আপন আপন খবর নাই
(৬৩)
আপন আপন খবর
নাই।
গগনের চাঁদ
ধরব বলে
মনে করি তাই
ৼ
যে গঠেছে এ
প্রেমতরী
সেই হয়েছে চরণদাঁড়ি
কোলের ঘোরে
চিনতে নারি
মিছে গোল বাধাই
ৼ
আঠারো মোকামে
জানা
মহারসের বারামখানা
সে রসের ভিতরে
সেনা
আলো করে সাঁই
ৼ
না জেনে চাঁদ
ধরার বিধি
কথার কৈট্ সাধন
সাধি
লালন বলে বাদি
ভেদি
বিবাদী সদায়
ৼ
প্রথম
স্তবক: আত্মজ্ঞানের অভাব ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা
"আপন আপন খবর নাই। গগনের চাঁদ ধরব বলে মনে করি তাইৼ"
- আপন আপন খবর: (আমার) নিজের খবর (নিজের
প্রকৃত স্বরূপ বা আত্মজ্ঞান)।
- নাই: নেই।
- গগনের চাঁদ: (অথচ আমি) গগনের চাঁদ (আকাশের
চাঁদ, অর্থাৎ পরমাত্মা বা পরম
সত্তা যা নাগালের বাইরে)।
- ধরব বলে: ধরব
বা লাভ করব বলে।
- মনে করি তাই: তাই
মনে করি বা আকাঙ্ক্ষা করি। মূলভাব: লালন আক্ষেপ করছেন যে, নিজের সম্পর্কেই যখন জ্ঞান নেই, তখন
কীভাবে পরম সত্তাকে (আকাশের চাঁদ) ধরার আকাঙ্ক্ষা করি? এটি আত্মজ্ঞানের অপরিহার্যতাকে বোঝায়।
দ্বিতীয়
স্তবক: প্রেম-তরী ও মনের ভ্রম
"যে গঠেছে এ প্রেমতরী সেই হয়েছে চরণদাঁড়ি কোলের ঘোরে চিনতে নারি মিছে গোল বাধাইৼ"
- যে গঠেছে এ প্রেমতরী: যিনি
এই প্রেম-তরী (প্রেমের নৌকা, অর্থাৎ মানবদেহ যা প্রেমের
মাধ্যমে পরম সত্তার দিকে ধাবিত হয়) গঠন করেছেন বা সৃষ্টি করেছেন।
- সেই হয়েছে চরণদাঁড়ি: তিনিই
(স্রষ্টা) চরণদাঁড়ি (নৌকার দাঁড় বা চালক) হয়েছেন। অর্থাৎ, পরম সত্তা নিজেই এই দেহরূপী নৌকার চালক।
- কোলের ঘোরে: (কিন্তু) কোলের ঘোরে (অজ্ঞানতার
ভ্রম, মায়া বা বিভ্রান্তি) থাকার
কারণে।
- চিনতে নারি: আমরা
চিনতে পারি না।
- মিছে গোল বাধাই: (তাই)
আমরা মিথ্যা গোল (জটিলতা বা গোলমাল) বাঁধাই বা সমস্যা তৈরি করি। মূলভাব: পরমাত্মা নিজেই মানবদেহকে প্রেমের মাধ্যমে পরিচালনা করছেন, কিন্তু আমরা অজ্ঞানতার কারণে তা বুঝতে না পেরে অযথা জটিলতা তৈরি করি।
তৃতীয়
স্তবক: আঠারো মোকামের রহস্য
"আঠারো মোকামে জানা মহারসের বারামখানা সে রসের ভিতরে সেনা আলো করে সাঁইৼ"
- আঠারো মোকামে: আঠারো
মোকামে (মানবদেহের অভ্যন্তরে
অবস্থিত ১৮টি বিশেষ আধ্যাত্মিক স্থান বা স্তর)।
- জানা: জানা
যায় বা বিদ্যমান।
- মহারসের বারামখানা: মহারসের (পরম আনন্দ, দিব্যপ্রেম বা অমৃতের) বারামখানা (বিশ্রামস্থল
বা উৎস)।
- সে রসের ভিতরে: সেই
রসের (মহারসের) ভেতরেই।
- সেনা: 'সেনা' (সেনানায়ক, শ্রেষ্ঠ সত্তা বা প্রধান
শক্তি), অথবা 'সে না' (অর্থাৎ তিনিই)।
- আলো করে সাঁই: সাঁই (ঈশ্বর) জ্যোতির্ময় হয়ে আলো করছেন বা অবস্থান করছেন। মূলভাব: মানবদেহের ১৮টি মোকামের মধ্যেই পরম আনন্দ ও দিব্যপ্রেমের উৎস বিদ্যমান, যেখানে পরমাত্মা নিজেই জ্যোতির্ময় হয়ে বিরাজ করেন।
চতুর্থ
স্তবক: অজানার বিপদ
"না জেনে চাঁদ ধরার বিধি কথার কৈট্ সাধন সাধি লালন বলে বাদি ভেদি বিবাদী
সদায়ৼ"
- না জেনে চাঁদ: (আমরা) চাঁদ (পরম
সত্তা বা পরম জ্ঞান) ধরার।
- ধরার বিধি: বিধি (নিয়ম বা সঠিক উপায়) না জেনে।
- কথার কৈট্ সাধন: শুধু কথার কৈট্ (কথার
মারপ্যাঁচ, যুক্তি বা পাণ্ডিত্য) দিয়ে সাধন (অনুশীলন)
সাধি বা করি।
- লালন বলে বাদি: লালন
ফকির বলেন, (এতে) বাদি (যুক্তিদাতা, আলোচক) এবং।
- ভেদি: ভেদি (ভেদাভেদকারী বা বিবাদকারী)।
- বিবাদী সদায়: (তারা) সর্বদা বিবাদী (বিবাদে
লিপ্ত) থাকে। মূলভাব: প্রকৃত পথ না জেনে কেবল মৌখিক আলোচনা বা পাণ্ডিত্য
দিয়ে সাধনা করলে তা বিবাদ ও বিভেদই সৃষ্টি করে, প্রকৃত জ্ঞান অর্জন হয় না।
মূল
বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির আত্ম-উপলব্ধির গুরুত্বকে
সর্বোচ্চ স্থান দিয়েছেন। তিনি
বলেছেন যে, নিজের ভেতরের 'আপন খবর' না জানলে পরমাত্মাকে (গগনের
চাঁদ) লাভ করা অসম্ভব। মানবদেহই হলো 'প্রেম-তরী' এবং 'মহারসের বারামখানা' যেখানে পরমাত্মা বিরাজ করেন। কিন্তু অজ্ঞানতার কারণে মানুষ তা চিনতে পারে
না। লালন আক্ষেপ করেছেন যে, প্রকৃত সাধন পদ্ধতি না জেনে শুধু
কথার মারপ্যাঁচে লিপ্ত থাকলে তা কেবল বিভেদই সৃষ্টি করে, পরম সত্য লাভ হয় না।