আয় কে যাবি ওপারে। দয়াল চাঁদ মোর দিচ্ছে খেওয়া
(৯৪)
আয় কে যাবি
ওপারে।
দয়াল চাঁদ মোর
দিচ্ছে খেওয়া
অপার সাগরে
ৼ
যে দিবে ঐ নামের
দোহাই
তারে দয়া করবেন
গো সাঁই
এমন দয়াল আর
কেহই নাই
ভব সংসারে ৼ
পার করে সে
জগৎ বেড়ি
লয় (নেয়) না
কারো পারের কড়ি
সেরে শুরে মনের
দেড়ি
ভাব দেনা তারে
ৼ
ঐ (শ্রী) চরণে
দিয়ে ভার
কত পাপী হইল
পার
সিরাজ সাঁই
কয় লালন তোমার
মনের বিগার
যায় না রে ৼ
স্তবকভিত্তিক
ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ
১.
প্রথম স্তবক: পারাপারের আহ্বান
"আয় কে যাবি ওপারে। দয়াল চাঁদ মোর দিচ্ছে খেওয়া অপার সাগরেৼ"
- ওপারে: পরকাল
বা আধ্যাত্মিক মুক্তি (সংসার সমুদ্রের অন্য তীর)।
- দয়াল চাঁদ: পরমাত্মা
বা দয়ালু গুরু (যিনি জ্যোতির মতো পথ দেখান)।
- খেওয়া: নৌকা
পারাপার করা।
- অপার সাগর: কুল-কিনারা
হীন এই মায়াময় পৃথিবী।
- সারকথা: লালন
আহ্বান জানাচ্ছেন, এই তুচ্ছ জগতের মায়া ছেড়ে
যারা মুক্তির পথে যেতে চায়, তারা
যেন চলে আসে। কারণ দয়ালু প্রভু নিজে আজ নৌকার হাল ধরেছেন সবাইকে পার করে
দেওয়ার জন্য।
২.
দ্বিতীয় স্তবক: নামের মাহাত্ম্য
"যে দিবে ঐ নামের দোহাই তারে দয়া করবেন গো সাঁই এমন দয়াল আর কেহই নাই ভব
সংসারে ৼ"
- নামের দোহাই: সৃষ্টিকর্তার
নাম স্মরণ করা বা তাঁর আশ্রয় প্রার্থনা করা।
- সাঁই: স্বামী, প্রভু বা পরম সত্তা।
- ভব সংসার: এই
ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী।
- সারকথা: সাঁই
বা ঈশ্বর এতটাই দয়ালু যে, কেউ
যদি কেবল ভক্তিভরে তাঁর নাম স্মরণ করে, তবেই
তিনি তাকে উদ্ধার করেন। এই স্বার্থপর পৃথিবীতে তাঁর মতো নিঃস্বার্থ বন্ধু আর
কেউ নেই।
৩.
তৃতীয় স্তবক: পারানির কড়ি বনাম অন্তরের ভাব
"পার করে সে জগৎ বেড়ি লয় (নেয়) না কারো পারের কড়ি সেরে শুরে মনের দেরি ভাব
দেনা তারেৼ"
- জগৎ বেড়ি: জগতের
বন্ধন বা মায়া।
- পারের কড়ি: খেয়া
পার হওয়ার ভাড়া (এখানে ধর্মীয় বাহ্যিক আচার বা অর্থ-সম্পদ)।
- সেরে শুরে: পাকাপাকিভাবে
বা সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে।
- ভাব: অন্তরের
প্রেম বা খাঁটি ভক্তি।
- সারকথা: এই
অলৌকিক মাঝি পার করে দেওয়ার জন্য কোনো টাকা-পয়সা বা ধন-সম্পদ নেন না। তিনি
কেবল চান মানুষের অন্তরের 'ভাব' বা ভালোবাসা। তাই মনের সব দ্বিধা ও দেরি ঝেড়ে ফেলে নিজেকে তাঁর কাছে
সঁপে দেওয়াই হলো আসল কাজ।
৪.
চতুর্থ স্তবক: আত্মসমর্পণ ও আত্মোপলব্ধি
"ঐ (শ্রী) চরণে দিয়ে ভার কত পাপী হইল পার সিরাজ সাঁই কয় লালন তোমার মনের
বিগার যায় না রে ৼ"
- ভার দেওয়া: নিজেকে
সম্পূর্ণ সঁপে দেওয়া বা দায়িত্ব অর্পণ করা।
- সিরাজ সাঁই: লালনের
দীক্ষাগুরু।
- বিগার: বিকৃতি, ময়লা বা মনের অস্থিরতা।
- সারকথা: গুরুর
চরণে যারা নিজেকে সমর্পণ করেছে, তারা
অতি বড় পাপী হলেও উদ্ধার পেয়ে গেছে। কিন্তু লালন আক্ষেপ করছেন—তাঁর গুরু সিরাজ সাঁই বলছেন
যে, লালনের মনের ভেতরে যে কুটিলতা বা অস্থিরতা (বিগার), তা এখনো কাটল না। অর্থাৎ, প্রকৃত
আত্মসমর্পণ এখনো হয়নি।
গুরুত্বপূর্ণ
শব্দকোষ (Quick Glossary)
|
শব্দ |
আধ্যাত্মিক অর্থ |
|
খেওয়া |
জন্ম-মৃত্যুর
চক্র থেকে মুক্তি পাওয়ার প্রক্রিয়া। |
|
অপার |
যার
পার বা কিনারা নেই। |
|
পারের কড়ি |
পারলৌকিক
পাথেয়; যা সাধারণত মানুষ পূজা-পার্বণ দিয়ে অর্জন করতে চায়। |
|
ভাব |
ঐশ্বরিক
প্রেম; বাউল দর্শনের মূল ভিত্তি। |
|
বিগার |
মনের
মালিন্য বা সংশয়। |
মূল
দর্শন
এই গানে
লালন একটি সহজ কিন্তু গভীর সত্য বলেছেন—ঈশ্বরের কৃপা পেতে কোনো ধন-সম্পদ লাগে না, কেবল লাগে নিস্কাম ভক্তি। জগতবাসী
যখন পারাপারের 'কড়ি' বা উপায় খুঁজছে, লালন তখন বলছেন—সব ছেড়ে গুরুর চরণে 'ভার' দিয়ে দাও, তবেই এই ভব-সাগর থেকে নিষ্কৃতি মিলবে।