অন্ধকারের আগে ছিলেন সাঁই রাগে আলকারেতে ছিল আলের উপর
(৭)
অন্ধকারের আগে
ছিলেন সাঁই রাগে
আলকারেতে ছিল
আলের উপর।
ঝরেছিল একবিন্দু
হইল গম্ভীর সিন্ধু
ভাসিল দীনবন্ধু
নয় লাখ বছর ৼ
অন্ধকার ধন্দকার
নিরাকার কুওকার
তারপরে হল হুহুংকার;
হুহুংকারে শব্দ
হল, ফেনারূপ হইয়া গেল
নীর গম্ভীরে
সাঁই ভাসলেন নিরন্তর ৼ
হুহুংকারে ঝংকার
মেরে দীপ্তকার হয় তারপরে
ধন্ধ ধরে ছিলেন
পরওয়ার;
ছিলেন সাঁই
রাগের পরে, সুরাগে আশ্রয় করে
তখন কুদরতিতে
করিল নিহার ৼ
যখন কুওকারে
কুও ঝরে বাম অঙ্গ ঘর্ষণ করে
তাইতে হইল মেয়ের
আকার;
মেয়ের রক্ত
বিচে শক্ত হল, ডিম্ব তুলে কোলে নিল
ফকির লালন বলে
লিলা চমৎকার ৼ
প্রথম স্তবক:
"অন্ধকারের আগে ছিলেন সাঁই রাগে আলকারেতে
ছিল আলের উপর। ঝরেছিল একবিন্দু হইল গম্ভীর
সিন্ধু ভাসিল দীনবন্ধু নয় লাখ বছর
ৼ"
- অন্ধকারের আগে: এই
মহাবিশ্ব সৃষ্টি হওয়ার পূর্বে, যখন
সবকিছু কেবল অন্ধকার ছিল, অর্থাৎ
সৃষ্টিপূর্ব অবস্থা।
- ছিলেন সাঁই রাগে: 'সাঁই' মানে ঈশ্বর বা পরম সত্তা। 'রাগে' বলতে এখানে তাঁর নিজস্ব অস্তিত্বে, বা
তাঁর স্বরূপে বিরাজমান ছিলেন। এটি ঈশ্বরের অনাদি, আদিহীন অবস্থাকে বোঝায়।
- আলকারেতে ছিল আলের উপর: 'আলকার' বা 'আলখার' বলতে আধ্যাত্মিক শূন্যতা বা আদি সত্তাকে বোঝানো হয়। 'আলের উপর' মানে এই শূন্যতারও উপরে বা
তার মধ্যে। অর্থাৎ, ঈশ্বর এই অসীম ও আদি
শূন্যতারও ওপরে বা তার গভীরে বিরাজমান ছিলেন।
- ঝরেছিল একবিন্দু: সেই
পরম সত্তা থেকে এক বিন্দু নির্গত হয়েছিল। এটি সৃষ্টির প্রথম স্ফুলিঙ্গ বা
আদি কারণের প্রতীক। (অনেক সৃষ্টিতত্ত্বেই এক বিন্দু বা ধ্বনি থেকে সৃষ্টির
সূচনার ধারণা আছে)।
- হইল গম্ভীর সিন্ধু: সেই
এক বিন্দু থেকেই গভীর সমুদ্রের সৃষ্টি হলো। এটি সৃষ্টির বিস্তৃতি এবং আদিম
জলরাশিকে বোঝায়, যা অনেক সৃষ্টিতত্ত্বের অংশ।
- ভাসিল দীনবন্ধু নয় লাখ বছর: সেই গভীর সমুদ্রে 'দীনবন্ধু' (অর্থাৎ ঈশ্বর, যিনি সকলের প্রতি দয়াশীল)
নয় লাখ বছর ধরে ভাসমান ছিলেন। এটি সৃষ্টির দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং ঈশ্বরের
সক্রিয় ভূমিকাকে বোঝায়।
দ্বিতীয় স্তবক:
"অন্ধকার ধন্দকার নিরাকার কুওকার তারপরে
হল হুহুংকার; হুহুংকারে শব্দ হল, ফেনারূপ হইয়া গেল নীর
গম্ভীরে সাঁই ভাসলেন নিরন্তর ৼ"
- অন্ধকার ধন্দকার: ঘন
অন্ধকার এবং এক বিভ্রান্তি বা অস্পষ্টতার অবস্থা। সৃষ্টির আগের অগোছালো, অপরিষ্কার অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে।
- নিরাকার কুওকার: যার
কোনো আকার নেই, এবং 'কুওকার' বলতে হয়তো এক ধরণের গভীর, আদিম ধ্বনি বা শূন্যতার শব্দ বোঝানো হয়েছে।
- তারপরে হল হুহুংকার: সেই
আদিম অবস্থার পর এক প্রবল 'হুহুংকার' বা মহাশূন্যে ধ্বনি সৃষ্টি হলো। এটি মহাবিস্ফোরণ (Big
Bang) বা আদিম ধ্বনি থেকে সৃষ্টির ধারণার সাথে তুলনীয়।
- হুহুংকারে শব্দ হল: সেই
প্রবল ধ্বনি থেকে শব্দ নির্গত হলো।
- ফেনারূপ হইয়া গেল: সেই
শব্দ বা আদিম শক্তি ফেনা বা বুদবুদের রূপ ধারণ করল। এটি পদার্থ বা সৃষ্টির
প্রাথমিক রূপ ধারণের ইঙ্গিত।
- নীর গম্ভীরে সাঁই ভাসলেন নিরন্তর: সেই গভীর জলরাশির মধ্যে ঈশ্বর নিরন্তর ভাসমান ছিলেন। এটি ঈশ্বরের
সর্বত্র বিরাজমানতা ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় তাঁর অবিরাম উপস্থিতিকে নির্দেশ
করে।
তৃতীয় স্তবক:
"হুহুংকারে ঝংকার মেরে দীপ্তকার হয় তারপরে ধন্ধ ধরে ছিলেন পরওয়ার; ছিলেন সাঁই রাগের পরে, সুরাগে আশ্রয় করে তখন
কুদরতিতে করিল নিহার ৼ"
- হুহুংকারে ঝংকার মেরে: সেই
আদিম হুহুংকার এক বিশেষ ঝংকার বা স্পন্দন সৃষ্টি করল।
- দীপ্তকার হয় তারপরে: সেই
ঝংকার থেকে দীপ্তি বা আলোকের সৃষ্টি হলো। অর্থাৎ, অন্ধকার থেকে আলোর উন্মোচন।
- ধন্ধ ধরে ছিলেন পরওয়ার: 'পরওয়ার' বা পরোয়ারদিগার মানে পালনকর্তা বা ঈশ্বর। এই আলোকের সৃষ্টি হওয়ার
পরও তিনি ধন্দ বা অস্পষ্টতার মধ্যে ছিলেন (হয়তো তাঁর সৃষ্টির প্রক্রিয়া
এখনো সম্পূর্ণ হয়নি)।
- ছিলেন সাঁই রাগের পরে: ঈশ্বর
তাঁর নিজস্ব সত্তায় বা স্বরূপে বিরাজমান ছিলেন।
- সুরাগে আশ্রয় করে: তিনি
সুরাগ বা সুন্দর স্বর বা ছন্দে আশ্রয় গ্রহণ করলেন। এটি সৃষ্টির এক ধরণের
ছন্দোময় বা সুসংগঠিত প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।
- তখন কুদরতিতে করিল নিহার: 'কুদরতি' মানে ঐশ্বরিক ক্ষমতা বা শক্তি। সেই সময় তাঁর অলৌকিক ক্ষমতা দ্বারা
তিনি সবকিছু নিহার (সৃষ্টি বা নিরীক্ষণ) করলেন।
চতুর্থ
স্তবক:
"যখন কুওকারে কুও ঝরে বাম অঙ্গ ঘর্ষণ করে তাইতে হইল মেয়ের আকার; মেয়ের রক্ত বিচে শক্ত হল, ডিম্ব তুলে কোলে নিল ফকির
লালন বলে লিলা চমৎকার ৼ"
- যখন কুওকারে কুও ঝরে: যখন
সেই আদিম ধ্বনি বা শূন্যতা থেকে গভীর শব্দ বা ফোঁটা ঝরে পড়ল।
- বাম অঙ্গ ঘর্ষণ করে: (ঈশ্বর)
তাঁর বাম অঙ্গ ঘর্ষণ করলেন। এটি শিব-শক্তির ধারণার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ, যেখানে ঈশ্বরের বাম অঙ্গ থেকে নারী শক্তির সৃষ্টি হয়।
- তাইতে হইল মেয়ের আকার: সেই ঘর্ষণ থেকেই এক নারী রূপ বা আদি শক্তির সৃষ্টি হলো। (এটি
প্রকৃতিরূপা নারীর সৃষ্টি বা আদ্যাশক্তির উন্মোচন)।
- মেয়ের রক্ত বিচে শক্ত হল: সেই নারীর রক্ত (বা জীবনসত্তা) থেকে কিছু কঠিন বা দৃঢ় বস্তুর সৃষ্টি
হলো। এটি হয়তো পৃথিবীর বা অন্য কোনো কঠিন পদার্থের সৃষ্টির প্রতীক।
- ডিম্ব তুলে কোলে নিল: সেই
নারীসত্তা (আদিমাতা) একটি ডিম্ব (ব্রহ্মাণ্ডের প্রতীক) তুলে কোলে নিলেন। এটি
ব্রহ্মাণ্ডের বা জীবকুলের উৎপত্তির ধারণাকে বোঝায়।
- ফকির লালন বলে লিলা চমৎকার: ফকির লালন বলেন, এই
সৃষ্টিলীলা অত্যন্ত চমৎকার বা অলৌকিক।
এই
গানটি লালনের মহাবিশ্ব এবং মানব সৃষ্টির প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি রূপক বর্ণনা, যা বিভিন্ন ধর্মীয় ও দার্শনিক উৎস থেকে ধারণা নিয়ে গঠিত।