অনেক ভাগ্যের ফলে সে চাঁদ কেউ দেখিতে পায়
(৬)
অনেক ভাগ্যের
ফলে
সে চাঁদ কেউ
দেখিতে পায়।
অমাবস্যা নাই
সে চাঁদে
দ্বিদলে তার
কিরণ উদয় ৼ
যথারে সেই চন্দ্র
ভূবন
দিবারাতের নাই
আলাপন
কোটি চন্দ্র
জিনি কিরণ
বিজলী চটকের
ন্যায় ৼ
সিন্দু মাঝে
বিন্ধুবারি
মাঝখানে তার
স্বর্ণগিরি
অধরচাঁদের স্বর্গপুরী
তিল পরিমাণ
জাগায় ৼ
দরশনে দুঃখ
হরে
পরশনে পরশ করে
এমনি সে চাঁদের
মহিমে
লালন ডুবে ডোবে
না তায় ৼ
প্রথম স্তবক:
"অনেক ভাগ্যের ফলে সে
চাঁদা কেউ দেখিতে পায়। অমাবস্যা
নাই সে চাঁদে দ্বিদলে তার কিরণ উদয় ৼ"
- অনেক ভাগ্যের ফলে: অত্যন্ত
সৌভাগ্য বা দুর্লভ সাধনার ফলস্বরূপ।
- সে চাঁদা: সেই
চাঁদ। এখানে 'চাঁদ' রূপক অর্থে পরমাত্মা, দিব্য জ্ঞান, বা পরম সত্তার জ্যোতিকে বোঝানো হয়েছে, যা
মানব দেহের অভ্যন্তরে বিদ্যমান।
- কেউ দেখিতে পায়: খুব
কম মানুষই তাকে দেখতে বা উপলব্ধি করতে পারে।
- অমাবস্যা নাই সে চাঁদে: সেই চাঁদ বা জ্যোতির কোনো ক্ষয় বা অন্ধকার নেই। অমাবস্যা চাঁদের
অন্ধকার দিক নির্দেশ করে, কিন্তু
এই আধ্যাত্মিক জ্যোতির কোনো অন্ধকারাচ্ছন্নতা বা অনুপস্থিতি নেই; এটি চির উজ্জ্বল।
- দ্বিদলে তার কিরণ উদয়: 'দ্বিদল' বলতে যোগশাস্ত্রের আজ্ঞা
চক্রকে (ভ্রূ যুগলের মাঝখানে
অবস্থিত) বোঝানো হতে পারে, যা
দুটি পাপড়িযুক্ত পদ্মের মতো কল্পনা করা হয়। এই চক্রে ধ্যান করলে সেই দিব্য
জ্যোতির প্রকাশ বা কিরণ উদয় হয়। এটি কপালে বা মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে অবস্থিত
আত্মিক আলোকবিন্দুর প্রতীক।
দ্বিতীয় স্তবক:
"যথারে সেই চন্দ্র ভূবন দিবারাতের
নাই আলাপন কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ বিজলী চটকের ন্যায় ৼ"
- যথারে সেই চন্দ্র ভূবন: যেখানে সেই চাঁদের (জ্যোতির) জগৎ বা অবস্থান।
- দিবারাতের নাই আলাপন: সেখানে
দিন বা রাতের কোনো পার্থক্য বা প্রভাব নেই। এটি কালহীন, ত্রিকালের ঊর্ধ্বে এক অবস্থা, যেখানে
জাগতিক সময়-ধারণা অর্থহীন।
- কোটি চন্দ্র জিনি কিরণ: সেই জ্যোতির ঔজ্জ্বল্য কোটি কোটি চাঁদের কিরণকেও ছাড়িয়ে যায়। এটি
তার অপরিমেয় উজ্জ্বলতা ও মহিমাকে বোঝায়।
- বিজলী চটকের ন্যায়: বিদ্যুতের
চমকের মতো। অর্থাৎ, সেই জ্যোতি অত্যন্ত
ক্ষণস্থায়ী বা পলকের জন্য ঝলক দিয়ে ওঠে এবং তাকে ধরা বা স্থিরভাবে দেখা
অত্যন্ত কঠিন। এটি তার দিব্য ও অতীন্দ্রিয় প্রকৃতিকে বোঝায়।
তৃতীয় স্তবক:
"সিন্দু মাঝে বিন্ধুবারি মাঝখানে
তার স্বর্ণগিরি অধরচাঁদের স্বর্গপুরী তিল পরিমাণ জাগায় ৼ"
- সিন্দু মাঝে বিন্ধুবারি: 'সিন্দু' মানে সমুদ্র, আর 'বিন্ধুবারি' মানে এক বিন্দু জল। এটি 'সিন্দু বিন্দু' বা 'ক্ষুদ্রের মধ্যে বৃহৎ' – এই ধারণার একটি রূপক।
অর্থাৎ, বিশাল সৃষ্টি বা দেহের
মধ্যেই এক অতি ক্ষুদ্র বিন্দুতে সেই রহস্যময় জ্যোতি লুকিয়ে আছে।
- মাঝখানে তার স্বর্ণগিরি: সেই ক্ষুদ্র বিন্দুর (বা শরীরের) মাঝখানে এক স্বর্ণময় পর্বত। 'স্বর্ণগিরি' বা সুমেরু পর্বত
যোগশাস্ত্রে মেরুদণ্ডের সর্বোচ্চ বা গুরুত্বপূর্ণ স্থানকে বোঝায়, যেখানে কুণ্ডলিনী শক্তি জাগরিত হয়। এটি দেহের মধ্যে লুকায়িত
আধ্যাত্মিক উচ্চতার প্রতীক।
- অধরচাঁদের স্বর্গপুরী: 'অধরচাঁদ' মানে সেই ধারণাতীত বা অস্পষ্ট চাঁদ (জ্যোতি)। 'স্বর্গপুরী' হলো সেই জ্যোতির বাসস্থান, যা দিব্য আনন্দ ও শান্তির স্থান।
- তিল পরিমাণ জাগায়: এটি
একটি অতি ক্ষুদ্র স্থান, যা
তিলের মতো ছোট। 'জাগায়' মানে জেগে থাকে বা বিদ্যমান থাকে। অর্থাৎ, দেহের অতি ক্ষুদ্র এক স্থানে সেই দিব্য স্বর্গীয় জ্যোতি অবস্থান করছে।
চতুর্থ স্তবক:
"দরশনে দুঃখ হরে পরশনে
পরশ করে এমনি সে চাঁদের মহিমে লালন ডুবে ডোবে না তায় ৼ"
- দরশনে দুঃখ হরে: সেই
দিব্য জ্যোতির দর্শন পেলে সকল দুঃখ দূর হয়ে যায়। এটি আত্মিক শান্তির
অনুভূতিকে বোঝায়।
- পরশনে পরশ করে: তাকে
স্পর্শ করলে (রূপক অর্থে উপলব্ধি করলে) অলৌকিক বা দিব্য স্পর্শ লাভ হয়। 'পরশ করা' বলতে তার প্রভাব বা গুণ
দ্বারা প্রভাবিত হওয়া বোঝায়, যেমন
পরশপাথর লোহাকে সোনা করে।
- এমনি সে চাঁদের মহিমে: সেই
চাঁদের (জ্যোতির) এমনই মহিমা বা ক্ষমতা।
- লালন ডুবে ডোবে না তায়: লালন বলেন, আমি সেই জ্যোতির সাগরে ডুব
দেই (অর্থাৎ সাধনায় নিমগ্ন হই), কিন্তু
তাতে ডুবে যাই না বা হারিয়ে যাই না। এটি বোঝায় যে, এই গভীর আধ্যাত্মিক অভিজ্ঞতা লাভ করলেও সাধক তাতে বিলীন হন না, বরং এক নতুন উপলব্ধির জগতে প্রবেশ করেন। এটি তাঁর আত্মিক যাত্রায়
টিকে থাকার সক্ষমতাকেও বোঝাতে পারে।
এই
গানটি লালনের ভেতরের জগতের অনুসন্ধান এবং মানব দেহের মধ্যেই পরম সত্যকে উপলব্ধির
গভীর দর্শনকে ফুটিয়ে তোলে।