cover

cover

আগে মন সাজো প্রকৃতি

 


(২৪)

আগে মন সাজো প্রকৃতি।

প্রকৃতির স্বভাব ধর সাধন কর

ঊর্ধ্ব হবে দেহের রতি

 

যে আছে ষড়দলে

সাধ তার উল্টো কলে

যদি সে সাধন বলে যায় দ্বিদলে

উঠবে জ্বলে জ্যোতি

 

অনাত্ন নিবৃত্তি হলে

নিষ্ঠা রতি হবে

কামব্রহ্মান্ড সাকার হয়ে

উদয় হবে গুরু মূর্তি

 

বৈদিক এক সাধন আছে

তারে রাখো আগে পাছে

সেই সাধন করতে গেলে

গুরু হয় নিজপতি

 

তার পরে এক সাধন আছে

সে সাধন বড়োই বেজাতে

অধীন লালন বলে মন রে

আমার হবে কোন গতি


প্রথম স্তবক:

"আগে মন সাজো প্রকৃতি। প্রকৃতির স্বভাব ধর সাধন কর ঊর্ধ্ব হবে দেহের রতি ৼ"

  • আগে মন সাজো প্রকৃতি: প্রথমে তোমার মনকে প্রকৃতি রূপে সাজাও বা তৈরি করো। এখানে 'প্রকৃতি' বলতে হয়তো সৃষ্টির মূল শক্তি, নারী শক্তি, বা আদিম, মৌলিক সত্তাকে বোঝানো হয়েছে। মনকে সেই শুদ্ধ ও মৌলিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার কথা বলা হচ্ছে
  • প্রকৃতির স্বভাব ধর সাধন কর: প্রকৃতির স্বাভাবিক গুণ (যেমন উর্বরতা, সৃজনশীলতা, বা সহজিয়া ভাব) ধারণ করে সাধন (আধ্যাত্মিক অনুশীলন) করো
  • ঊর্ধ্ব হবে দেহের রতি: এর ফলে দেহের রতি (কামনা, প্রেম বা জীবনশক্তি) ঊর্ধ্বমুখী হবে, অর্থাৎ তা রূপান্তরিত হয়ে আধ্যাত্মিক পথে চালিত হবে। এটি যৌনশক্তিকে আধ্যাত্মিক শক্তিতে রূপান্তরের যোগিক ধারণাকে ইঙ্গিত করে

দ্বিতীয় স্তবক:

"যে আছে ষড়দলে সাধ তার উল্টো কলে যদি সে সাধন বলে যায় দ্বিদলে উঠবে জ্বলে জ্যোতি ৼ"

  • যে আছে ষড়দলে: 'ষড়দল' বলতে যোগশাস্ত্রের ষড়চক্রকে বোঝানো হয়েছে, যা মানবদেহে অবস্থিত ছয়টি প্রধান শক্তি কেন্দ্র (মূলাধার থেকে আজ্ঞা চক্র পর্যন্ত)। এই চক্রগুলোতে যে শক্তি বা জ্ঞান সুপ্ত আছে
  • সাধ তার উল্টো কলে: তার সাধন করো 'উল্টো কলে' বা বিপরীতমুখী প্রক্রিয়ায়। এটি কুণ্ডলিনী যোগ সাধনার এক বিশেষ দিক, যেখানে শক্তিকে নিম্নমুখী প্রবৃত্তি থেকে ঊর্ধ্বমুখী করে তোলা হয়
  • যদি সে সাধন বলে যায় দ্বিদলে: যদি সেই সাধনার বলে বা প্রভাবে (শক্তি) দ্বিদলে (আজ্ঞা চক্র, যা ভ্রূযুগলের মধ্যখানে অবস্থিত এবং দুটি পাপড়িযুক্ত পদ্মের মতো কল্পিত) পৌঁছায়
  • উঠবে জ্বলে জ্যোতি: তাহলে সেখানে (আজ্ঞা চক্রে) দিব্য জ্যোতি বা আলোক প্রকাশিত হবে। এটি আত্মিক জাগরণ এবং পরমাত্মার উপলব্ধির ইঙ্গিত

তৃতীয় স্তবক:

"অনাত্ন নিবৃত্তি হলে নিষ্ঠা রতি হবে কামব্রহ্মান্ড সাকার হয়ে উদয় হবে গুরু মূর্তি ৼ"

  • অনাত্ন নিবৃত্তি হলে: যখন 'অনাত্ন' (যা আত্মা নয়, অর্থাৎ দেহ, মন, অহংকার বা মায়া) তার নিবৃত্তি হবে বা তার প্রভাব বিলীন হবে
  • নিষ্ঠা রতি হবে: তখন প্রকৃত নিষ্ঠা (একাগ্র ভক্তি) এবং রতি (প্রেমময় আসক্তি) জন্মাবে
  • কামব্রহ্মান্ড সাকার হয়ে: 'কামব্রহ্মান্ড' বলতে এখানে সৃষ্টির উৎস বা শক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যা কামনা বা ইচ্ছার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়। সেই শক্তি সাকার (রূপ ধারণকারী) হয়ে
  • উদয় হবে গুরু মূর্তি: গুরু রূপে বা পরম সত্তার মূর্তি রূপে প্রকাশিত হবে। এটি বোঝায় যে, অহং বিলীন হলে এবং শুদ্ধ প্রেম জাগ্রত হলে সাধক তার গুরুকে (বা ঈশ্বরকে) প্রত্যক্ষ করতে পারবে

চতুর্থ স্তবক:

"বৈদিক এক সাধন আছে তারে রাখো আগে পাছে সেই সাধন করতে গেলে গুরু হয় নিজপতি ৼ"

  • বৈদিক এক সাধন আছে: এক প্রকার বৈদিক সাধন পদ্ধতি রয়েছে (যা হয়তো বাহ্যিক বা শাস্ত্রীয় আচারের উপর নির্ভরশীল)
  • তারে রাখো আগে পাছে: তাকে সামনে বা পিছনে রাখো, অর্থাৎ তার গুরুত্ব স্বীকার করো কিন্তু তার মধ্যেই আবদ্ধ থেকো না
  • সেই সাধন করতে গেলে: সেই (প্রকৃত) সাধন করতে গেলে
  • গুরু হয় নিজপতি: গুরুই নিজের পতি (স্বামী বা প্রভু) হয়ে ওঠেন। এটি গুরুকে পরম সত্তার সমান বা তার প্রতিনিধি হিসেবে গ্রহণ করার ইঙ্গিত, যেখানে গুরুই সাধকের সবকিছু হয়ে ওঠেন

পঞ্চম স্তবক:

"তার পরে এক সাধন আছে সে সাধন বড়োই বেজাতে অধীন লালন বলে মন রে আমার হবে কোন গতি ৼ"

  • তার পরে এক সাধন আছে: (বৈদিক বা প্রচলিত সাধনার) পরেও আরেকটি সাধন পদ্ধতি আছে
  • সে সাধন বড়োই বেজাতে: সেই সাধন খুবই 'বেজাতে' (জাতিগত বিভেদহীন, বা প্রচলিত ধর্মীয় ধারণার বাইরে)। এটি সম্ভবত বাউলদের সহজিয়া বা মানবদেহকেন্দ্রিক সাধনার ইঙ্গিত, যা প্রচলিত সমাজের চোখে 'অশুদ্ধ' বা 'জাতহীন' বলে বিবেচিত
  • অধীন লালন বলে মন রে: ফকির লালন বিনয়াবনত হয়ে তার মনকে বলছেন
  • আমার হবে কোন গতি: আমার (লালনের) কী হবে, আমার গন্তব্য কী হবে? (এটি হয়তো এই 'বেজাতে' সাধন পথে চলার অনিশ্চয়তা বা আত্ম-জিজ্ঞাসা, অথবা সাধারণ মানুষের পক্ষে এই গভীর সাধন উপলব্ধি করার দুরূহতা)

এই গানটি লালনের সেই দর্শনকে তুলে ধরে, যেখানে তিনি প্রচলিত ধর্মীয় রীতিনীতির বাইরে গিয়ে মানবদেহকেই সাধনার ক্ষেত্র হিসেবে দেখেছেন। তিনি কুণ্ডলিনী শক্তি জাগরণ, কামনাকে রূপান্তর এবং গুরুর পরম গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন, যা আত্ম-উপলব্ধির দিকে নিয়ে যায়


Powered by Blogger.