অন্তিম কালের কালে
(৯)
অন্তিম কালের
কালে
ওকি হয় না জানি।
কী মায়াঘোরে
কাটালি হারে
দিনমনি ৼ
এনেছিলে বসে
খেলে
উপার্জন কই
কী করিলে
নিকাশের বেলা,
খাটবে না ভোলা
আউলো বাণী ৼ
জেনে শুনে সোনা
ফেলে
মন মজালে রাং
পিতলে
এ লাজের কথা,
বলব কোথা
মন এখনি ৼ
ঠকে গেলাম কাজে
কাজে
ঘিরিলি উনপঞ্চাশে
লালন বলে মন,
কি হবে এখন
বল রে শুনি
ৼ
প্রথম স্তবক:
"অন্তিম কালের কালে ওকি হয়
না জানি। কী মায়াঘোরে কাটালি হারে দিনমনি ৼ"
- অন্তিম কালের কালে: জীবনের
শেষ সময়ে, যখন মৃত্যুর মুহূর্ত ঘনিয়ে
আসে।
- ওকি হয় না জানি: কী
ঘটে বা কী অবস্থা হয়, তা আমার জানা নেই। (মৃত্যুর
পরবর্তী অবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ভয়।)
- কী মায়াঘোরে: কীসের
মায়াজাল বা মোহের আবর্তে। 'মায়া' বলতে এখানে পার্থিব ভোগ, আসক্তি, এবং জাগতিক মোহকে বোঝানো হয়েছে।
- কাটালি হারে: তুমি
কাটিয়ে দিলে, বা নষ্ট করে ফেললে। 'হারে' একটি আক্ষেপ বা অনুশোচনার
শব্দ।
- দিনমনি: হে
মন! 'দিনমনি' বলতে সূর্যের মতো মূল্যবান সময় বা জীবনের প্রতিটি দিনকে বোঝানো
হয়েছে, যা এখানে মনকে উদ্দেশ্য করে
বলা হয়েছে।
দ্বিতীয় স্তবক:
"এনেছিলে বসে খেলে উপার্জন
কই কী করিলে নিকাশের বেলা, খাটবে না ভোলা আউলো বাণী ৼ"
- এনেছিলে বসে খেলে: যখন
তুমি এই পৃথিবীতে এসেছিলে, তখন
নিষ্ক্রিয়ভাবে বসে ছিলে এবং খেলাধুলায় (আনন্দ-ফুর্তি বা অপ্রয়োজনীয় কাজে)
সময় কাটালে। (জীবনের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থতা।)
- উপার্জন কই কী করিলে: তোমার
আধ্যাত্মিক উপার্জন কোথায়? তুমি
জীবনে কী অর্জন করলে? (এখানে 'উপার্জন' বলতে সৎকর্ম, পুণ্য, আত্মজ্ঞান বা পারমার্থিক
সম্পদকে বোঝানো হয়েছে।)
- নিকাশের বেলা: হিসাবের
সময়, অর্থাৎ মৃত্যুর পর কর্মফলের
হিসাব দিতে যখন হবে।
- খাটবে না ভোলা: তখন
তোমার ভুলে ভরা বা অবহেলিত জীবন কোনো কাজে আসবে না। 'ভোলা' মানে ভুলে যাওয়া বা ভুল
করে কাটানো জীবন।
- আউলো বাণী: এলোমেলো
কথা বা অর্থহীন যুক্তি। অর্থাৎ, হিসাবের
সময় তোমার কোনো অজুহাত বা এলোমেলো যুক্তি কাজে আসবে না।
তৃতীয় স্তবক:
"জেনে শুনে সোনা ফেলে মন
মজালে রাং পিতলে এ লাজের কথা, বলব কোথা মন এখনি ৼ"
- জেনে শুনে: সব
কিছু জেনেবুঝে, সচেতনভাবে।
- সোনা ফেলে: সোনা
(মূল্যবান জিনিস) ফেলে দিয়ে। এখানে 'সোনা' বলতে জীবনের অমূল্য সময়, মানবজন্মের
সুযোগ, আত্মজ্ঞান বা আধ্যাত্মিক
সম্পদকে বোঝানো হয়েছে।
- মন মজালে রাং পিতলে: তোমার
মনকে রদ্দি জিনিস বা সস্তা পিতলের প্রতি আকৃষ্ট করেছ। 'রাং পিতল' বলতে তুচ্ছ পার্থিব বস্তুকে
বোঝানো হয়েছে। (অর্থাৎ, মূল্যবানকে
উপেক্ষা করে মূল্যহীনে আসক্ত হওয়া।)
- এ লাজের কথা: এটি
এক লজ্জাজনক বা অপমানের বিষয়।
- বলব কোথা: এই
লজ্জার কথা আমি আর কোথায় বলব? (নিজের
প্রতি ধিক্কার এবং অনুশোচনা।)
- মন এখনি: হে
মন, এখনই (এই মুহূর্তে)। (নিজেকেই যেন প্রশ্ন করে
আক্ষেপ করা হচ্ছে।)
চতুর্থ স্তবক:
"ঠকে গেলাম কাজে কাজে ঘিরিলি
উনপঞ্চাশে লালন বলে মন, কি হবে এখন বল রে শুনি ৼ"
- ঠকে গেলাম কাজে কাজে: জীবনের
বিভিন্ন কাজে বা কর্মে আমি প্রতারিত হয়েছি বা ভুল করেছি।
- ঘিরিলি উনপঞ্চাশে: 'উনপঞ্চাশ' বা ৪৯ সংখ্যাটি বাতাসের ৪৯টি মারুত-তত্ত্বের সাথে সম্পর্কিত হতে পারে, যা মানুষের মনকে চঞ্চল করে। অথবা এটি জীবনের বিভিন্ন মায়াজাল বা
রিপুকে বোঝাতে পারে যা মানুষকে ঘিরে ফেলে। সহজভাবে, এটি বোঝায় যে মানুষ পার্থিব নানা ঝামেলা ও মোহ দ্বারা আবদ্ধ হয়ে
পড়ে।
- লালন বলে মন, কি হবে এখন: লালন ফকির তার মনকে প্রশ্ন করছেন, এখন (জীবনের শেষ বেলায় বা এই পরিস্থিতিতে) কী হবে?
- বল রে শুনি: আমাকে
বলো, আমি শুনতে চাই। (এটি এক প্রকার হতাশা এবং শেষ
মুহূর্তে সমাধানের আকুতি।)
এই
গানটিতে লালন জীবনের নশ্বরতা, সময়ের মূল্য এবং জাগতিক
মোহের ক্ষতিকর প্রভাব নিয়ে গভীরভাবে আত্ম-বিশ্লেষণ করেছেন। তিনি মানবজন্মের
সুযোগকে কাজে লাগিয়ে আধ্যাত্মিক উপার্জন না করার অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন।