আকার কি নিরাকার সাঁই রব্বানা
(১৯)
আকার কি নিরাকার
সাঁই রব্বানা।
আহাদ আর আহাম্মদের
বিচার হলে
যায় জানা ৼ
আহাম্মদ নামে
আফি
মীম হরফ লেখে
নফি
মীম গেলে আহাদ
বাকি
আহাম্মদ নাম
থাকে না ৼ
খুদিতে বান্দার
দেহে
খোদা সে আছে
লুকাইয়ে
আলেফে মীম বসায়ে
আহাম্মদ হল
সে না ৼ
এই পদের অর্থ
ঢুঁড়ে
কারো জ্ঞান
বসবে ধড়ে
কেউ বলবে লালন
ভেড়ে
ফাকড়ামো সই
বোঝে না ৼ
প্রথম স্তবক:
"আকার কি
নিরাকার সাঁই রব্বানা। আহাদ আর আহাম্মদের বিচার হলে যায় জানা ৼ"
- আকার কি নিরাকার: পরম সত্তা (সাঁই) কি সাকার
(রূপ ধারণকারী) নাকি নিরাকার (রূপহীন)? এটি ঈশ্বরের প্রকৃতি নিয়ে
চিরন্তন দার্শনিক প্রশ্ন।
- সাঁই রব্বানা: হে আমার প্রভু ঈশ্বর!
- আহাদ আর আহাম্মদের বিচার হলে: যদি
'আহাদ'
(এক ও অদ্বিতীয় সত্তা - আল্লাহ) এবং 'আহাম্মদ' (হযরত মুহাম্মদ সা.)-এর সম্পর্ক বা প্রকৃতি নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ করা
হয়।
- যায় জানা: তাহলেই এই রহস্য জানা যায়
বা বোঝা যায়।
দ্বিতীয় স্তবক:
"আহাম্মদ
নামে আফি
মীম হরফ লেখে নফি মীম
গেলে আহাদ বাকি
আহাম্মদ নাম থাকে না ৼ"
- আহাম্মদ নামে আফি: 'আহাম্মদ' নামটিতে (আরবি হরফে)
একটি অতিরিক্ত অক্ষর রয়েছে, যা 'আফি' (ফائض বা
অতিরিক্ত)।
- মীম হরফ লেখে নফি: আরবিতে 'আহাম্মদ' লিখতে
'আহাদ' এর সাথে একটি 'মীম' (م) অক্ষর যুক্ত হয়। এই 'মীম' অক্ষরটিকে
'নফি' বা অতিরিক্ত হিসেবে দেখা হয়েছে। (أحمد - আহাম্মদ, أحد - আহাদ)।
- মীম গেলে আহাদ বাকি: যদি 'আহাম্মদ' নাম
থেকে 'মীম' অক্ষরটি বাদ দেওয়া হয়।
- আহাম্মদ নাম থাকে না: তাহলে 'আহাম্মদ' নামটি
আর থাকে না, কেবল 'আহাদ'
(এক ও অদ্বিতীয় আল্লাহ) বাকি থাকে। এটি বোঝায় যে, নবী
মুহাম্মদ (সা.) হলেন আল্লাহরই প্রকাশ; তাঁর অস্তিত্ব আল্লাহরই এক
অংশ। 'মীম' যেন আল্লাহর প্রকাশ বা সৃষ্টির প্রতীক।
তৃতীয় স্তবক:
"খুদিতে
বান্দার দেহে
খোদা সে আছে লুকাইয়ে আলেফে
মীম বসায়ে
আহাম্মদ হল সে না ৼ"
- খুদিতে বান্দার দেহে: 'খুদি' মানে
ক্ষুদ্র, বা নিজস্ব সত্তা। 'বান্দার দেহে' অর্থাৎ, মানুষের
শরীরের মধ্যেই।
- খোদা সে আছে লুকাইয়ে: সেই খোদা (ঈশ্বর) লুকিয়ে
আছেন বা নিহিত আছেন। এটি লালনের দেহ-তত্ত্বের মূল কথা, যেখানে
পরম সত্তাকে দেহের মধ্যেই অনুসন্ধান করতে বলা হয়েছে।
- আলেফে মীম বসায়ে: 'আলেফ' (ا) হলো আরবি বর্ণমালার প্রথম অক্ষর, যা 'আহাদ' এবং
আল্লাহর একত্বকে নির্দেশ করে। 'মীম' (م) অক্ষরটি 'আলেফ' এর সাথে বসিয়ে (অর্থাৎ, 'আহাদ' এর
সাথে 'মীম' যুক্ত করে)।
- আহাম্মদ হল সে না: তিনিই (আল্লাহ) তখন 'আহাম্মদ' বা
নবী রূপে প্রকাশিত হলেন। এটি বোঝায় যে, নবী হলেন আল্লাহরই প্রকাশ, যার
মাধ্যমে আল্লাহ নিজেকে প্রকাশ করেন। 'মীম' এখানে
সৃষ্টির কারণ বা প্রকাশ্য রূপের প্রতীক।
চতুর্থ স্তবক:
"এই পদের
অর্থ ঢুঁড়ে
কারো জ্ঞান বসবে ধড়ে কেউ
বলবে লালন ভেড়ে ফাকড়ামো সই বোঝে না ৼ"
- এই পদের অর্থ ঢুঁড়ে: এই গানের পদের (ছন্দময়
রচনার) অর্থ গভীরভাবে খুঁজে। 'ঢুঁড়ে' মানে
অন্বেষণ করে।
- কারো জ্ঞান বসবে ধড়ে: কারও কারও জ্ঞান (বা
উপলব্ধি) তার শরীরেই (ধড়ে) প্রতিষ্ঠিত হবে, অর্থাৎ তারা দেহের
মধ্যেই পরম সত্যকে উপলব্ধি করতে পারবে।
- কেউ বলবে লালন ভেড়ে: (আবার) কেউ কেউ বলবে, লালন
একজন নির্বোধ বা অশিক্ষিত ব্যক্তি ('ভেড়ে' মানে
মূর্খ, গোঁয়ার)।
- ফাকড়ামো সই বোঝে না: সে (লালন) 'ফাকড়ামো' (আজেবাজে কথা বা অর্থহীন আলোচনা) ছাড়া আর কিছু বোঝে না। এখানে লালন
নিজেই সমালোচনার মুখোমুখি হচ্ছেন, কারণ তার গভীর দার্শনিক
তত্ত্বগুলো সাধারণ মানুষের কাছে দুর্বোধ্য বা অবান্তর মনে হতে পারে।
এই
গানটি লালনের সেই গভীর রহস্যবাদী দর্শনকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি ঈশ্বর এবং নবীর
মধ্যে এক সূক্ষ্ম এবং অভিন্ন সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই
রহস্য উপলব্ধি করতে হলে প্রচলিত ধারণা ও তর্ক ছেড়ে আত্মিক গভীরতায় ডুব দিতে হয়, যা সবার
পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়।