আইন সত্য মানুষ বর্ত কর এই বেলা
(১৮)
আইন সত্য মানুষ
বর্ত কর এই বেলা।
ক্রমে ক্রমে
হৃদ-কমলে
খেলবে নূরের
খেলা ৼ
যে নাম ধরে
চলেছে ভবে
সেই নামেতে
যেতে হবে
একে শূন্য দশ
হইবে
নয় দশে নব্বই
মিলা ৼ
নয়-এ চার শূন্য
দিলে
নব্বই হাজার
কয় দলিলে
সব শূন্য মুছে
ফেলিলে
শুধুরে নয়ের
খেলা ৼ
নয় হতে আট বাদ
দিলে
এক থাকে তার
শেষ কালে
লালন বলে বোঝ
সকলে
সেইটি স্বরূপ
রূপের ভেলা ৼ
প্রথম স্তবক:
"আইন
সত্য মানুষ বর্ত কর এই বেলা। ক্রমে ক্রমে হৃদ-কমলে খেলবে নূরের খেলা ৼ"
- আইন সত্য:
'আইন' মানে নিয়ম, বিধান, বা
নীতি। 'সত্য' মানে পরম সত্য বা ঐশ্বরিক সত্য। এখানে বোঝানো হয়েছে, ঈশ্বরের
যে অলঙ্ঘনীয় নিয়ম বা প্রকৃত সত্য, তা উপলব্ধি করো।
- মানুষ বর্ত কর এই বেলা: 'মানুষ বর্ত করা' মানে
মানবজন্মকে সার্থক করা বা এর সদ্ব্যবহার করা। 'এই বেলা' মানে
এই সময়ে, অর্থাৎ জীবন থাকতে। অতএব, এই সময়ে পরম সত্যকে
উপলব্ধি করে মানবজন্মকে সার্থক করো।
- ক্রমে ক্রমে: ধীরে ধীরে, পর্যায়ক্রমে।
- হৃদ-কমলে: হৃদয়ের পদ্মে। যোগশাস্ত্র
মতে, হৃদয়ে অবস্থিত অনাহত চক্র বা আধ্যাত্মিক কেন্দ্রকে 'হৃদ-কমল' বলা
হয়।
- খেলবে নূরের খেলা: সেখানে (হৃদ-কমলে) 'নূর' (ঐশ্বরিক আলো বা জ্ঞান) খেলা করবে বা প্রকাশিত হবে। এটি আত্মিক জাগরণ
এবং পরম সত্তার উপলব্ধিকে বোঝায়।
দ্বিতীয় স্তবক:
"যে নাম
ধরে চলেছে ভবে
সেই নামেতে যেতে হবে একে
শূন্য দশ হইবে
নয় দশে নব্বই মিলা ৼ"
- যে নাম ধরে চলেছে ভবে: যে (পরম) নাম বা সত্তার
দ্বারা এই জগৎ (ভব) পরিচালিত হচ্ছে বা চলছে।
- সেই নামেতে যেতে হবে: সেই নামের (সত্তা) দিকেই
ফিরে যেতে হবে বা তার সঙ্গে একীভূত হতে হবে। এটি পরমাত্মার সঙ্গে আত্মার
মিলনের ইঙ্গিত।
- একে শূন্য দশ হইবে: 'এক' (ব্রহ্ম) এবং 'শূন্য' (শূন্যতা বা সৃষ্টিপূর্ব অবস্থা) একত্রিত হয়ে 'দশ' হবে।
এটি সৃষ্টি প্রক্রিয়ার একটি সাংকেতিক বর্ণনা, যেখানে এক
(সৃষ্টিকর্তা) থেকে শূন্যতার মাধ্যমে বিশ্ব (দশ) সৃষ্টি হয়েছে। দশ হলো
পূর্ণতা বা সমগ্রতার প্রতীক।
- নয় দশে নব্বই মিলা: নয় (প্রকৃত সত্তা বা
পূর্ণতা) দ্বারা দশকে গুণ করলে নব্বই হয়। এটি হয়তো সৃষ্টির বিভিন্ন স্তর বা
সংখ্যার মধ্যে যে এক নিগূঢ় সম্পর্ক রয়েছে, তা বোঝায়, যেখানে
সবকিছুই এক পরম সত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তৃতীয় স্তবক:
"নয়-এ
চার শূন্য দিলে
নব্বই হাজার কয় দলিলে সব
শূন্য মুছে ফেলিলে শুধুরে নয়ের খেলা ৼ"
- নয়-এ চার শূন্য দিলে: 'নয়'-এর
সাথে চারটি শূন্য যোগ করলে (অর্থাৎ ৯০০০০)। এটি একটি বৃহৎ সংখ্যা, যা
হয়তো সৃষ্টির বিশালত্ব বা ঐশ্বরিক লীলার ব্যাপকতাকে নির্দেশ করে।
- নব্বই হাজার কয় দলিলে: শাস্ত্র বা দলিলে
(জ্ঞানলিপি) নব্বই হাজার বলে উল্লেখ করা হয়। এটি সম্ভবত সৃষ্টির তত্ত্ব বা
রহস্যের এক বিশাল অঙ্ক।
- সব শূন্য মুছে ফেলিলে: যদি সব শূন্য মুছে ফেলা হয়
বা বাদ দেওয়া হয়। এখানে শূন্য মুছে ফেলা মানে জাগতিক ভ্রম, অনিত্যতা
বা বিভ্রমকে দূর করা।
- শুধুরে নয়ের খেলা: তাহলে কেবল 'নয়'-এর
খেলা (বা প্রকৃত সত্তা) অবশিষ্ট থাকে। 'নয়' এখানে
হয়তো ঈশ্বরের নিজস্ব রূপ, পরম সত্য বা সেই অখণ্ড সত্তার প্রতীক, যা
সংখ্যা বা সৃষ্টির ঊর্ধ্বে।
চতুর্থ স্তবক:
"নয় হতে
আট বাদ দিলে
এক থাকে তার শেষ কালে লালন
বলে বোঝ সকলে
সেইটি স্বরূপ রূপের ভেলা ৼ"
- নয় হতে আট বাদ দিলে: নয় (পরম সত্তা বা প্রকৃতি)
থেকে আট (প্রকৃতির অষ্টপাশ বা অষ্টগুণ: পঞ্চভূত, মন, বুদ্ধি, অহংকার
– যা মানুষকে আবদ্ধ করে) বাদ
দিলে।
- এক থাকে তার শেষ কালে: শেষ পর্যন্ত 'এক' অবশিষ্ট
থাকে। এই 'এক' হলো অদ্বিতীয় পরম ব্রহ্ম, যা সকল বিভেদ ও দ্বৈততার
ঊর্ধ্বে।
- লালন বলে বোঝ সকলে: লালন ফকির বলেন, তোমরা
সবাই এটা বোঝো। (উপলব্ধি করার জন্য শ্রোতাদের প্রতি আহ্বান)।
- সেইটি স্বরূপ রূপের ভেলা: সেই 'এক' হলো
পরম সত্তার প্রকৃত স্বরূপ বা রূপ, যা মানুষকে ভবদধি পার করার
জন্য ভেলা বা নৌকার মতো কাজ করে। অর্থাৎ, সেই 'এক' কে
উপলব্ধি করাই মুক্তির পথ।
এই
গানটিতে লালন অদ্বৈত বেদান্ত এবং সুফি দর্শনের গভীর তত্ত্বগুলিকে সাংকেতিক এবং
গাণিতিক রূপকের মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জাগতিক
সংখ্যা এবং ভেদের ঊর্ধ্বে রয়েছে এক অখণ্ড 'এক' বা 'নয়', যা পরম
সত্য এবং মানবজীবনের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত।