আয় হারালি আমাবতী না মেনে
(৯৩)
আয় হারালি আমাবতী
না মেনে।
ও তোর হয় না
সবুর একদিনে ৼ
একেতে আমাবতীর
বার
মাটি রসে সরোবর
সাধু-গুরু-বৈষ্ণব
তিনে
উদয় হয় রসের
সনে ৼ
ও তুই খোতনা
চাষা ভাই
ও তোর জ্ঞান
কিছুই নাই
অমাবস্যায় হাল
চালিয়ে
কাল হও কেনে
ৼ
যে জন রসিক
চাষা হয়
জমির জো বুঝে
হাল বয়
লালন ফকির পায়না
ফিকির
হাপুর হুপুর
ভাই বোনে ৼ
স্তবকভিত্তিক
ব্যাখ্যা ও শব্দার্থ
১.
প্রথম স্তবক: ধৈর্য ও নিয়ম পালন
"আয় হারালি আমাবতী না মেনে। ও তোর হয় না সবুর একদিনে ৼ"
- আমাবতী: অম্বুবাচী
(ঐতিহ্যগতভাবে ধরিত্রীর ঋতুকাল)। দেহতত্ত্বে এটি নারীর বিশেষ শারীরিক চক্র বা
ঋতুকালকে নির্দেশ করে।
- সবুর: ধৈর্য।
- সারকথা: লালন
বলছেন, হে মন, তুমি নিয়ম না মেনে অম্বুবাচীর পবিত্রতা বা সুযোগ হারিয়ে ফেলেছ। তোমার
সামান্য একদিনের ধৈর্যও সইল না, যার
ফলে আধ্যাত্মিক সম্পদ নষ্ট হলো।
২.
দ্বিতীয় স্তবক: রসের মাহাত্ম্য
"একেতে আমাবতীর বার মাটি রসে সরোবর সাধু-গুরু-বৈষ্ণব তিনে উদয় হয় রসের সনে
ৼ"
- রসে সরোবর: পৃথিবী
যেমন অম্বুবাচীতে রসে সিক্ত থাকে, তেমনি
মানবদেহের এই বিশেষ সময়টি শক্তির আধিক্যে ভরপুর থাকে।
- সাধু-গুরু-বৈষ্ণব: এখানে
এই তিনটি শব্দ দ্বারা সাধনার তিন স্তর বা বিশেষ দিব্য অনুভূতিকে বোঝানো হয়েছে।
- সারকথা: অম্বুবাচীর
সময় প্রকৃতি যেমন উর্বর হয়, সাধকের
দেহও তেমনি রসে পূর্ণ থাকে। এই সময় সঠিক জ্ঞান থাকলে উচ্চতর আধ্যাত্মিক
অনুভূতির (সাধু-গুরু-বৈষ্ণব) উদয় ঘটে।
৩.
তৃতীয় স্তবক: মূর্খতা ও অনিয়মের কুফল
"ও তুই খোতনা চাষা ভাই ও তোর জ্ঞান কিছুই নাই অমাবস্যায় হাল চালিয়ে কাল হও
কেনে ৼ"
- খোতনা চাষা: অদক্ষ, আনাড়ি বা মূর্খ চাষী।
- কাল হওয়া: ধ্বংস
হওয়া বা মৃত্যু ডেকে আনা।
- সারকথা: যে
চাষী জানে না কখন জমিতে হাল দিতে হয়, সে
যেমন ফসল নষ্ট করে, তেমনি যে সাধক দেহের নিয়ম
জানে না, সে অসময়ে কামনায় মত্ত হয়ে
নিজের জীবনীশক্তি ও আধ্যাত্মিক সম্ভাবনা ধ্বংস করে ফেলে।
৪.
চতুর্থ স্তবক: রসিক চাষীর কৌশল
"যে জন রসিক চাষা হয় জমির জো বুঝে হাল বয় লালন ফকির পায়না ফিকির হাপুর হুপুর
ভাই বোনে ৼ"
- রসিক চাষা: যিনি
দেহের গূঢ় রস এবং সময় সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন (প্রকৃত সাধক)।
- জমির জো: চাষের
উপযুক্ত সময় বা মাটির সঠিক অবস্থা।
- ফিকির: উপায়
বা কৌশল।
- হাপুর হুপুর: বিশৃঙ্খলা
বা নিয়ন্ত্রণহীনভাবে ভোগ করা।
- সারকথা: প্রকৃত
রসিক সাধক জানেন কখন ইন্দ্রিয় নিয়ন্ত্রণ করতে হয় এবং কখন সাধনায় বসতে হয়।
লালন আক্ষেপ করছেন যে, তিনি সেই কৌশল বা 'জো' বুঝলেন না; সাধারণ মানুষের মতো নিয়ন্ত্রণহীন জীবনেই তাঁর সময় নষ্ট হলো।
গুরুত্বপূর্ণ
শব্দকোষ
|
শব্দ |
আধ্যাত্মিক অর্থ |
|
আমাবতী |
অম্বুবাচী; দেহতত্ত্বে নারীর বিশেষ শারীরিক চক্র যা সাধনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। |
|
খোতনা চাষা |
যে
সাধক নিজের শরীর ও ইন্দ্রিয় সম্পর্কে অজ্ঞ। |
|
জমির জো |
সাধনার
উপযুক্ত সময় বা মানসিক ও শারীরিক সঠিক অবস্থা। |
|
রসিক |
যিনি
আধ্যাত্মিক রসের তত্ত্ব জানেন এবং ইন্দ্রিয় জয় করেছেন। |
|
ফিকির |
গূঢ়
কৌশল বা আধ্যাত্মিক রহস্য সমাধানের পথ। |
মূল
দর্শন
এই গানে
লালন 'কাম'কে 'প্রেমে' রূপান্তরের কথা বলেছেন। বাউল দর্শনে নারীর ঋতুকালীন সময়কে অত্যন্ত পবিত্র
মনে করা হয় এবং এই সময়ে শারীরিক মিলন বা শক্তির অপচয় নিষিদ্ধ। যারা এই 'জো' বা সময় মানে না, তাদের সাধনা পণ্ড হয়। লালন এখানে আমাদের সতর্ক করছেন যে, কেবল আবেগ দিয়ে নয়, বরং গুরুর কাছে শিক্ষা নিয়ে
দেহের 'ঋতু' বুঝে চললে তবেই সেই 'রসের সনে' পরম সত্যের দেখা মিলবে।