অন্ধকারে রাগের পরে ছিল যখন সাঁই
(১০)
অন্ধকারে রাগের
পরে ছিল যখন সাঁই
কীসের পরে ভেসেছিল
কে দিল আশ্রয়
ৼ
তখন কোন আকার
ধরে
ভেসেছি কোন
প্রকারে
কোন সময় কোন
কায়া ধরে
ভেসেছিল সাঁই
ৼ
পাক-পাঞ্জাতন
হইল যারা
কীসের পরে ভাসর
তারা
কোন সময় নূর
ছেতারা
ধরেছিল সাঁই
ৼ
ছেতারা রূপ
হল কখন
কী ছিল তার
আগে তখন
লালন বলে সে
কথা কেমন
বুঝা হলো দায়
ৼ
প্রথম স্তবক:
"অন্ধকারে রাগের পরে ছিল যখন সাঁই কীসের
পরে ভেসেছিল কে দিল আশ্রয় ৼ"
- অন্ধকারে রাগের পরে: সেই
ঘন অন্ধকারের (অর্থাৎ সৃষ্টির পূর্বের শূন্যতা বা অনাদি অবস্থার) পর, যখন পরম সত্তা (সাঁই) তাঁর নিজস্ব 'রাগ' বা স্বরূপে (নিজ অস্তিত্বে)
বিরাজমান ছিলেন। এখানে 'রাগ' বলতে ঈশ্বরের আদিম সত্তা বা একাকীত্বকে বোঝানো হয়েছে।
- ছিল যখন সাঁই: যখন
ঈশ্বর ছিলেন।
- কীসের পরে ভেসেছিল: তিনি
কিসের উপরে ভাসমান ছিলেন? (এই
প্রশ্নটি ঈশ্বরের নিরালম্ব অবস্থা এবং সৃষ্টির আদিতে তাঁর অবস্থান নিয়ে
কৌতূহল প্রকাশ করে)।
- কে দিল আশ্রয়: তাঁকে
কে আশ্রয় দিয়েছিল? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, যখন আর কিছুই ছিল না, তখন
ঈশ্বর কীভাবে অবস্থান করছিলেন এবং কে তাঁর অবলম্বন ছিল)।
দ্বিতীয় স্তবক:
"তখন কোন আকার ধরে ভেসেছি
কোন প্রকারে কোন সময় কোন কায়া ধরে ভেসেছিল সাঁই ৼ"
- তখন কোন আকার ধরে: সেই
সৃষ্টিপূর্ব অবস্থায় তিনি (ঈশ্বর) কোন রূপ বা আকার ধারণ করেছিলেন?
- ভেসেছি কোন প্রকারে: কীভাবে
বা কোন অবস্থায় তিনি ভাসমান ছিলেন? (এখানে
'ভেসেছি' সম্ভবত
কবির আত্মগত জিজ্ঞাসা, যেখানে তিনি নিজেকে সেই
আদিম অবস্থার সাথে একীভূত করছেন, অথবা
প্রশ্নটি এভাবেও হতে পারে: কীভাবে ভাসমান ছিল?)।
- কোন সময় কোন কায়া ধরে: সেই অনাদি কালে, যখন
সময়ের ধারণাই ছিল না, তখন তিনি কোন শরীর বা রূপ
ধারণ করে ছিলেন?
- ভেসেছিল সাঁই: ঈশ্বর
ভাসমান ছিলেন।
তৃতীয় স্তবক:
"পাক-পাঞ্জাতন হইল যারা কীসের
পরে ভাসর তারা কোন সময় নূর ছেতারা ধরেছিল সাঁই ৼ"
- পাক-পাঞ্জাতন হইল যারা: 'পাক-পাঞ্জাতন' ইসলামের শিয়া মতবাদ অনুসারে খুবই পবিত্র পাঁচজন ব্যক্তিত্বকে বোঝায়:
হযরত মুহাম্মদ (সাঃ), হযরত আলী (আঃ), হযরত ফাতেমা (আঃ), হযরত
হাসান (আঃ), এবং হযরত হোসাইন (আঃ)। লালন
এখানে এই পবিত্র সত্তাদের সৃষ্টির মূলে থাকা আধ্যাত্মিক উৎস নিয়ে প্রশ্ন
করছেন।
- কীসের পরে ভাসর তারা: সেই
পাক-পাঞ্জাতন কিসের ওপর ভাসমান ছিলেন? (অর্থাৎ, তাদের অস্তিত্বের ভিত্তি কী ছিল?)।
- কোন সময় নূর ছেতারা: 'নূর' মানে ঐশ্বরিক আলো বা জ্যোতি, আর
'ছেতারা' (সিতারা)
মানে তারা বা নক্ষত্র। এখানে 'নূর
ছেতারা' বলতে সেই আদিম ঐশ্বরিক
জ্যোতির্ময় রূপকে বোঝানো হয়েছে। কোন সময়ে সেই জ্যোতির্ময় রূপ ধারণ করলেন?
- ধরেছিল সাঁই: ঈশ্বর
(সেই নূর ছেতারা রূপ) ধারণ করেছিলেন।
চতুর্থ স্তবক:
"ছেতারা রূপ হল কখন কী ছিল
তার আগে তখন লালন বলে সে কথা কেমন বুঝা হলো দায় ৼ"
- ছেতারা রূপ হল কখন: সেই
জ্যোতির্ময় রূপ বা 'ছেতারা' কখন অস্তিত্ব লাভ করল?
- কী ছিল তার আগে তখন: সেই
জ্যোতির্ময় রূপের আগে তখন কী ছিল? (অর্থাৎ, সৃষ্টিরও আগের অবস্থা, যা
মানুষের ধারণার অতীত)।
- লালন বলে সে কথা কেমন: লালন
ফকির বলেন, সেই কথা (সৃষ্টির আদি
রহস্য) কেমন?
- বুঝা হলো দায়: তা
বোঝা বা উপলব্ধি করা অত্যন্ত কঠিন বা দায়সাপেক্ষ। (এখানে লালন সেই
অতীন্দ্রিয় রহস্যের অসীমতা এবং মানুষের সীমিত জ্ঞান দিয়ে তা উপলব্ধি করার
অক্ষমতা স্বীকার করছেন।)
এই
গানটি লালনের গভীর আধ্যাত্মিক অনুসন্ধানের পরিচয় দেয়, যেখানে তিনি শুধু সৃষ্টির প্রক্রিয়া নিয়েই প্রশ্ন তোলেননি, বরং ঈশ্বরের নিরাকার ও অনাদি সত্তার প্রকৃতি নিয়েও কৌতূহল প্রকাশ করেছেন।
একই সাথে তিনি স্বীকার করেছেন যে এই মহৎ রহস্য মানব বুদ্ধির পক্ষে সম্পূর্ণভাবে
বোঝা প্রায় অসম্ভব।