আকারে ভজন সাকারে সাধন, তায়
(২০)
আকারে ভজন সাকারে
সাধন, তায়।
আকার সাকার
অভেদ রূপ জানতে হয় ৼ
ভজনের মূল নর
আকার
গুরু শিষ্য
হয় প্রচার
সাকার রূপেতে
আকারে নির্ণয়
আকার ছাড়া সাকার
রূপ নাহি রয় ৼ
পুরুষ প্রকৃতি
আকার
যুগল ভজন প্রচার
নায়ক নায়িকার
যোগ মাহিত্য
যোগের সাধন
জানতে হয় ৼ
অযোনী সহজ রূপ
সংস্কার
স্বরূপে দুই
রূপ হয় নিহার
স্বরূপে রূপের
স্বরূপ কয়
অবোধ লালন তাই
জানায় ৼ
প্রথম স্তবক:
"আকারে
ভজন সাকারে সাধন, তায়।
আকার সাকার অভেদ রূপ জানতে হয় ৼ"
- আকারে ভজন: আকার বা রূপধারী সত্তার
উপাসনা করা। এটি মূর্তি পূজা, গুরু বা অবতারের রূপের
ভজনাকে নির্দেশ করে।
- সাকারে সাধন: সাকার অর্থাৎ রূপধারী
সত্তাকে অবলম্বন করে আধ্যাত্মিক অনুশীলন করা।
- তায়: তাতে, এর মাধ্যমে।
- আকার সাকার অভেদ রূপ: আকার (রূপধারী) এবং সাকার
(রূপহীন বা নিরাকার) সত্তা যে আসলে অভিন্ন, তাদের মধ্যে কোনো
ভেদাভেদ নেই—এই
রূপটি জানতে বা উপলব্ধি করতে হয়।
দ্বিতীয় স্তবক:
"ভজনের
মূল নর আকার
গুরু শিষ্য হয় প্রচার সাকার
রূপেতে আকারে নির্ণয় আকার ছাড়া সাকার রূপ নাহি রয় ৼ"
- ভজনের মূল নর আকার: উপাসনার মূল ভিত্তি হলো
মানব আকার বা নররূপ। লালনের বাউল দর্শনে মানবদেহকে ব্রহ্মাণ্ডের ক্ষুদ্র
সংস্করণ এবং পরম সত্তার প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে দেখা হয়। গুরু, মুর্শিদ
বা আধ্যাত্মিক শিক্ষক এই নররূপেই আসেন।
- গুরু শিষ্য হয় প্রচার: গুরু এই জ্ঞান
শিষ্যকে প্রচার করেন বা দীক্ষা দেন।
- সাকার রূপেতে আকারে নির্ণয়: সাকার
রূপের মাধ্যমেই নিরাকার সত্তাকে ('আকার' এখানে
নিরাকারকে বোঝাতে পারে) নির্ণয় বা উপলব্ধি করা যায়।
- আকার ছাড়া সাকার রূপ নাহি রয়: কোনো
নির্দিষ্ট আকার বা প্রকাশ ছাড়া সাকার (এখানে নিরাকার) রূপের অস্তিত্ব অনুভব
করা যায় না। এটি বোঝায় যে, নিরাকার সত্তাকে বুঝতে হলে তার সাকার
প্রকাশের সাহায্য নিতে হয়।
তৃতীয়
স্তবক:
"পুরুষ
প্রকৃতি আকার
যুগল ভজন প্রচার নায়ক
নায়িকার যোগ মাহিত্য যোগের সাধন জানতে হয় ৼ"
- পুরুষ প্রকৃতি আকার: পুরুষ (চেতন সত্তা, আত্মা)
এবং প্রকৃতি (জড় সত্তা, সৃষ্টির উপাদান) — এই দুটিই রূপ বা আকার ধারণ
করে আছে।
- যুগল ভজন প্রচার: এই পুরুষ ও প্রকৃতির যুগল
রূপের উপাসনা বা সাধনার কথা প্রচার করা হয়। এটি দ্বৈত সত্তার মিলন বা সাধনার
মাধ্যমে এই দুইয়ের অভেদত্ব উপলব্ধি করার ইঙ্গিত।
- নায়ক নায়িকার যোগ মাহিত্য: নায়ক
ও নায়িকা (পুরুষ ও প্রকৃতির প্রতীক, বা সাধক ও সাধিকার সম্পর্ক)
তাদের যোগের (মিলনের) মাধ্যমে যে মাহাত্ম্য লাভ করে। এটি আধ্যাত্মিক মিলনের
গভীর রূপক।
- যোগের সাধন জানতে হয়: সেই যোগের সাধন বা অনুশীলন
পদ্ধতি জানতে হয়। (এই পঙ্ক্তি সাধকদের জন্য গুপ্ত যোগ সাধনার ইঙ্গিত বহন
করে)।
চতুর্থ স্তবক:
"অযোনী
সহজ রূপ সংস্কার স্বরূপে দুই রূপ হয় নিহার স্বরূপে
রূপের স্বরূপ কয় অবোধ লালন তাই জানায় ৼ"
- অযোনী সহজ রূপ সংস্কার: যা যোনি (গর্ভ) থেকে
উৎপন্ন নয়, এমন এক সহজ ও স্বাভাবিক রূপ যা সংস্কার (অভ্যাস বা প্রবৃত্তি) রূপে
বিরাজমান। এটি পরম সত্তার অনাদি ও স্বতঃস্ফূর্ত রূপকে বোঝাতে পারে, যা
প্রকৃতির মধ্যেই নিহিত।
- স্বরূপে দুই রূপ হয় নিহার: সেই স্বরূপে (পরম
সত্তার প্রকৃত রূপে) দুইটি রূপকেই দেখা যায় বা উপলব্ধি করা যায়। এটি পুরুষ ও
প্রকৃতির অভেদত্ব বা আকার ও নিরাকারের ঐক্যকে ইঙ্গিত করে।
- স্বরূপে রূপের স্বরূপ কয়: সেই প্রকৃত স্বরূপে
প্রবেশ করলেই রূপের প্রকৃত স্বরূপকে (বা পরম সত্তার আসল রূপকে) জানা যায়।
- অবোধ লালন তাই জানায়: নির্বোধ লালন (বিনয়ের সাথে
নিজেকে অবোধ বলছেন) এই কথাটিই জানাচ্ছেন বা প্রকাশ করছেন।
এই
গানটিতে লালন দেহ-সাধনা,
গুরু-শিষ্য পরম্পরা এবং পুরুষ-প্রকৃতির মিলন তত্ত্বের
মাধ্যমে সাকার-নিরাকার অভেদত্বের এক গভীর চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন
যে, পরম সত্তাকে উপলব্ধি করতে হলে তার প্রকাশ্য আকার এবং অপ্রকাশ্য নিরাকার রূপ
উভয়ের মধ্যেকার সম্পর্ককে বুঝতে হবে।
