অপারের কাণ্ডার নবীজী আমার
(১২)
অপারের কাণ্ডার
নবীজী আমার
ভোজন সাধন বৃথা
গেল নবী না চিনে।
নবী আউল আখের
বাতেন জাহের
কখন কোন রূপ
ধারণ করেন কোনখানে ৼ
আল্লাহ নবী
দুটি অবতার
গাছ বীজ যে-রূপ
দেখি সে প্রকার
সুবুদ্ধিতে
কর তার বিচার
ওসে গাছ বড়
কি ফলটি বড় নেও জেনে ৼ
আসমান জমিন
জলধি পবন
যে নবীর নূরে
হয় সৃজন
বলো কোথায় ছিল
সে নবীর আসন
নবী পুরষ কি
প্রকৃতি আকার তখনে ৼ
আপ্ততত্ত্বে
ফাজেল যে জনা
সেই জানে সাঁইয়ের
নিগূঢ় কারখানা
রাছুল রূপে
প্রকাশ রব্বানা
লালন বলে দরবেশ
সিরাজ সাঁইর গুণে ৼ
প্রথম স্তবক:
"অপারের কাণ্ডার নবীজী আমার ভোজন
সাধন বৃথা গেল নবী না চিনে। নবী আউল
আখের বাতেন জাহের কখন কোন রূপ ধারণ করেন
কোনখানে ৼ"
- অপারের কাণ্ডার: যিনি
অসীম বা অপার সমুদ্রের (সংসার বা ভবসাগর) কাণ্ডারী অর্থাৎ পথপ্রদর্শক ও
ত্রাণকর্তা। এখানে নবীজী (হযরত মুহাম্মদ সা.)-কে সেই কাণ্ডারী হিসেবে উল্লেখ
করা হয়েছে।
- নবীজী আমার: আমার
নবীজী, অর্থাৎ লালনের একান্ত আপন ও
আরাধ্য নবী।
- ভোজন সাধন বৃথা গেল নবী না চিনে: যদি নবীকে (এখানে রূপক অর্থে, পরম
সত্তার প্রকৃত স্বরূপ বা আত্মজ্ঞান) না চেনা যায়, তাহলে সমস্ত ভোজন (জীবিকা নির্বাহ) এবং সাধন (ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান
বা আধ্যাত্মিক অনুশীলন) বৃথা। এটি বোঝায় যে, নবীকে উপলব্ধি করাই জীবনের আসল উদ্দেশ্য, অন্যথায় সমস্ত কর্ম অর্থহীন।
- নবী আউল আখের বাতেন জাহের: এই পঙ্ক্তিটি নবীর সর্বব্যাপী ও চিরন্তন প্রকৃতিকে বোঝায়।
- আউল: আদি, প্রথম।
- আখের: শেষ, অন্তিম।
- বাতেন: গোপন, অপ্রকাশিত, অন্তর্নিহিত।
- জাহের: প্রকাশ্য, দৃশ্যমান, বাহ্যিক।
- অর্থাৎ, নবীই আদি, নবীই অন্তিম; নবীই অপ্রকাশিত, নবীই প্রকাশিত। তিনি সব কিছুর মধ্যেই বিদ্যমান।
- কখন কোন রূপ ধারণ করেন কোনখানে: সেই নবী কখন কোন রূপ ধারণ করেন এবং কোথায় (কোন রূপে বা স্থানে)
প্রকাশিত হন, তা বোঝা কঠিন। এটি নবীর
দৈবত্ব এবং তাঁর বিভিন্ন প্রকাশের রহস্যময়তাকে নির্দেশ করে।
দ্বিতীয় স্তবক:
"আল্লাহ নবী দুটি অবতার গাছ বীজ
যে-রূপ দেখি সে প্রকার সুবুদ্ধিতে
কর তার বিচার ওসে গাছ বড় কি ফলটি বড় নেও
জেনে ৼ"
- আল্লাহ নবী দুটি অবতার: আল্লাহ এবং নবীকে দুটি অভিন্ন বা পরস্পর নির্ভরশীল সত্তা হিসেবে দেখা
হচ্ছে, যেমন দুটি অবতার বা প্রকাশ।
এটি ইসলামী সৃষ্টিতত্ত্বের কিছু সূক্ষ্ম ধারণার সাথে সম্পর্কিত, যেখানে নূরে মোহাম্মদ (মুহাম্মদের জ্যোতি) কে আদি সৃষ্টি হিসেবে দেখা
হয়।
- গাছ বীজ যে-রূপ দেখি সে প্রকার: তাদের সম্পর্ক গাছ এবং বীজের মতো। বীজ থেকে গাছ হয় এবং গাছ থেকে বীজ
উৎপন্ন হয়। এটি তাদের পারস্পরিক নির্ভরশীলতা এবং অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ককে
বোঝায়।
- সুবুদ্ধিতে কর তার বিচার: তুমি তোমার সুবুদ্ধি বা সঠিক বিচারবুদ্ধি দিয়ে এর বিচার করো।
- ওসে গাছ বড় কি ফলটি বড় নেও জেনে: তুমি ভালো করে জেনে নাও যে, গাছ
(সৃষ্টিকর্তা/আল্লাহ) বড় নাকি ফল (সৃষ্টি/নবী বা সৃষ্টির প্রকাশ) বড়? এই প্রশ্নটি সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক এবং তাদের আপেক্ষিক গুরুত্ব
নিয়ে গভীর দার্শনিক বিচারবুদ্ধি প্রয়োগের আহ্বান। (লালনের মতো সুফি বাউলরা
প্রায়শই স্রষ্টাকে সৃষ্টির মধ্যে এবং সৃষ্টিকে স্রষ্টার প্রকাশ হিসেবে
দেখেন)।
তৃতীয় স্তবক:
"আসমান জমিন জলধি পবন যে নবীর
নূরে হয় সৃজন বলো কোথায় ছিল সে নবীর আসন নবী পুরষ কি প্রকৃতি আকার তখনে ৼ"
- আসমান জমিন জলধি পবন: আকাশ, পৃথিবী, সমুদ্র এবং বাতাস — এই সমস্ত কিছু।
- যে নবীর নূরে হয় সৃজন: যে নবীর নূর বা ঐশ্বরিক জ্যোতি থেকে এই সমস্ত সৃষ্টি হয়েছে। এটি একটি
প্রচলিত সুফি ধারণা যে, সমস্ত
সৃষ্টি নূরে মুহাম্মদী থেকে উদ্ভূত।
- বলো কোথায় ছিল সে নবীর আসন: তাহলে বলো, সৃষ্টির পূর্বে সেই নবীর
আসন বা অবস্থান কোথায় ছিল? (যখন
আর কিছুই সৃষ্টি হয়নি)।
- নবী পুরষ কি প্রকৃতি আকার তখনে: তখন নবী কি পুরুষ (সক্রিয় স্রষ্টা সত্তা) ছিলেন নাকি প্রকৃতি
(সৃষ্টির উপাদান বা নিরাকার সত্তা) রূপ ধারণ করেছিলেন? এটি নবীর আদিম রূপ এবং পুরুষ-প্রকৃতি দ্বৈততার ঊর্ধ্বে তাঁর অবস্থান
নিয়ে প্রশ্ন।
চতুর্থ স্তবক:
"আপ্ততত্ত্বে ফাজেল যে জনা সেই
জানে সাঁইয়ের নিগূঢ় কারখানা রাছুল
রূপে প্রকাশ রব্বানা লালন বলে দরবেশ সিরাজ
সাঁইর গুণে ৼ"
- আপ্ততত্ত্বে ফাজেল যে জনা: যে ব্যক্তি আত্ম-তত্ত্বে (নিজেকে জানার জ্ঞান) পারদর্শী বা অভিজ্ঞ ('ফাজেল' - আরবি শব্দ, অর্থ জ্ঞানী বা পণ্ডিত)।
- সেই জানে সাঁইয়ের নিগূঢ় কারখানা: সেই ব্যক্তিই পরম সত্তার (সাঁইয়ের) নিগূঢ় বা গভীর রহস্যময় সৃষ্টি
প্রক্রিয়া ('কারখানা') সম্পর্কে জানতে পারে।
- রাছুল রূপে প্রকাশ রব্বানা: সেই 'রব্বানা' (আমাদের পালনকর্তা, আল্লাহ)
রাসুল (নবী) রূপেই নিজেকে প্রকাশ করেন। এটি ইঙ্গিত দেয় যে নবী হলেন ঐশ্বরিক
প্রকাশের প্রধান মাধ্যম।
- লালন বলে দরবেশ সিরাজ সাঁইর গুণে: লালন ফকির বলেন, এই
জ্ঞান তিনি তাঁর গুরু দরবেশ সিরাজ সাঁইয়ের গুণ বা কৃপার ফলেই অর্জন করেছেন।
এটি গুরু বন্দনা এবং তাঁর জ্ঞানের উৎসের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ।
এই
গানটি লালনের দর্শনে নবী এবং আল্লাহর একাত্মতা, সৃষ্টির
রহস্য এবং আত্ম-উপলব্ধির মাধ্যমে সেই রহস্য জানার আকাঙ্ক্ষাকে ফুটিয়ে তোলে। এটি
সুফিবাদের 'আদি নূর' এবং সৃষ্টিতত্ত্বের গভীর ব্যাখ্যা প্রদান করে।