আগে জান না রে মন বাজি হারলে তখন, লজ্জায় মরণ
(২১)
আগে জান না
রে মন
বাজি হারলে
তখন, লজ্জায় মরণ
শেষে আর কাঁদলে
কি হয়।
খেলা খেলে রে
খেলারু, ভাবিয়ে শ্রীগুরু
সামাল সামাল
বাজি সামাল সর্বদায় ৼ
এদেশেতে দেখি
জুয়াচুরি খেলা
টুটকা দিয়ে
ফটকায় ফেলায় রে মন ভোলা
তাই বলি বারংবার
খেল হুঁশিয়ার
নয়নে নয়ন বাঁধিয়ে
সদায় ৼ
চোরের সঙ্গে
খাটে না ধর্মদাঁড়া
হাতের অস্ত্র
কভু কর না হাতছাড়া
রাগ অস্ত্র
ধরে, দুষ্ট দমন করে
স্বদেশেতে গমন
করো রে ত্বরায় ৼ
চুয়ানি বাঁধিয়ে
খেলে যে জনা
সাধ্য কি তার
অঙ্গে দেয় হানা
লালন বলে আমি
তিন তের না জানি
বাজি সেরে যাওয়া
হল যে দায় ৼ
প্রথম স্তবক:
"আগে জান
না রে মন
বাজি হারলে তখন, লজ্জায় মরণ শেষে আর কাঁদলে কি হয়। খেলা খেলে রে খেলারু, ভাবিয়ে
শ্রীগুরু
সামাল সামাল বাজি সামাল সর্বদায় ৼ"
- আগে জান না রে মন: হে মন, তুমি
আগে থেকে (সময় থাকতে) জানতে পারলে না কেন?
- বাজি হারলে তখন, লজ্জায় মরণ: (যখন)
জীবনের খেলায় হেরে যাবে, তখন লজ্জায় মরে যেতে হবে (লজ্জিত ও
অপদস্থ হতে হবে)।
- শেষে আর কাঁদলে কি হয়: শেষ মুহূর্তে বাজি
হেরে গেলে কেঁদে আর কোনো লাভ হবে না। (সময় থাকতে সচেতন হওয়ার গুরুত্ব
বোঝানো হয়েছে)।
- খেলা খেলে রে খেলারু: হে খেলারু (জীবনের
খেলোয়াড়, অর্থাৎ মানুষ),
তুমি এই খেলা খেলছো।
- ভাবিয়ে শ্রীগুরু: শ্রীগুরুকে (আধ্যাত্মিক
শিক্ষক বা ঈশ্বর) স্মরণ করে বা তাঁর উপদেশ চিন্তা করে।
- সামাল সামাল বাজি সামাল সর্বদায়: বারবার
সতর্ক হও, তোমার এই জীবনের খেলাকে সর্বদা সামাল দাও বা নিয়ন্ত্রণ করো। (যেন
জীবনের পথে বিপদ না আসে)।
দ্বিতীয় স্তবক:
"এদেশেতে
দেখি জুয়াচুরি খেলা টুটকা দিয়ে ফটকায় ফেলায় রে মন ভোলা তাই বলি বারংবার খেল হুঁশিয়ার নয়নে নয়ন বাঁধিয়ে সদায়
ৼ"
- এদেশেতে দেখি জুয়াচুরি খেলা: এই
জগতে (জীবনকে) আমি দেখি এক জুয়াচুরির খেলার মতো। (যেখানে নানা প্রতারণা বা
প্রলোভন বিদ্যমান)।
- টুটকা দিয়ে ফটকায় ফেলায় রে মন ভোলা: 'টুটকা' মানে
ছলনা বা মায়াজাল,
আর 'ফটকা' মানে
ফাঁদ বা বিপদে ফেলা। হে ভোলা মন, (মায়া) ছলনা করে তোমাকে
ফাঁদে ফেলে দেয়।
- তাই বলি বারংবার খেল হুঁশিয়ার: তাই
আমি বারবার বলছি,
সাবধানে বা সতর্ক হয়ে খেলো।
- নয়নে নয়ন বাঁধিয়ে সদায়: সর্বদা নয়নে নয়ন
বেঁধে, অর্থাৎ সতর্ক দৃষ্টি রেখে বা একাগ্রচিত্তে খেলো। এটি গুরুর প্রতি বা
সত্যের প্রতি অবিচল দৃষ্টি রাখার ইঙ্গিত।
তৃতীয় স্তবক:
"চোরের
সঙ্গে খাটে না ধর্মদাঁড়া হাতের অস্ত্র কভু কর না হাতছাড়া রাগ অস্ত্র ধরে,
দুষ্ট দমন করে স্বদেশেতে গমন করো রে ত্বরায়
ৼ"
- চোরের সঙ্গে খাটে না ধর্মদাঁড়া: চোরের
সাথে (রিপু বা অসৎ প্রবৃত্তি) ধর্মীয় নিয়ম বা ন্যায়পরায়ণতা (ধর্মদাঁড়া)
কার্যকর হয় না। অর্থাৎ, রিপুদের দমন করতে হলে কঠোর হতে হয়।
- হাতের অস্ত্র কভু কর না হাতছাড়া: তোমার
হাতের (আত্মিক) অস্ত্রকে (জ্ঞান, ভক্তি, সংযম)
কখনো হাতছাড়া করো না।
- রাগ অস্ত্র ধরে: 'রাগ' এখানে ক্রোধ অর্থে নয়, বরং
গভীর অনুরাগ, আবেগ বা তীব্র সংকল্পকে বোঝায়, যা একটি অস্ত্রস্বরূপ। সেই
অনুরাগ বা সংকল্পের অস্ত্র ধরে।
- দুষ্ট দমন করে: দুষ্ট বা অশুভ শক্তিকে
(রিপু, কুপ্রবৃত্তি) দমন করে।
- স্বদেশেতে গমন করো রে ত্বরায়: দ্রুত
তোমার নিজ দেশে (প্রকৃত স্বরূপ, পরমাত্মার কাছে বা
মোক্ষধামে) ফিরে যাও।
চতুর্থ স্তবক:
"চুয়ানি
বাঁধিয়ে খেলে যে জনা সাধ্য কি তার অঙ্গে দেয় হানা লালন
বলে আমি তিন তের না জানি বাজি সেরে যাওয়া হল যে
দায়ৼ"
- চুয়ানি বাঁধিয়ে খেলে যে জনা: যে
ব্যক্তি 'চুয়ানি বাঁধিয়ে' খেলে। 'চুয়ানি' একটি
বিশেষ কৌশল বা পদ্ধতি,
যা গুপ্ত জ্ঞান বা সূক্ষ্ম সাধনাকে বোঝায়। যে
ব্যক্তি সঠিক বা গুপ্ত সাধনার কৌশল অবলম্বন করে।
- সাধ্য কি তার অঙ্গে দেয় হানা: তার
শরীরে (অর্থাৎ তার সাধনপথে বা আত্মায়) আর কোনো বিপদ বা আঘাত আসার সাধ্য নেই।
- লালন বলে আমি তিন তের না জানি: লালন
ফকির বলেন, আমি 'তিন তের'
(তেরো তেরো তিনবার অর্থাৎ ৩৯, যা
সম্ভবত দেহের বিভিন্ন অংশ, রিপু বা মায়ার জাল বোঝাতে পারে) জানি
না। এটি হয়তো বোঝায় যে, তিনি জাগতিক কূটকৌশল বা জটিলতা বোঝেন না, তিনি
সরল ভক্তি ও সাধনার কথা বলেন।
- বাজি সেরে যাওয়া হল যে দায়: (তাই) আমার এই জীবনের খেলা
শেষ করে সফল হওয়া কঠিন বা দায়সাপেক্ষ হয়ে পড়েছে। (এটি বিনয় ও নিজের
সীমাবদ্ধতা প্রকাশের মাধ্যমে অপরের জন্য একটি শিক্ষা)।
এই গানে
লালন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে সতর্কতার সাথে পরিচালনা করার কথা বলেছেন। তিনি
জাগতিক লোভ, রিপু দমন এবং গুরুর নির্দেশনা অনুযায়ী আত্ম-অনুসন্ধানের মাধ্যমে পরম
সত্ত্বায় ফিরে যাওয়ার গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন।