অমাবস্যার দিনে চন্দ্র থাকে না যায় কোন শহরে
(১৫)
অমাবস্যার দিনে
চন্দ্র থাকে না
যায় কোন শহরে।
প্রতিপদে হয়
সে উদয়
দৃষ্টি হয় না
কেন তারে ৼ
মাসে মাসে চাঁদের
উদয়
অমাবস্যা মাস
অন্তে হয়
সূ্র্যের অমাবস্যা
নির্ণয়
জানতে হবে নিহাজ
করে ৼ
ষোলকলা হইলে
শশী
তবে তো হয় পূর্ণমাসী
পনেরই পূর্ণিমা
কিসি
পণ্ডিতেরা কয়
সংসারে ৼ
জানতে পারে
দেহ চন্দ্রর
স্বর্ণচাঁদের
পায় সে খবর
সিরাজ সাঁই
কয় লালন তোর
মূল হারালি
কোলের ঘোরে ৼ
প্রথম স্তবক:
"অমাবস্যার
দিনে চন্দ্র থাকে না যায় কোন শহরে। প্রতিপদে
হয় সে উদয়
দৃষ্টি হয় না কেন তারে ৼ"
- অমাবস্যার দিনে চন্দ্র থাকে না: জাগতিক
দৃষ্টিতে অমাবস্যার দিনে চাঁদ দেখা যায় না, মনে হয় যেন চাঁদ
অনুপস্থিত।
- যায় কোন শহরে: (চাঁদ তাহলে) কোন অদৃশ্য স্থানে বা 'শহরে' চলে
যায়? এই প্রশ্নটি রূপক অর্থে পরমাত্মার
লুক্কায়িত অবস্থানকে ইঙ্গিত করে, যা
সাধারণ দৃষ্টিতে ধরা পড়ে না।
- প্রতিপদে হয় সে উদয়: অমাবস্যার পরের দিন
প্রতিপদে (শুক্লপক্ষের প্রথম তিথিতে) চাঁদ আবার উদয় হয় বা তার প্রথম কলাটি
দেখা যায়।
- দৃষ্টি হয় না কেন তারে: (কিন্তু) তখনো তাকে কেন
ভালোভাবে দেখা যায় না? এটি বোঝায় যে, পরমাত্মার
অস্তিত্ব থাকলেও,
শুরুর দিকে বা অপ্রস্তুত মনে তাকে উপলব্ধি করা কঠিন।
দ্বিতীয় স্তবক:
"মাসে
মাসে চাঁদের উদয় অমাবস্যা মাস অন্তে হয় সূ্র্যের
অমাবস্যা নির্ণয় জানতে হবে নিহাজ করে ৼ"
- মাসে মাসে চাঁদের উদয়: প্রতি মাসেই নতুন
করে চাঁদের (কলার) উদয় হয়।
- অমাবস্যা মাস অন্তে হয়: অমাবস্যা মাস শেষে
(বা পূর্ণ চন্দ্রের বিলুপ্তির পর) আসে।
- সূ্র্যের অমাবস্যা নির্ণয়: সূর্যের অমাবস্যা
(অর্থাৎ সূর্যগ্রহণ বা সূর্যের সাময়িক ঢাকা পড়ে যাওয়া) কীভাবে নির্ণয় করা
হয়, তা জানতে হবে। এটি একটি বৈজ্ঞানিক ধারণার ইঙ্গিত দিয়ে বোঝানো হয়েছে
যে, জাগতিক নিয়মের বাইরেও এক গভীরতর সত্য আছে।
- জানতে হবে নিহাজ করে: তা (গভীরভাবে) নিহাজ করে বা
বিচার করে জানতে হবে। 'নিহাজ' মানে বিশেষভাবে দেখা, বিচার
করা বা বিবেচনা করা। এখানে বোঝানো হয়েছে যে, পরমাত্মার রহস্য
উপলব্ধি করতে হলে সূক্ষ্ম বিচারবুদ্ধি ও বিশ্লেষণ প্রয়োজন।
তৃতীয় স্তবক:
"ষোলকলা
হইলে শশী
তবে তো হয় পূর্ণমাসী পনেরই
পূর্ণিমা কিসি
পণ্ডিতেরা কয় সংসারে ৼ"
- ষোলকলা হইলে শশী: যখন শশী (চাঁদ) তার ষোলকলা
(পূর্ণতা) প্রাপ্ত হয়।
- তবে তো হয় পূর্ণমাসী: তখনই তাকে পূর্ণিমা
(পূর্ণচন্দ্র) বলা হয়। এটি আধ্যাত্মিক পূর্ণতা বা আত্মোপলব্ধির চরম অবস্থাকে
নির্দেশ করে।
- পনেরই পূর্ণিমা কিসি: 'পনেরই পূর্ণিমা কিসি' বলতে
১৫টি তিথি বা কলা দ্বারা গঠিত যে পূর্ণিমা, তা কোন প্রকারের? (অর্থাৎ,
প্রকৃত পূর্ণিমা কোনটি? ষোল
কলা নাকি ১৫ কলায়?)
- পণ্ডিতেরা কয় সংসারে: পণ্ডিতেরা (জাগতিক বা
শাস্ত্রী পণ্ডিতেরা) সংসারে তা নিয়ে নানা কথা বলেন বা ব্যাখ্যা দেন। এটি
বোঝায় যে, সাধারণ পণ্ডিতি জ্ঞানে পরমাত্মার প্রকৃত রূপ বোঝা যায় না।
চতুর্থ স্তবক:
"জানতে
পারে দেহ চন্দ্রর স্বর্ণচাঁদের পায় সে খবর সিরাজ
সাঁই কয় লালন তোর মূল হারালি কোলের ঘোরে ৼ"
- জানতে পারে দেহ চন্দ্রর: (সেই পরমাত্মা বা আধ্যাত্মিক
চন্দ্রকে) মানবদেহেই জানা যায় বা উপলব্ধি করা যায়। এটি দেহ-তত্ত্বের উপর
লালনের জোর।
- স্বর্ণচাঁদের পায় সে খবর: (যারা দেহকে জানতে পারে), তারাই
সেই স্বর্ণময় চাঁদের (পরমাত্মার দিব্যজ্যোতির) খবর পায় বা তাকে উপলব্ধি
করতে পারে।
- সিরাজ সাঁই কয় লালন তোর: লালনের গুরু সিরাজ
সাঁই বলেন,
"হে লালন, তোমার..."
- মূল হারালি কোলের ঘোরে: তুমি তোমার আসল 'মূল' (নিজস্ব সত্তা,
জীবনের উদ্দেশ্য বা আধ্যাত্মিক সম্পদ) হারিয়ে
ফেলেছ 'কোলের ঘোরে'
(সংসারের মোহ, জাগতিক আসক্তি বা তুচ্ছ
বিষয়ে ডুবে থেকে)। গুরু এখানে লালনকে জাগিয়ে তুলছেন এবং তার পার্থিব মোহ
থেকে মুক্তির পথ দেখাচ্ছেন।
এই
গানটি লালনের সেই মৌলিক বিশ্বাসকে তুলে ধরে যে, পরমাত্মা বা ঈশ্বর বাইরে কোথাও
নেই, তিনি মানবদেহের মধ্যেই সুপ্ত অবস্থায় বিরাজমান। সেই অভ্যন্তরীণ
"চন্দ্র" কে উপলব্ধি করার জন্য সাধন ও আত্ম-বিশ্লেষণ জরুরি, যা
বাহ্যিক জ্ঞান বা পণ্ডিতির দ্বারা সম্ভব নয়।