অবোধ মন তোরে আর কি বলি
(১৩)
অবোধ মন তোরে
আর কি বলি।
পেয়ে ধন সে
ধন
সব হারালি ৼ
মহাজনের ধন
এনে
ছড়ালি তুই উলুবনে
কি হবে নিকাশের
দিনে
সে ভাবনা কই
ভাবিলি ৼ
সই করিয়ে পুঁজি
তখন
আনলিরে তিনরতি
একমণ
ব্যাপার করা
যমন তমন
আসলে খাইদ লাগালি
ৼ
করলি ভালো বেচাকেনা
চিনলি না মন
রাং কি সোনা
লালন বলে মন
রসনা
কেন সাধুর হাটে
আলি ৼ
প্রথম স্তবক:
"অবোধ মন তোরে আর কি বলি। পেয়ে
ধন সে ধন সব হারালি ৼ"
- অবোধ মন: হে
নির্বোধ মন, বা অজ্ঞান মন। লালন তার
নিজের মনকে উদ্দেশ্য করে বলছেন।
- তোরে আর কি বলি: তোমাকে
আর কী বলব? (এটি হতাশা এবং বিরক্তির
প্রকাশ)।
- পেয়ে ধন: (তুমি) মহামূল্যবান ধন
পেয়ে। এখানে 'ধন' বলতে মানবজন্ম, জীবনের মূল্যবান সময়, বা
আধ্যাত্মিক জ্ঞান অর্জন
করার সুযোগকে বোঝানো হয়েছে।
- সে ধন সব হারালি: তুমি
সেই ধনসম্পদ সবকিছুই হারিয়ে ফেললে। অর্থাৎ, মানবজন্মের সুযোগ নষ্ট করলে বা আধ্যাত্মিক সম্পদ অর্জন করতে ব্যর্থ
হলে।
দ্বিতীয় স্তবক:
"মহাজনের ধন এনে ছড়ালি
তুই উলুবনে কি হবে নিকাশের দিনে সে ভাবনা কই ভাবিলি ৼ"
- মহাজনের ধন এনে: 'মহাজন' বলতে এখানে পরম সত্তা বা ঈশ্বরকে বোঝানো হয়েছে, যিনি এই জীবনের 'ধন' (প্রাণ, সুযোগ) প্রদান করেছেন। সেই
মহাজনের দেওয়া ধন এনে।
- ছড়ালি তুই উলুবনে: তুমি
তা উলুবনে (মূল্যহীন স্থানে) ছড়িয়ে দিলে বা অপচয় করলে। 'উলুবন' অর্থ মূল্যহীন বা অনুর্বর
স্থান, যেখানে কিছু ফলপ্রসূ হয়
না। এটি বোঝায় যে পার্থিব ভোগবিলাসে বা নিষ্ফল কাজে জীবনের মূল্যবান সময়
নষ্ট করা।
- কি হবে নিকাশের দিনে: হিসাবের
দিনে (অর্থাৎ মৃত্যুর পর বা কর্মফল বিচার করার সময়) কী হবে?
- সে ভাবনা কই ভাবিলি: সেই
কথা তো তুমি একবারও ভাবলে না। (জীবনের শেষ পরিণতি বা কর্মফলের বিষয়ে
উদাসীনতা)।
তৃতীয় স্তবক:
"সই করিয়ে পুঁজি তখন আনলিরে
তিনরতি একমণ ব্যাপার করা যমন তমন আসলে খাইদ লাগালি ৼ"
- সই করিয়ে পুঁজি তখন: (যখন
জন্ম হয়েছিল), তখন চুক্তি করে বা
লিখিতভাবে জীবনের 'পুঁজি' (মূলধন, অর্থাৎ প্রাণ ও সুযোগ)
গ্রহণ করে।
- আনলিরে তিনরতি একমণ: (তুমি)
তিন রতি (অত্যন্ত ক্ষুদ্র পরিমাণ) এনে এক মণ (অনেক বড় পরিমাণ) করে ফেললে।
এটি সম্ভবত লোভ, অসততা বা আধ্যাত্মিক ব্যবসা
করার নামে লাভ করার চেষ্টা বোঝায়, যেখানে
অল্প মূলধন থেকে বেশি কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা থাকে। অথবা, এটি শরীরের ক্ষুদ্র উপাদান (তিন রতি) দিয়ে বিশাল কিছু (এক মন) লাভের
চেষ্টা, যা জাগতিক মোহের কারণ।
- ব্যাপার করা যমন তমন: তোমার
ব্যবসা বা কারবার করাটা ছিল যাচ্ছেতাই রকমের, অর্থাৎ তুমি সঠিকভাবে জীবনের উদ্দেশ্য পূরণ করতে পারোনি।
- আসলে খাইদ লাগালি: (তুমি)
মূলধনই নষ্ট করে ফেললে। 'খাইদ
লাগালি' মানে ক্ষতি করা বা মূলধন
ডুবিয়ে দেওয়া। এটি বোঝায় যে, জীবনের
আসল উদ্দেশ্য পূরণ না করে তুমি তার মূলধনই নষ্ট করে ফেললে।
চতুর্থ স্তবক:
"করলি ভালো বেচাকেনা চিনলি
না মন রাং কি সোনা লালন বলে মন রসনা কেন সাধুর হাটে আলি ৼ"
- করলি ভালো বেচাকেনা: তুমি
ভালো বেচাকেনা করলে না, অর্থাৎ
জীবনের সঠিক পথে চললে না বা ভালো কাজ করলে না।
- চিনলি না মন রাং কি সোনা: হে মন, তুমি চিনতে পারলে না কোনটা 'রাং' (রাংঝাল, মূল্যহীন ধাতু) আর কোনটা 'সোনা' (মূল্যবান বস্তু)। এটি পার্থিব ক্ষণস্থায়ী বস্তু এবং আত্মিক চিরন্তন
সত্যের মধ্যে পার্থক্য করতে না পারার অক্ষমতাকে বোঝায়।
- লালন বলে মন রসনা: লালন
ফকির বলেন, হে মন, হে রসনা (ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা)।
- কেন সাধুর হাটে আলি: (যদি
মূল্য বোঝো না), তাহলে তুমি সাধুদের হাটে
(আধ্যাত্মিক জ্ঞান ও সাধনার পরিবেশে) কেন এসেছিলে? এটি আত্মিক উন্নতির পথে যারা আসে কিন্তু তা উপলব্ধি করতে পারে না, তাদের প্রতি একটি প্রশ্ন বা তিরস্কার।
এই গানে
লালন ফকির মানবজীবনের সার্থকতা নিয়ে গভীর অনুশোচনা প্রকাশ করেছেন এবং আমাদের
মূল্যবান জীবনকে পার্থিব মোহে নষ্ট না করে আত্মিক উন্নতিতে মনোনিবেশ করার আহ্বান
জানিয়েছেন।