আঠারো মোকামের খবর জেনে নেও হিসাব করে
(৪৯)
আঠারো মোকামের
খবর,
জেনে নেও হিসাব
করে।
আউল মোকাম রাগের
তালা,
পাকপাঞ্জাতন
সেই ঘরে ৼ
হীরা নাই কষ্ঠি
কান্তি,
সেখানে মনুরা
শান্তি
ঘুচলনা তোর
মনের ভ্রান্তি,
বেড়াচ্ছ ঘুরে
ৼ
সে মোকামের
কালা যারা,
চার মোকামে
বয় চার ধারা
খাড়া আছে ফেরেস্তারা,
খুঁজে দেখ অন্তঃপুরে
ৼ
তার উপরে আর
আছে মা,
জান না মন তার
মহিমা
যেজন তার পায়
গো সীমা,
সাধনের জোরে
ৼ
সেই মোকামে
যে হয় চালকা,
শিরে ছের ছিলকা
গলেতে তজবি
খেরকা,
অনাসে যায় ত্বরে
ৼ
আরশকুরছি লহুকলম,
তার উপরে আল্লার
আসন
তার উপরে ঘুরছে
কলম,
কবলতি ধরে ৼ
তার উপরে আলেক
ধনী,
খবর হচ্ছে দিন
রজনী
নূর নবীর মোকাম
সদর,
সিরাজ সাঁই
কয় লালনেরে ৼ
প্রথম স্তবক: আঠারো মোকাম ও পাক
পাঞ্জাতন
"আঠারো মোকামের খবর, জেনে নেও হিসাব করে। আউল মোকাম রাগের তালা, পাকপাঞ্জাতন
সেই ঘরে ৼ"
- আঠারো মোকামের খবর: তুমি
(হে সাধক) আঠারো মোকামের (মানবদেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত ১৮টি নির্দিষ্ট আধ্যাত্মিক স্থান বা স্তর, যা বাউল ও সুফি সাধনায় ব্যবহৃত হয়) খবর বা রহস্য।
- জেনে নেও হিসাব করে: (সঠিকভাবে)
জেনে নাও এবং হিসেব করে (বিচার-বিশ্লেষণ করে) বুঝে নাও।
- আউল মোকাম রাগের তালা: এই
আঠারো মোকামের মধ্যে আউল
মোকাম (প্রথম বা প্রধান মোকাম) হলো 'রাগের তালা'। এখানে
'রাগ' বলতে
গভীর প্রেম, অনুরাগ বা ভক্তিকে বোঝানো
হয়েছে, যা এই মোকামের প্রবেশপথের
চাবি।
- পাকপাঞ্জাতন সেই ঘরে: সেই
(আউল) ঘরে পাকপাঞ্জাতন (ইসলামের সম্মানিত পাঁচজন পবিত্র ব্যক্তি – হজরত মুহাম্মদ, হজরত
ফাতিমা, হজরত আলী, হজরত হাসান ও হজরত হোসাইন; এখানে
রূপক অর্থে পঞ্চতত্ত্ব বা পঞ্চপ্রাণকে বোঝাতে পারে) বিরাজমান।
দ্বিতীয় স্তবক: মনের ভ্রান্তি ও
শান্তি
"হীরা নাই কষ্ঠি কান্তি, সেখানে মনুরা শান্তি ঘুচলনা তোর মনের ভ্রান্তি, বেড়াচ্ছ
ঘুরে ৼ"
- হীরা নাই কষ্ঠি কান্তি: সেখানে (সেই মোকামে) কোনো হীরা বা কষ্টিপাথর নেই (যা খাঁটি সোনা চিনতে ব্যবহৃত হয়), আর নেই কোনো জাগতিক কান্তি (আলোক বা সৌন্দর্য)।
- সেখানে মনুরা শান্তি: সেখানে
(জাগতিক বিষয়াদি না থাকায়) মনুরা (মন) শান্তি লাভ করে।
- ঘুচলনা তোর মনের ভ্রান্তি: (কিন্তু
হে মন) তোমার মনের
ভ্রান্তি (ভুল ধারণা বা ভ্রম) এখনো
দূর হলো না।
- বেড়াচ্ছ ঘুরে: (তাই
তুমি) উদ্দেশ্যহীনভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছ (সত্যের সন্ধান না পেয়ে)।
তৃতীয় স্তবক: কালা ও
ফেরেস্তাদের অবস্থান
"সে মোকামের কালা যারা, চার মোকামে বয় চার ধারা খাড়া আছে ফেরেস্তারা, খুঁজে
দেখ অন্তঃপুরে ৼ"
- সে মোকামের কালা যারা: সেই
মোকামের (বিশেষত আউল মোকামের) যে কালা (অন্ধকার বা রহস্যময় দিক)।
- চার মোকামে বয় চার ধারা: (তার
প্রভাবস্বরূপ) দেহের চারটি
মোকামে (চারটি প্রধান বিন্দু বা
চক্র) চারটি ধারা (চারটি শক্তি বা প্রবাহ) প্রবাহিত হয়।
- খাড়া আছে ফেরেস্তারা: সেখানে
(সেই মোকামের প্রহরায়) ফেরেস্তারা (ফেরেশতা বা ঐশ্বরিক রক্ষকগণ) দাঁড়িয়ে আছেন।
- খুঁজে দেখ অন্তঃপুরে: তুমি
তোমার অন্তঃপুরে (নিজের অন্তরের গভীরে) তাদের খুঁজে দেখো।
চতুর্থ স্তবক: পরম মহিমা ও সাধন
শক্তি
"তার উপরে আর আছে মা, জান না মন তার মহিমা যেজন তার পায় গো সীমা, সাধনের
জোরে ৼ"
- তার উপরে আর আছে মা: সেই
মোকামগুলোর (আঠারো মোকামের) উপরে আরও একটি 'মা' (মাতৃরূপী শক্তি বা পরম
ব্রহ্মের নারী শক্তি) আছে।
- জান না মন তার মহিমা: হে
মন, তুমি তার (সেই পরম মাতৃশক্তির) মহিমা (গৌরব
বা ক্ষমতা) জানো না।
- যেজন তার পায় গো সীমা: যে ব্যক্তি তার (সেই শক্তির) সীমা (উপলব্ধির চূড়ান্ত পর্যায়) পায়।
- সাধনের জোরে: সে
তা লাভ করে সাধনের
জোরে (নিজের তপস্যা ও আধ্যাত্মিক
শক্তির মাধ্যমে)।
পঞ্চম স্তবক: চালকা ও বাহ্যিক
বেশভূষা
"সেই মোকামে যে হয় চালকা, শিরে ছের ছিলকা গলেতে তজবি খেরকা, অনাসে
যায় ত্বরে ৼ"
- সেই মোকামে যে হয় চালকা: সেই মোকামে (আঠারো মোকামের ভেতরে) যে ব্যক্তি 'চালকা' (চালক, পথপ্রদর্শক বা সাধন পথের সিদ্ধ পুরুষ) হয়।
- শিরে ছের ছিলকা: তার
মাথায় 'ছের ছিলকা' (মাথা মোড়ানো পট্টি বা আচ্ছাদন, যা
ফকিরদের বেশভূষা)।
- গলেতে তজবি খেরকা: তার
গলায় তজবি (জপমালা) এবং খেরকা (ফকিরদের পরিধেয় বস্ত্র) থাকে। এটি বাহ্যিক ফকিরি বেশভূষার বর্ণনা, যা আধ্যাত্মিক উন্নতির প্রতীক।
- অনাসে যায় ত্বরে: সে
সহজেই (অনাসে) দ্রুত (ত্বরে) (লক্ষ্যের দিকে) এগিয়ে যায় বা পরমার্থ লাভ করে।
ষষ্ঠ স্তবক: আরশ কুরসি ও আল্লার
আসন
"আরশকুরছি লহুকলম, তার উপরে আল্লার আসন তার উপরে ঘুরছে কলম, কবলতি
ধরে ৼ"
- আরশকুরছি লহুকলম: আরশ (ঈশ্বরের সিংহাসন), কুরছি (পা রাখার স্থান বা নিম্ন সিংহাসন) এবং লহুকলম (লাওহে মাহফুজ ও কলম -
ভাগ্যলিপি লেখার কলম, যা ইসলামী সৃষ্টিতত্ত্বের
অংশ)। এই সবগুলিই সৃষ্টিতত্ত্বের উচ্চতর ধাপ।
- তার উপরে আল্লার আসন: (এসবের)
উপরেই আল্লার আসন (ঈশ্বরের অবস্থান)।
- তার উপরে ঘুরছে কলম: সেই
আসনের উপরেই কলম (ঐশ্বরিক কলম) ঘুরছে।
- কবলতি ধরে: কবলতি (কবুল করার শক্তি বা কার্যকারিতা) ধারণ করে। এটি আল্লাহর
সর্বশক্তিমানতা এবং সৃষ্টির সমস্ত কিছু নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত।
সপ্তম স্তবক: আলেক ধনী ও নূর
নবীর মোকাম
"তার উপরে আলেক ধনী, খবর হচ্ছে দিন রজনী নূর নবীর মোকাম সদর, সিরাজ
সাঁই কয় লালনেরে ৼ"
- তার উপরে আলেক ধনী: (এসবের)
উপরে আলেক ধনী (অলক্ষিত, অদৃশ্য পরম সত্তা, যিনি সকল ঐশ্বর্যের অধিকারী)।
- খবর হচ্ছে দিন রজনী: সেখান
থেকেই খবর (বার্তা বা নির্দেশ) আসে দিন-রাত (অর্থাৎ সদা সর্বদা)।
- নূর নবীর মোকাম সদর: সেটিই
হলো নূর নবীর (আলোকিত নবী বা আদি নবী, হযরত
মুহাম্মদের জ্যোতির্ময় সত্তা) মোকাম সদর (প্রধান স্থান বা উৎসস্থল)।
- সিরাজ সাঁই কয় লালনেরে: লালনের গুরু সিরাজ
সাঁই এই কথাগুলি লালনকে বলছেন।
মূল বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির মানবদেহকে এক সূক্ষ্ম ব্রহ্মাণ্ড হিসেবে তুলে ধরেছেন, যেখানে আঠারো মোকামের মতো বিভিন্ন
আধ্যাত্মিক স্তর বিদ্যমান। তিনি
বলেছেন যে, প্রকৃত আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভ
করতে হলে প্রেম ও ভক্তির (রাগ) মাধ্যমে এই মোকামগুলো ভেদ করে নিজের ভেতরের রহস্যময়
শক্তি ও সত্তাকে চিনতে হবে। এই সাধনার পথেই আল্লাহর আসন, আদি নবী এবং সকল ঐশ্বরিক জ্ঞান উপলব্ধি করা সম্ভব। এটি সুফি ও বাউল দর্শনের
একটি উচ্চাঙ্গের তত্ত্বমূলক গান।