অন্তরে যার সদায় সহজ রূপ জাগে
(৮)
অন্তরে যার
সদায় সহজ রূপ জাগে।
সে নাম বলুক
না বলুক মুখে ৼ
যাহার কর্তৃক
সংসার
নামের অন্ত
নাই কিছু আর
বলুক যে নাম
ইচ্ছা হয় তার
নাম বলে যদি
রূপ দেখে ৼ
যে নয় গুরু-রূপের
আশ্রি
কূজনে যেয়ে
ভুলায় তারি
ধন্য যারা রূপ
নেহারি
রূপ দেখে রয়
ঠিক বাগে ৼ
নামেতেই রূপ
নেহার
সর্বজয় সাধক
তারা
সিরাজ সাঁই
কয় লালন গোড়া
আলি গেলি কিসের
লেগে ৼ
প্রথম স্তবক:
"অন্তরে যার সদায় সহজ রূপ জাগে। সে নাম
বলুক না বলুক মুখে ৼ"
- অন্তরে যার: যার
হৃদয়ের গভীরে, যার ভেতরের সত্ত্বায়।
- সদায়: সর্বদা, সবসময়।
- সহজ রূপ জাগে: পরম
সত্তার যে প্রকৃত ও স্বতঃস্ফূর্ত রূপ (বা আত্মজ্ঞান) তা আপনা-আপনিই প্রকাশিত
হয়। 'সহজ রূপ' বলতে পরম সত্তার সেই মৌলিক ও অনাদি স্বরূপকে বোঝানো হয়েছে যা কোনো
আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে নয়, বরং
স্বতঃস্ফূর্তভাবে উপলব্ধ হয়।
- সে নাম বলুক না বলুক মুখে: সে ব্যক্তি মুখে ঈশ্বরের নাম জপ করুক বা না করুক, তাতে কিছু যায় আসে না। এখানে নামের বাহ্যিক উচ্চারণের চেয়ে
অভ্যন্তরীণ উপলব্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবক:
"যাহার কর্তৃক সংসার নামের
অন্ত নাই কিছু আর বলুক যে নাম ইচ্ছা হয়
তার নাম বলে যদি রূপ দেখে ৼ"
- যাহার কর্তৃক সংসার: যার
দ্বারা এই জগৎ বা সৃষ্টি পরিচালিত হয়, অর্থাৎ
পরম সত্তা বা ঈশ্বর।
- নামের অন্ত নাই কিছু আর: তাঁর (পরম সত্তার) নামের কোনো শেষ নেই; অর্থাৎ ঈশ্বরের অসংখ্য নাম রয়েছে।
- বলুক যে নাম ইচ্ছা হয় তার: যে কোনো নাম জপ করুক বা উচ্চারণ করুক, যা তার ইচ্ছা হয়।
- নাম বলে যদি রূপ দেখে: যদি
সেই নাম জপের মাধ্যমে সে পরম সত্তার আসল 'রূপ' বা স্বরূপকে উপলব্ধি করতে পারে। এখানে মূল শর্ত হলো নাম জপের মাধ্যমে
রূপের উপলব্ধি, কেবল নাম জপ নয়।
তৃতীয় স্তবক:
"যে নয় গুরু-রূপের আশ্রি কূজনে
যেয়ে ভুলায় তারি ধন্য যারা রূপ নেহারি রূপ দেখে রয় ঠিক বাগে ৼ"
- যে নয় গুরু-রূপের আশ্রি: যে ব্যক্তি গুরুর (আধ্যাত্মিক শিক্ষক) প্রকৃত রূপ বা শিক্ষার আশ্রয়
নেয় না। এখানে 'গুরু-রূপ' বলতে গুরুর নির্দেশিত পথ এবং তার মূল সত্যকে বোঝানো হয়েছে, কেবল গুরুর বাহ্যিক রূপ নয়।
- কূজনে যেয়ে ভুলায় তারি: সে বৃথা কলহ করে বা তর্ক করে নিজেকেই ধোঁকা দেয়। 'কূজন' বলতে অনর্থক বাক্য ব্যয় বা
কোন্দল বোঝাতে পারে। অর্থাৎ, যারা
গুরুর প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে না, তারা
নিজেদের বৃথা বিতর্কে জড়িয়ে ফেলে।
- ধন্য যারা রূপ নেহারি: তারাই
ভাগ্যবান বা ধন্য যারা সেই পরম সত্তার 'রূপ' বা প্রকৃত স্বরূপকে দেখতে পায় (উপলব্ধি করতে পারে)। 'নেহারি' মানে দেখা বা নিরীক্ষণ করা।
- রূপ দেখে রয় ঠিক বাগে: যারা এই রূপ উপলব্ধি করে, তারা
সঠিক পথে বা সঠিক অবস্থায় থাকে। 'ঠিক
বাগে' মানে ঠিকভাবে, সঠিক অবস্থানে বা নিয়ন্ত্রণে থাকা।
চতুর্থ স্তবক:
"নামেতেই রূপ নেহার সর্বজয়
সাধক তারা সিরাজ সাঁই কয় লালন গোড়া আলি গেলি কিসের লেগে ৼ"
- নামেতেই রূপ নেহার: (যারা)
নামের মাধ্যমে রূপকে উপলব্ধি করে। এখানে আগের স্তবকের কথারই পুনরাবৃত্তি করে
বলা হচ্ছে যে নাম কেবল একটি মাধ্যম, আসল
লক্ষ্য রূপের উপলব্ধি।
- সর্বজয় সাধক তারা: তারাই
প্রকৃত সাধক যারা সব কিছুকে জয় করেছে, অর্থাৎ
জাগতিক মোহ ও অজ্ঞানতাকে অতিক্রম করেছে।
- সিরাজ সাঁই কয় লালন গোড়া: লালনের গুরু সিরাজ সাঁই (বা সিরাজ শাহ) লালনকে উদ্দেশ্য করে বলছেন,
"হে গোঁড়া (অনমনীয়) লালন।"
- আলি গেলি কিসের লেগে: তুমি
এই 'আলি' বা
পথ ধরে কিসের জন্য গেছ? 'আলি' এখানে পথ বা সাধন পদ্ধতিকে বোঝানো হয়েছে। গুরু লালনকে প্রশ্ন করছেন
যে তিনি কোন উদ্দেশ্যে এই সাধন পথ গ্রহণ করেছেন, যদি তিনি রূপের উপলব্ধি না করেন? এটি
এক ধরণের প্রশ্ন ছুঁড়ে দেওয়া যা গভীর উপলব্ধির দিকে ইঙ্গিত করে।
এই
গানটিতে লালন ফকির পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, কেবল
নাম জপ করা বা বাহ্যিক আচার-অনুষ্ঠান পালন করা আসল সাধন নয়। আসল সাধন হলো সেই নাম
জপের মাধ্যমে পরম সত্তার প্রকৃত স্বরূপ বা আত্মজ্ঞানকে উপলব্ধি করা। গুরুর
নির্দেশনা মেনে এই উপলব্ধিতে পৌঁছানোই প্রকৃত মুক্তি।
