আগে কপাট মার কামের ঘরে
(২৩)
আগে কপাট মার
কামের ঘরে।
মানুষ ঝলক দিবে
রূপ নিহারে ৼ
হাওয়া ধর অগ্নি
স্থির কর
যাতে মরিয়ে
বাঁচিতে পার
মরণের আগে মর
শমন যাক ফিরে
ৼ
বারে বারে করি
মানা
নীলা বাসে বাস
কর না
রেখ তেজের ঘর
তেজিয়ানা
ঊর্ধ্ব চাঁদ
ধরে ৼ
জান না মন পারাহীন
দর্পণ
তাতে কি হয়
রূপ দরশন
অতি বিনয় করে
বলছে লালন
থেকো হুঁশিয়ারে
ৼ
প্রথম স্তবক:
"আগে
কপাট মার কামের ঘরে। মানুষ ঝলক দিবে রূপ নিহারে ৼ"
- আগে কপাট মার কামের ঘরে: প্রথমে কামের ঘরে অর্থাৎ কামনা-বাসনা, ইন্দ্রিয়সুখ
ও জাগতিক আসক্তির প্রবেশপথে দরজা বন্ধ করো, বা তাকে দমন করো।
এটি রিপু দমনের প্রথম ধাপ।
- মানুষ ঝলক দিবে: তাহলেই সেই মানুষ
(পরমাত্মা বা প্রকৃত আত্মসত্তা) এক ঝলক প্রকাশিত হবে।
- রূপ নিহারে: তার প্রকৃত রূপ বা স্বরূপের
উপলব্ধির মাধ্যমে। অর্থাৎ, কামনা দমন করলেই ভেতরের পরমাত্মার
জ্যোতি দর্শন সম্ভব হবে।
দ্বিতীয় স্তবক:
"হাওয়া
ধর অগ্নি স্থির কর যাতে মরিয়ে বাঁচিতে পার মরণের
আগে মর শমন যাক ফিরে ৼ"
- হাওয়া ধর:
'হাওয়া' বলতে এখানে প্রাণবায়ু বা
শ্বাস-প্রশ্বাসকে নিয়ন্ত্রণ করা বোঝানো হয়েছে, যা
যোগ সাধনার প্রাণায়ামের অংশ।
- অগ্নি স্থির কর: দেহের ভেতরের অগ্নি
(যেমন কামাগ্নি, বা শরীরের তাপ শক্তি) তাকে
স্থির করো বা নিয়ন্ত্রণ করো। এটি তাপ ও শক্তির ভারসাম্যের ইঙ্গিত।
- যাতে মরিয়ে বাঁচিতে পার: যার মাধ্যমে তুমি
(জাগতিক অর্থে) মরে গিয়েও বেঁচে থাকতে পারো (অর্থাৎ, পার্থিব
মোহ ও অহংকে ত্যাগ করে আধ্যাত্মিকভাবে অমরত্ব লাভ করতে পারো)।
- মরণের আগে মর: শারীরিক মৃত্যুর আগে তোমার
জাগতিক সত্তা বা অহং-এর মৃত্যু ঘটাও। এটি আত্ম-বিলীনতা বা আত্ম-ত্যাগের
প্রতীক।
- শমন যাক ফিরে: তাহলে শমন (মৃত্যুর দেবতা) ফিরে যাবে, অর্থাৎ তুমি মৃত্যুভয় বা
জন্ম-মৃত্যুর চক্র থেকে মুক্তি পাবে।
তৃতীয় স্তবক:
"বারে
বারে করি মানা
নীলা বাসে বাস কর না রেখ
তেজের ঘর তেজিয়ানা ঊর্ধ্ব চাঁদ ধরে ৼ"
- বারে বারে করি মানা: (আমি) বারবার নিষেধ করছি।
- নীলা বাসে বাস কর না: নীলা বাসে অর্থাৎ নীচ প্রবৃত্তি বা অসৎ বাসনায় বাস করো না। 'নীলা
বাস' বলতে জাগতিক মোহ বা নেতিবাচক চিন্তা-ভাবনাকে বোঝাতে পারে।
- রেখ তেজের ঘর তেজিয়ানা: তোমার ভেতরের তেজের ঘর
(অর্থাৎ আত্মিক শক্তি বা প্রাণশক্তি) তাকে তেজিয়ানা
বা উজ্জীবিত রাখো। এখানে তেজ মানে আত্মিক শক্তি, বীর্য
বা জ্যোতি।
- ঊর্ধ্ব চাঁদ ধরে: ঊর্ধ্ব চাঁদ অর্থাৎ সহস্রার চক্রে অবস্থিত দিব্য আলোক বা পরমাত্মাকে ধারণ করো। এটি
কুণ্ডলিনী জাগরণের মাধ্যমে ঊর্ধ্বমুখী শক্তিকে কেন্দ্রে স্থাপন করার ইঙ্গিত।
চতুর্থ স্তবক:
"জান না
মন পারাহীন দর্পণ তাতে কি হয় রূপ দরশন অতি
বিনয় করে বলছে লালন থেকো হুঁশিয়ারে ৼ"
- জান না মন: হে মন, তুমি
কি জানো না।
- পারাহীন দর্পণ: এটি এমন একটি দর্পণ (আয়না)
যার কোনো পার বা কিনারা নেই, অর্থাৎ অসীম বা সীমাহীন। এটি রূপক অর্থে
মহাবিশ্ব বা পরমাত্মাকে বোঝায়, যা সর্বত্র বিদ্যমান।
- তাতে কি হয় রূপ দরশন: সেই সীমাহীন দর্পণে কি
(সহজে) সেই রূপের দর্শন হয়? (প্রশ্নটি এই রূপ উপলব্ধির দুরূহতা
বোঝায়)।
- অতি বিনয় করে বলছে লালন: ফকির লালন অত্যন্ত
বিনয় সহকারে বলছেন।
- থেকো হুঁশিয়ারে: (তোমরা) সাবধানে বা সতর্ক থেকো। এটি সাধন
পথে ভুল না করার জন্য একটি সতর্কবার্তা।
এই গানে
লালন ফকির কাম রিপু দমন,
প্রাণায়াম ও যোগ সাধনার মাধ্যমে দেহস্থিত পরমাত্মাকে
উপলব্ধি করার গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, জাগতিক
মোহ ত্যাগ করে আত্মিক পথে অগ্রসর হলেই মুক্তি ও জ্ঞান লাভ সম্ভব।