অধরাকে ধরতে পারি কই গো তারে তার
(১১)
অধরাকে ধরতে
পারি কই গো তারে তার।
আত্মারূপে চলে
ফিরে
মানুষ মারা
কলের পর ৼ
প্রেমগঞ্জের
রসিক যারা, কামগঞ্জে ভুল
কামে থেকে ধরতে
পারে তরঙ্গের কূল
এপারেতে বসে
দেখি ওপারেতে কূল
মানুষ মারি
মানুষ ধরি মানুষ খবরদার ৼ
শূন্যের উপরে
ধনুক ধরা বেজায় বিষফল
চলক পলকে হেলে
পড়ে এছা মজার কল
ক্ষণেক ধরা
ক্ষণেক অধর, পথ ছাড়া অপথে চল
ক্ষণেই নিরাকার
মানুষ ক্ষণেই আকার ৼ
ওসে আবার ভাঙ্গা
যন্ত্র বাজে ঠসঠস
পাকে পাকে তার
ছিঁড়ে যায় করে খসখস
সিরাজ সাঁই
কয় বাজে না ভাঙা বস
লালন রে তোর
কেবল দৌড়াদৌড়ি সার ৼ
প্রথম স্তবক:
"অধরাকে ধরতে পারি কই গো তারে তার। আত্মারূপে চলে ফিরে মানুষ
মারা কলের পর ৼ"
- অধরাকে: যাকে
ধরা যায় না, যাঁর কোনো নির্দিষ্ট রূপ
নেই। এখানে 'অধরা' বলতে পরমাত্মা বা নিরাকার সত্তাকে বোঝানো হয়েছে।
- ধরতে পারি কই গো তারে তার: তাকে কীভাবে ধরব? কীভাবে
তার নাগাল পাব? (এটি সাধকের অক্ষমতা বা পরম
সত্তার অলঙ্ঘনীয় প্রকৃতি নির্দেশ করে)।
- আত্মারূপে চলে ফিরে: তিনি
আত্মারূপে (প্রাণসত্তা হিসেবে) সব জীবদেহে বিচরণ করেন।
- মানুষ মারা কলের পর: 'মানুষ
মারা কল' বলতে এখানে মানবদেহকে
বোঝানো হয়েছে। এটি যেন এক যন্ত্র, যার
মধ্যে আত্মা অবস্থান করে। 'মারা' শব্দটি রূপক, বোঝানো হয়েছে যে এই দেহের
মধ্যে আত্মা নিহিত, এবং এই দেহ নশ্বর, অথচ আত্মা অবিনশ্বর।
দ্বিতীয় স্তবক:
"প্রেমগঞ্জের রসিক যারা, কামগঞ্জে ভুল কামে থেকে ধরতে পারে তরঙ্গের কূল এপারেতে বসে দেখি ওপারেতে কূল মানুষ মারি মানুষ ধরি মানুষ খবরদার ৼ"
- প্রেমগঞ্জের রসিক যারা: যারা প্রেমের পথে (ভক্তির পথে) জ্ঞানী বা অভিজ্ঞ। 'প্রেমগঞ্জ' রূপক অর্থে ভক্তি বা
আধ্যাত্মিক প্রেমের জগৎ।
- কামগঞ্জে ভুল: 'কামগঞ্জ' বলতে জাগতিক কামনা-বাসনা বা পার্থিব আসক্তির জগৎ। যারা কেবল কামনার
জগতে থাকে, তারা ভুল করে বা সঠিক পথ
থেকে বিচ্যুত হয়।
- কামে থেকে ধরতে পারে তরঙ্গের কূল: (কিন্তু)
আশ্চর্য হলো, কামনার মধ্যেই থেকেও কেউ
কেউ (অর্থাৎ অভিজ্ঞ সাধক) সেই আধ্যাত্মিক জ্ঞানের তরঙ্গের কূল (প্রান্ত বা
সত্য) ধরতে পারে। এটি সাধন পদ্ধতির এক বিশেষ দিক নির্দেশ করে, যেখানে কামনাকে নিয়ন্ত্রণ করে বা তার ঊর্ধ্বে উঠে সত্য উপলব্ধি করা
যায়।
- এপারেতে বসে দেখি ওপারেতে কূল: সাধক যেন এই (পার্থিব) তীরে বসে ওপারে (আধ্যাত্মিক জগতে) পৌঁছানোর পথ
বা লক্ষ্য দেখতে পান। 'এপার' হলো নশ্বর জগৎ, আর 'ওপার' হলো পরম সত্তার জগৎ।
- মানুষ মারি মানুষ ধরি মানুষ খবরদার: এটি একটি জটিল এবং গভীর রূপক।
- মানুষ মারি: এখানে
'মানুষ মারা' বলতে
রিপু দমন, অহংকার নাশ, বা জাগতিক 'আমি' সত্তাকে বিলীন করে দেওয়া বোঝায়।
- মানুষ ধরি: সেই
রিপু দমনের মাধ্যমে ভেতরের প্রকৃত মানুষ বা পরমাত্মাকে (বা আত্মারূপে
বিদ্যমান ঈশ্বরকে) ধরা বা উপলব্ধি করা।
- মানুষ খবরদার: যিনি
এই রহস্য জানেন এবং সাধন পথে অগ্রসর হন, তিনি
'মানুষের' (পরমাত্মার)
প্রতি সর্বদা সতর্ক ও সচেতন থাকেন, কারণ
তিনি অত্যন্ত সূক্ষ্ম এবং অধরা।
তৃতীয় স্তবক:
"শূন্যের উপরে ধনুক ধরা বেজায় বিষফল চলক পলকে হেলে পড়ে এছা মজার কল ক্ষণেক
ধরা ক্ষণেক অধর, পথ ছাড়া অপথে চল ক্ষণেই নিরাকার মানুষ ক্ষণেই আকার ৼ"
- শূন্যের উপরে ধনুক ধরা: এটি এমন এক কাজ যা শূন্যের ওপর ভিত্তি করে, যা অত্যন্ত কঠিন বা অসম্ভব। 'ধনুক
ধরা' সম্ভবত কোনো সাধনার কঠিন প্রক্রিয়া বা ভারসাম্যহীন
অবস্থাকে বোঝাতে পারে।
- বেজায় বিষফল: এর
ফল অত্যন্ত তিক্ত বা খারাপ।
- চলক পলকে হেলে পড়ে: ক্ষণিকের
ভুলে বা অসাবধানতায় (এক পলকে) সবকিছু হেলে যায় বা নষ্ট হয়ে যায়।
- এছা মজার কল: এটি
এমনই এক অদ্ভুত বা মজার যন্ত্র (মানবদেহ বা জীবন)।
- ক্ষণেক ধরা ক্ষণেক অধর: সেই 'মানুষ' (পরমাত্মা) এক মুহূর্তে ধরা দেয় (উপলব্ধি হয়) আবার পরের মুহূর্তেই
অধরা হয়ে যায়। এটি পরম সত্তার অস্থির বা ধরা-ছোঁয়ার বাইরের প্রকৃতিকে
বোঝায়।
- পথ ছাড়া অপথে চল: সাধক
সঠিক পথ ছেড়ে ভুল পথে চলে যায়। এটি সাধনার পথে বিচ্যুতি বা ভুল করার
প্রবণতাকে ইঙ্গিত করে।
- ক্ষণেই নিরাকার মানুষ ক্ষণেই আকার: সেই পরমাত্মা (মানুষ) এক মুহূর্তে নিরাকার (রূপহীন) আবার পরের
মুহূর্তে আকার (রূপ ধারণকারী) হয়। এটি পরম সত্তার নিরাকার ও সাকার উভয়
রূপকে ধারণ করার ক্ষমতাকে বোঝায়, যা
সাধকের উপলব্ধির ভিন্নতার উপরও নির্ভর করে।
চতুর্থ স্তবক:
"ওসে আবার ভাঙ্গা যন্ত্র বাজে ঠসঠস পাকে পাকে তার ছিঁড়ে যায় করে খসখস সিরাজ সাঁই কয় বাজে না ভাঙা বস লালন রে
তোর কেবল দৌড়াদৌড়ি সার ৼ"
- ওসে আবার ভাঙ্গা যন্ত্র বাজে ঠসঠস: এই মানবদেহ (রূপক অর্থে 'যন্ত্র') ভঙ্গুর এবং এটি 'ঠসঠস' করে বাজে, অর্থাৎ এর কার্যক্ষমতা
হ্রাস পায় বা দুর্বল হয়ে যায়।
- পাকে পাকে তার ছিঁড়ে যায় করে খসখস: এই যন্ত্রের (দেহের) তারগুলো (জীবন শক্তি বা বিভিন্ন ইন্দ্রিয়) একে
একে দুর্বল হয়ে ছিঁড়ে যায় এবং 'খসখস' আওয়াজ করে। এটি বার্ধক্য এবং মৃত্যুর দিকে ধাবিত হওয়ার প্রক্রিয়াকে
বোঝায়।
- সিরাজ সাঁই কয় বাজে না ভাঙা বস: লালনের গুরু সিরাজ সাঁই বলেন, "হে বস (এখানে সম্মানসূচক সম্বোধন), ভাঙ্গা
যন্ত্র বাজে না।" অর্থাৎ, একবার
দেহ (যন্ত্র) ভেঙে গেলে বা কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেললে আর তা দিয়ে সাধন করা
যায় না।
- লালন রে তোর কেবল দৌড়াদৌড়ি সার: হে লালন, তোমার কেবল এদিক ওদিক
ছোটাছুটি করা বা বৃথা চেষ্টা করা সার হয়েছে (অর্থাৎ ফলহীন)। গুরু এখানে
লালনকে সতর্ক করছেন যে, সময়
থাকতে সাধন করে সেই অধরাকে ধরতে না পারলে শেষ বয়সে কেবল আক্ষেপই থাকবে।
এই
গানটি মানবদেহের নশ্বরতা এবং জীবনের সীমাবদ্ধতার মধ্যে আধ্যাত্মিক সত্য উপলব্ধির
জন্য সঠিক সাধনার গুরুত্ব তুলে ধরেছে। এটি একদিকে অধরা পরমাত্মার বর্ণনা, অন্যদিকে মানবজীবনের সুযোগ এবং এর সদ্ব্যবহারের আহ্বান।