cover

cover

আঠারো মোকামে একটি রূপের বাতি জ্বলছে সদায়

 


(৫০)

আঠারো মোকামে একটি রূপের বাতি

জ্বলছে সদায়।

নাহি তেল তার নাহি তুলা

আজগুবী হয়েছে উদয়

 

মোকামের মধ্যে মোকাম

স্বর্ণশিখর বলি যার নাম

বাতির লণ্ঠন সেথায় সদায়

ত্রিভূবনে কিরণ ধায়

 

দিবানিশি আট প্রহরে

একরূপে চাররূপ ধরে

বর্ত থাকলে দেখলি না রে

ঘুরে মলি বেদের বিধায়


প্রথম স্তবক: অলৌকিক বাতি

"আঠারো মোকামে একটি রূপের বাতি জ্বলছে সদায়। নাহি তেল তার নাহি তুলা আজগুবী হয়েছে উদয় ৼ"

  • আঠারো মোকামে: আঠারো মোকাম বলতে মানবদেহের অভ্যন্তরে অবস্থিত ১৮টি বিশেষ আধ্যাত্মিক স্থান বা কেন্দ্রকে বোঝায়, যা বাউল ও সুফি সাধনায় ব্যবহৃত হয়। এই মোকামগুলোর মধ্যে
  • একটি রূপের বাতি: একটি রূপের বাতি (পরম সত্তার আলোকময় রূপ, জ্ঞান বা আত্মিক জ্যোতি) জ্বলছে
  • জ্বলছে সদায়: এই বাতি সব সময় (সদায়) জ্বলছে
  • নাহি তেল তার নাহি তুলা: এই বাতির জন্য কোনো তেল বা তুলা (সাধারণ বাতির প্রয়োজনীয় উপাদান) লাগে না
  • আজগুবী হয়েছে উদয়: এটি এক আজগুবি (অদ্ভুত, অলৌকিক) উপায়ে উদয় (প্রকাশ) হয়েছে। অর্থাৎ, এই আত্মিক আলো জাগতিক নিয়ম দ্বারা চালিত নয়

দ্বিতীয় স্তবক: স্বর্ণশিখর ও বিশ্বব্যাপী কিরণ

"মোকামের মধ্যে মোকাম স্বর্ণশিখর বলি যার নাম বাতির লণ্ঠন সেথায় সদায় ত্রিভূবনে কিরণ ধায় ৼ"

  • মোকামের মধ্যে মোকাম: (আঠারো মোকামের মধ্যে) একটি বিশেষ মোকাম (স্থান) রয়েছে, যা অন্যান্য মোকামের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ
  • স্বর্ণশিখর বলি যার নাম: সেই মোকামের নাম স্বর্ণশিখর (সোনালী চূড়া), যা শ্রেষ্ঠত্ব ও দিব্যতার প্রতীক। এটি হয়তো সহস্রার চক্র বা ব্রহ্মরন্ধ্রের মতো উচ্চতর আধ্যাত্মিক কেন্দ্রকে নির্দেশ করে
  • বাতির লণ্ঠন সেথায় সদায়: সেই স্বর্ণশিখরেই সেই (আলোকময়) বাতির প্রকৃত লণ্ঠন (আধার) সর্বদা অবস্থিত
  • ত্রিভূবনে কিরণ ধায়: সেই লণ্ঠন থেকে নির্গত আলো ত্রিভূবনে (স্বর্গ, মর্ত্য, পাতাল অর্থাৎ সমগ্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে) ছড়িয়ে পড়ে। এটি পরমাত্মার সর্বব্যাপিতা ও সৃষ্টির সর্বত্র তাঁর জ্যোতি প্রকাশের ইঙ্গিত

তৃতীয় স্তবক: অজ্ঞতা ও ব্যর্থতা

"দিবানিশি আট প্রহরে একরূপে চাররূপ ধরে বর্ত থাকলে দেখলি না রে ঘুরে মলি বেদের বিধায় ৼ"

  • দিবানিশি আট প্রহরে: দিনরাত আট প্রহর (অর্থাৎ সর্বদা)
  • একরূপে চাররূপ ধরে: (সেই পরম সত্তা) এক রূপেই (নিরাকার বা একত্বে) থেকেও চারটি রূপে (পুরুষ, প্রকৃতি, বা সৃষ্টি ও স্থিতির চার অবস্থা) প্রকাশিত হন। এটি সাকার-নিরাকার উভয় রূপের ধারণাকে বোঝাতে পারে
  • বর্ত থাকলে দেখলি না রে: হে মন, (অথচ) তোমার বর্ত (বর্তমান অস্তিত্ব বা সুযোগ) থাকা সত্ত্বেও তুমি তাকে (সেই অলৌকিক বাতি বা পরম সত্তাকে) দেখতে পেলে না
  • ঘুরে মলি বেদের বিধায়: (কারণ তুমি) বেদের (শাস্ত্রীয় জ্ঞানের) বিধান বা জাগতিক নিয়মের ফাঁদে পড়ে ঘুরে মরেছ (সময় নষ্ট করেছ)। এটি বোঝায় যে, শুধু পুঁথিগত জ্ঞান বা বাহ্যিক নিয়মে আবদ্ধ থাকলে আত্মিক উপলব্ধি হয় না, বরং ভেতরের সত্যকে অবহেলা করা হয়

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির বলেছেন যে, মানবদেহের মধ্যেই এক অলৌকিক ও চিরন্তন 'রূপের বাতি' জ্বলছে, যা কোনো জাগতিক উপাদানে চলে না। এই বাতির উৎস হলো 'স্বর্ণশিখর' নামক এক উচ্চতর মোকাম, যেখান থেকে এর আলো সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। তিনি আক্ষেপ করেছেন যে, মানুষ তার নিজের ভেতরের এই পরম সত্যকে চিনতে পারে না, কারণ সে বাহ্যিক জ্ঞান ও জাগতিক নিয়মের গোলকধাঁধায় আটকা পড়ে সময় নষ্ট করে


Powered by Blogger.