অসার ভেবে সার দিন গেল আমার সার বস্তু ধন এবার হলাম রে হারা
(১৭)
অসার ভেবে সার
দিন গেল আমার
সার বস্তু ধন
এবার হলাম রে হারা।
হাওয়া বন্ধ
হলে সব যাবে বিফলে
দেখে শুনে লালচ
গেল না মারা ৼ
গুরু যার সহায়
হয় এ সংসারে
লোভে সঙ্গ দিয়ে
সেই যাবে সেরে
অঘাটায় আজ মরণ
হল আমারে
জানলাম না গুরুর
করণ কি ধারা ৼ
মহতে কয় থাকলে
পূর্ব সুকৃতি
দেখিতে শুনিতে
হয় গুরুপদে মতি
সে সুকৃতি আমার
থাকতো যদি
তবে কি আর আমি
হতাম পামরা ৼ
সময় ছাড়িয়া
জানিলাম এখন
গুরু কৃপা বিনে
বৃথা এ জীবন
বিনয় করে কয়
ফকির লালন
আর কি আমি পাব
অধরা ৼ
প্রথম স্তবক:
"অসার
ভেবে সার দিন গেল আমার সার বস্তু ধন এবার হলাম রে হারা। হাওয়া বন্ধ হলে সব যাবে বিফলে দেখে শুনে লালচ গেল না মারা
ৼ"
- অসার ভেবে:
(আমি) অসার বা মূল্যহীন (জাগতিক বিষয়াদি) ভেবে।
- সার দিন গেল আমার: আমার মূল্যবান দিনগুলো কেটে
গেল। 'সার দিন'
বলতে জীবনের সার্থক বা গুরুত্বপূর্ণ সময় বোঝানো
হয়েছে।
- সার বস্তু ধন: জীবনের প্রকৃত মূল্যবান
বস্তু বা ধন, অর্থাৎ আত্মজ্ঞান, আধ্যাত্মিক সম্পদ বা মোক্ষ।
- এবার হলাম রে হারা: এইবার আমি তা হারিয়ে
ফেললাম। (এখানে 'এবার' বলতে জীবনের শেষ বেলায় বা যখন উপলব্ধির সময় হয়েছে তখন বোঝানো
হয়েছে)।
- হাওয়া বন্ধ হলে: যখন শরীরের ভেতরের 'হাওয়া' বা
প্রাণবায়ু বন্ধ হয়ে যাবে, অর্থাৎ মৃত্যু হলে।
- সব যাবে বিফলে: সবকিছু ব্যর্থ হয়ে যাবে, কোনো
ফল দেবে না।
- দেখে শুনে: সবকিছু দেখে এবং বুঝে
(জীবনের নশ্বরতা)।
- লালচ গেল না মারা: তবুও আমার লোভ বা জাগতিক
আসক্তি দূর হলো না বা মরে গেল না। (নিজের দুর্বলতা এবং মোহের প্রতি আক্ষেপ)।
দ্বিতীয় স্তবক:
"গুরু
যার সহায় হয় এ সংসারে লোভে সঙ্গ দিয়ে সেই যাবে সেরে অঘাটায় আজ মরণ হল আমারে জানলাম না গুরুর করণ কি ধারা
ৼ"
- গুরু যার সহায় হয় এ সংসারে: এই
সংসারে যার গুরু (আধ্যাত্মিক শিক্ষক) সহায় হন।
- লোভে সঙ্গ দিয়ে সেই যাবে সেরে: সে
(গুরু যাকে সাহায্য করেন) লোভের সংস্পর্শে থেকেও সুস্থ হয়ে যায় বা মুক্তি
লাভ করে। 'সেরে যাওয়া'
মানে রোগমুক্ত হওয়া বা বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া।
- অঘাটায় আজ মরণ হল আমারে: আজ (আমার জীবনের)
অঘাটে বা ভুল স্থানে মৃত্যু হলো। 'অঘাটায়' বলতে
সঠিক পথ বা আশ্রয়হীন অবস্থায় বোঝানো হয়েছে, যেখানে কোনো মুক্তির
উপায় নেই।
- জানলাম না গুরুর করণ কি ধারা: আমি
গুরুর উপদেশ বা তাঁর সাধনার পদ্ধতি (করণ কি ধারা) কী, তা
জানতে পারলাম না। (গুরুর নির্দেশনা বুঝতে বা অনুসরণ করতে না পারার আক্ষেপ)।
তৃতীয় স্তবক:
"মহতে
কয় থাকলে পূর্ব সুকৃতি দেখিতে শুনিতে হয় গুরুপদে মতি সে সুকৃতি আমার থাকতো যদি তবে কি আর আমি হতাম পামরা
ৼ"
- মহতে কয়: মহৎ ব্যক্তিরা বা
সাধু-সজ্জনরা বলেন।
- থাকলে পূর্ব সুকৃতি: যদি পূর্বজন্মের পুণ্য বা
ভালো কর্ম (সুকৃতি) থাকে।
- দেখিতে শুনিতে হয় গুরুপদে মতি: তাহলে
গুরুদেবের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা (মতি) জন্মায় এবং তাঁর উপদেশ শুনতে ও দেখতে
পারা যায় (অর্থাৎ,
সঠিক গুরু পাওয়া যায় এবং তাঁর নির্দেশনা বোঝা
যায়)।
- সে সুকৃতি আমার থাকতো যদি: সেই পুণ্য যদি আমার
থাকত।
- তবে কি আর আমি হতাম পামরা: তাহলে কি আমি আর 'পামরা' (পাপী, অধম বা হতভাগ্য) হতাম? (এখানে লালন নিজের বর্তমান
অবস্থাকে পূর্ব জন্মের পুণ্যহীনতার ফল বলে আক্ষেপ করছেন)।
চতুর্থ স্তবক:
"সময়
ছাড়িয়া জানিলাম এখন গুরু কৃপা বিনে বৃথা এ জীবন বিনয়
করে কয় ফকির লালন আর কি আমি পাব অধরা ৼ"
- সময় ছাড়িয়া জানিলাম এখন: সময় চলে যাওয়ার পর
আমি এখন জানতে পারলাম (উপলব্ধি করলাম)।
- গুরু কৃপা বিনে বৃথা এ জীবন: গুরুর
কৃপা বা আশীর্বাদ ছাড়া এই জীবন বৃথা।
- বিনয় করে কয় ফকির লালন: ফকির লালন বিনয়ের
সাথে বলেন।
- আর কি আমি পাব অধরা: সেই 'অধরা' (পরমাত্মা বা পরম সত্যকে, যাকে সহজে ধরা যায় না) আমি
কি আর ফিরে পাব?
(হারিয়ে যাওয়া সুযোগ এবং সেই অধরাকে লাভ করতে না
পারার চরম আক্ষেপ)।
এই
গানটি লালনের সেই গভীর আক্ষেপকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি মানবজীবনের
ক্ষণস্থায়ীতা, জাগতিক মোহের ক্ষতিকর প্রভাব, এবং গুরুর কৃপা ছাড়া
আত্ম-উপলব্ধির অসম্ভবতা নিয়ে বিলাপ করছেন। এটি মানবজীবনকে সার্থক করার জন্য সময়
ও গুরুর গুরুত্বের উপর জোর দেয়।