয় কুমিরেই যুক্তি করে ঐ নদীতে দিচ্ছে হানা ৼ"

  • সাপের হাড়ি: বিপদসংকুল অবস্থা বা কুপ্রবৃত্তি
  • থানা: আস্তানা বা আড্ডা
  • ছয় কুমির: আমাদের ষড়রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য)
  • সারকথা: সাধক যখনই আত্মিক উন্নতির আশায় নিজের অন্তরে প্রবেশ করেন, তখনই তিনি দেখতে পান সেখানে কামনার সাপ আর ছয়টি শক্তিশালী রিপু (কুমির) ওঁৎ পেতে বসে আছে। তারা একজোট হয়ে সাধকের চেতনাকে আক্রমণ করে

৩. তৃতীয় স্তবক: যোগতত্ত্ব ও বিভ্রান্তি

"কালিদার পূর্ব ঘাটে তিন নালে এক ফুল ফুটে সে ফুল তুলতে যেয়োন না; সে ফুল তুলি তুলি আশায় ছয় পাগলের গোল গেল না ৼ"

  • কালিদা: কালীয়দহ বা একটি রূপক আধ্যাত্মিক সরোবর। দেহতত্ত্বে এটি মূলাধার বা বিশেষ কোনো চক্র হতে পারে
  • তিন নাল: যোগশাস্ত্রের তিনটি প্রধান নাড়ী ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না
  • এক ফুল: পরমাত্মা বা সহস্রার চক্রের জ্যোতি
  • ছয় পাগল: পুনরায় ষড়রিপুকে বোঝানো হয়েছে যারা বিভ্রান্ত করে
  • সারকথা: দেহের সূক্ষ্ম পথে যে পরম সত্যের ফুল ফোটে, সঠিক জ্ঞান বা গুরু ছাড়া তা ধরতে গেলে মানুষ আরও বিভ্রান্তিতে পড়ে। ওই 'ছয় পাগল' বা রিপুর চিৎকার তখন সাধককে শান্ত হতে দেয় না

৪. চতুর্থ স্তবক: অযোগ্য সাধনা ও ইন্দ্ররিপু

"বে-যোগেতে চান করিতে যায় সে তো মানুষ মরা খায় সে ঘাটের ছন্দি জানে না; লালন কয় সে ঘাটে ইন্দ্ররিপু আমি তারে চিনি না ৼ"

  • বে-যোগ: সঠিক পদ্ধতি বা গুরুপ্রদত্ত যোগব্যায়াম ছাড়া
  • চান (স্নান): আত্মশুদ্ধি
  • মানুষ মরা খায়: রূপক অর্থেজীবন্ত চেতনা হারিয়ে জড়বস্তু বা মৃতবৎ অভ্যাসে লিপ্ত হওয়া
  • ছন্দি: কৌশল বা রহস্য
  • ইন্দ্ররিপু: ইন্দ্রিয়সমূহের রাজা বা কাম-বাসনার তীব্রতা
  • সারকথা: যে ব্যক্তি গুরুর সাহায্য ছাড়া বা আধ্যাত্মিক নিয়ম না মেনে 'শুদ্ধি'র চেষ্টা করে, সে আসলে নিজের পতন ডেকে আনে। সে ঘাটের গূঢ় রহস্য বা চাতুরী জানে না বলেই কামনার রাজত্বে সে পথ হারায়

মূল শব্দকোষ (Glossary)

শব্দ

আধ্যাত্মিক অর্থ

ছয় কুমির/পাগল

ষড়রিপু (আমাদের ভেতরের ছয়টি নেতিবাচক প্রবৃত্তি)

তিন নালে

ইড়া, পিঙ্গলা ও সুষুম্না নামক তিনটি নাড়ীর প্রবাহ

কালিদা

সাধকের হৃদযন্ত্র বা নাভিদেশ যেখানে সাধনা ঘনীভূত হয়

ইন্দ্ররিপু

ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য লোভ বা কামনা যা আত্মাকে বশ করে

বে-যোগ

সংযোগহীন বা নিয়ম বহির্ভূত ক্রিয়া


গূঢ় দর্শন

এই গানের মূল বার্তা হলোআমাদের শরীর একটি বিপজ্জনক নদীর মতো। এখানে সঠিক 'ছন্দি' (কৌশল) বা 'যোগ' ছাড়া নামলে ষড়রিপু আমাদের গ্রাস করবেই। লালন এখানে নিজের অজ্ঞতা স্বীকার করে আসলে আমাদের সচেতন করছেন যে, গুরু ছাড়া এই 'ইন্দ্ররিপু'দের চেনা বা জয় করা অসম্ভব


Powered by Blogger.