আগে শরিয়ত জান বুদ্ধি শান্ত করে
(২২)
আগে শরিয়ত জান
বুদ্ধি শান্ত করে।
রোজা আর নামাজ
শরিয়তের কাজ
ঠিক শরিয়ত বলছ
কারে ৼ
রোজা নামাজ
হজ কলেমা জাকাত
তাই করিলে কি
হয় শরিয়ত
বলো শরা কবুল
কর রে;
ভাবে জানা যায়,
কলমা শরিয়ত নয়
শরিয়তের অর্থ
কিছু থাকতে পারে ৼ
বে-ফের বেঈমান
যারা
শরিয়তের আঁক
চেনে না
শুধু মুখে তোড়
ধরে;
চিনতো যদি আঁক,
অদেখা নিয়াত
নিয়েত বাঁধুতে
না কভু বর্জোখ ছেড়ে ৼ
শরিয়তের গম্ভু
ভারি
যে যা বোঝে
সেই ফল তারি
হয় আখেরে;
লালন বলে মোর,
ভক্তিহীন অন্তর
মারি অন্ত্র
মূলে, লাগে ডালের পরে ৼ
প্রথম স্তবক:
"আগে
শরিয়ত জান বুদ্ধি শান্ত করে। রোজা আর নামাজ শরিয়তের কাজ ঠিক শরিয়ত বলছ কারে ৼ"
- আগে শরিয়ত জান: প্রথমে শরিয়ত সম্পর্কে
জানো।
শরিয়ত বলতে ইসলামী আইন ও
বিধি-বিধানকে বোঝানো হয়, যা মুসলিম জীবনযাপনের পথপ্রদর্শক।
- বুদ্ধি শান্ত করে: তোমার মন ও বুদ্ধিকে শান্ত
ও স্থির করে। এটি বোঝায় যে, প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য মানসিক
স্থিরতা অপরিহার্য।
- রোজা আর নামাজ শরিয়তের কাজ: রোজা
(উপবাস) এবং নামাজ (দৈনিক প্রার্থনা) শরিয়তেরই অংশ, অর্থাৎ
এগুলি শরিয়ত অনুযায়ী পালিত হয়।
- ঠিক শরিয়ত বলছ কারে: (কিন্তু প্রশ্ন হলো) তুমি
আসলে কাকে 'ঠিক শরিয়ত'
বলছো? এই প্রশ্নটি শরিয়তের
বাহ্যিক রূপ এবং তার গভীর অভ্যন্তরীণ অর্থের মধ্যে পার্থক্য নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় স্তবক:
"রোজা
নামাজ হজ কলেমা জাকাত তাই করিলে কি হয় শরিয়ত বলো শরা
কবুল কর রে; ভাবে জানা যায়,
কলমা শরিয়ত নয় শরিয়তের
অর্থ কিছু থাকতে পারে ৼ"
- রোজা
নামাজ হজ কলেমা জাকাত: রোজা (উপবাস), নামাজ
(প্রার্থনা), হজ (মক্কা তীর্থযাত্রা), কলেমা (ঈমানের ঘোষণা) এবং
জাকাত (দরিদ্রকে দান) – এগুলি ইসলামের পঞ্চস্তম্ভ।
- তাই
করিলে কি হয় শরিয়ত: শুধু এগুলি পালন করলেই কি
শরিয়ত হয়? (প্রশ্নটি শরিয়তের প্রকৃত উদ্দেশ্য নিয়ে)।
- বলো
শরা কবুল কর রে: বলো, (প্রকৃত) শরা বা শরিয়তকে
গ্রহণ করো।
- ভাবে
জানা যায়: গভীরভাবে ভেবে বা অনুভব করে জানা যায়।
- কলমা
শরিয়ত নয়: (সেভাবে দেখলে) শুধু কলেমা উচ্চারণ করাটাই শরিয়ত নয় (যদিও এটি
শরিয়তের একটি অংশ)।
- শরিয়তের
অর্থ কিছু থাকতে পারে: শরিয়তের এর চেয়েও গভীর
কোনো অর্থ থাকতে পারে। (লালন বোঝাতে চাইছেন যে, বাহ্যিক পালনের
চেয়ে আত্মিক বিশুদ্ধতাই আসল)।
তৃতীয় স্তবক:
"বে-ফের বেঈমান যারা শরিয়তের আঁক চেনে না শুধু মুখে তোড় ধরে; চিনতো
যদি আঁক, অদেখা নিয়াত নিয়েত বাঁধুতে না কভু বর্জোখ ছেড়ে ৼ"
- বে-ফের বেঈমান যারা: যারা বে-ফের (অবিশ্বাসী বা
পথভ্রষ্ট) এবং বেঈমান (বিশ্বাসহীন)।
- শরিয়তের আঁক চেনে না: তারা শরিয়তের প্রকৃত 'আঁক' (মূল, সারমর্ম বা উদ্দেশ্য) চিনতে পারে না।
- শুধু মুখে তোড় ধরে: তারা কেবল মুখে মুখে তর্ক
করে বা অনর্থক কথা বলে।
- চিনতো যদি আঁক: যদি তারা (শরিয়তের) প্রকৃত
সারমর্ম চিনত।
- অদেখা নিয়াত:
'নিয়াত' (নিয়ত) মানে অভিপ্রায় বা
সংকল্প। 'অদেখা নিয়াত'
মানে যা চোখে দেখা যায় না এমন অভ্যন্তরীণ শুদ্ধ
অভিপ্রায়।
- নিয়েত বাঁধুতে না কভু বর্জোখ ছেড়ে: তারা
(সেই বেঈমানরা) কখনোই তাদের নিয়ত বা সংকল্পকে বরজখ (মৃত্যু ও কিয়ামতের
মধ্যবর্তী অবস্থা বা কঠিন অবস্থা) থেকে মুক্ত রাখতে পারত না বা সঠিক পথে
বাঁধতে পারত না। অর্থাৎ, যারা শরিয়তের ভেতরের অর্থ বোঝে না, তাদের
নিয়তও শুদ্ধ হয় না এবং তারা সংকটে পড়ে।
চতুর্থ স্তবক:
"শরিয়তের
গম্ভু ভারি
যে যা বোঝে সেই ফল তারি হয়
আখেরে; লালন বলে মোর,
ভক্তিহীন অন্তর মারি
অন্ত্র মূলে, লাগে ডালের পরে ৼ"
- শরিয়তের গম্ভু ভারি: শরিয়তের বিষয়বস্তু বা তার
রহস্য অত্যন্ত গভীর ও গুরুগম্ভীর।
- যে যা বোঝে সেই ফল তারি: যে ব্যক্তি শরিয়তকে
যেভাবে বোঝে, সে সেই অনুযায়ী ফল লাভ করে (আখেরাতে বা জীবনে)।
- হয় আখেরে: শেষ পর্যন্ত বা পরকালে।
- লালন বলে মোর: লালন ফকির বলেন, আমার।
- ভক্তিহীন অন্তর: ভক্তিহীন হৃদয়।
- মারি অন্ত্র মূলে, লাগে ডালের পরে: (আমার
ভক্তিহীন অন্তরের অবস্থা এমন যে) আমি আঘাত করি মূল অন্ত্রে (ভুল জায়গায় বা
আসল লক্ষ্যে),
আর তা লাগে ডালের ওপর (অর্থাৎ, লক্ষ্যভ্রষ্ট
হয়)। এটি বোঝায় যে,
ভক্তি ছাড়া সাধন ব্যর্থ হয় এবং মূল লক্ষ্যে
পৌঁছানো যায় না,
কেবল বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠানের পিছনে ঘুরে মরা হয়।
এই গানে
লালন শরিয়তের বাহ্যিক পালনের পাশাপাশি তার অভ্যন্তরীণ মর্মার্থ অনুধাবন এবং
হৃদয়ের ভক্তির গুরুত্বের উপর জোর দিয়েছেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যে, শুধু
আচার-অনুষ্ঠান পালন করে নয়, বরং শুদ্ধ নিয়ত ও গভীর ভক্তির মাধ্যমেই শরিয়তের প্রকৃত
উদ্দেশ্য সাধন করা যায়।