আবহায়াতের নদী কোনখানে
(৬৪)
আবহায়াতের নদী
কোনখানে।
আগে যাও জিন্দা
পীরের খান্দানে
দেখিয়ে দিবে
সন্ধানে ৼ
মওলার মহিমা
এমনি
সেই নদীতে হয়
অমৃত পানি
ও তার একরতি
পরশে শুনি
অমর হবে সেই
জনে ৼ
সেই যে নদীর
পিছল ঘাটা
কত চাঁদ কোটালে
খেলছে ভাটা
দিন-দুনিয়ায়
জোড়া একটা
মীন আছে তার
মাঝখানে ৼ
আবহায়াতের মর্ম
যেজন পায়
উপাসনার সীমা
তারই হয়
সিরাজ সাঁইয়ের
আদেশ হয়
অধীন লালন তাই
ভণে ৼ
প্রথম
স্তবক: আবহায়াতের নদী ও জিন্দা পীরের ভূমিকা
"আবহায়াতের নদী কোনখানে। আগে যাও জিন্দা পীরের খান্দানে দেখিয়ে
দিবে সন্ধানে ৼ"
- আবহায়াতের নদী: 'আবহায়াত' (ফারসি শব্দ, যার অর্থ জীবন-বারি বা
অমৃত) হলো সেই রহস্যময় নদী বা ঝরনা, যার
জল পান করলে অমরত্ব লাভ করা যায়। (প্রশ্ন করা হয়েছে) সেই আবহায়াতের নদী কোনখানে অবস্থিত?
- আগে যাও জিন্দা: (যদি
তা জানতে চাও) প্রথমে যাও জিন্দা (জীবিত) পীরের (গুরু বা আধ্যাত্মিক পথপ্রদর্শক) খান্দানে (বংশে, পরম্পরায় বা আশ্রয়ে)।
- দেখিয়ে দিবে সন্ধানে: তিনি
(জিন্দা পীর) তোমাকে সেই (নদীর) সন্ধান (খোঁজ বা ঠিকানা) দেখিয়ে
দেবেন। মূলভাব: আবহায়াতের অমৃত নদী কোথায় আছে, তা জানার জন্য প্রথমে একজন প্রকৃত ও জীবন্ত গুরুর (জিন্দা পীর) কাছে
যেতে হবে, কারণ তিনিই সেই রহস্যের
সন্ধান দিতে পারেন।
দ্বিতীয়
স্তবক: মওলার মহিমা ও অমৃত পানির প্রভাব
"মওলার মহিমা এমনি সেই নদীতে হয় অমৃত
পানি ও তার একরতি পরশে শুনি অমর হবে
সেই জনে ৼ"
- মওলার মহিমা: মওলার (আল্লাহ বা পরম প্রভুর) মহিমা (ক্ষমতা বা অলৌকিক গুণ) এমনই।
- সেই নদীতে হয়: সেই
(আবহায়াতের) নদীতে উৎপন্ন হয়।
- অমৃত পানি: অমৃত
পানি (জীবন-বারি)।
- ও তার একরতি: আর
তার (সেই অমৃত পানির) একরতি (এক বিন্দু বা অতি সামান্য অংশ)।
- পরশে শুনি: পরশ
(স্পর্শ) করলেই শোনা যায়।
- অমর হবে সেই জনে: সেই
ব্যক্তি অমর হবে। মূলভাব: এটি
আল্লাহরই এক অলৌকিক মহিমা যে, আবহায়াতের
নদীর এক বিন্দু অমৃত পান করলেই মানুষ অমরত্ব লাভ করে।
তৃতীয়
স্তবক: নদীর রহস্য ও মীন
"সেই যে নদীর পিছল ঘাটা কত চাঁদ কোটালে খেলছে ভাটা দিন-দুনিয়ায় জোড়া একটা মীন আছে
তার মাঝখানে ৼ"
- সেই যে নদীর: সেই
(আবহায়াতের) নদীর।
- পিছল ঘাটা: পিছল
ঘাটা (পিচ্ছিল ঘাট, যেখানে পা পিছলে যেতে পারে – অর্থাৎ সাধন পথের কঠিনতা বা বিপদ)।
- কত চাঁদ কোটালে: কত
(রূপক অর্থে) চাঁদ (নক্ষত্র, বা ঐশ্বরিক জ্যোতি)।
- খেলছে ভাটা: কোটালে (জলের ঘূর্ণি বা ঢেউ) ভাটা (জল কমে যাওয়া বা ছন্দপতন) খেলছে। এটি নদীর প্রবাহের রহস্যময়তা বা এর
গতিকে বোঝায়।
- দিন-দুনিয়ায়: এই দিন-দুনিয়ায় (পৃথিবীতে)।
- জোড়া একটা: একটি জোড়া (যুগল
বা মিলিত সত্তা)।
- মীন আছে তার: মীন (মাছ, যা প্রাণের প্রতীক) আছে তার
(সেই নদীর)
- মাঝখানে: মাঝখানে। মূলভাব: আবহায়াতের নদীর পথ অত্যন্ত পিচ্ছিল ও রহস্যময়, যেখানে অনেক অলৌকিক ঘটনা ঘটে। এই জাগতিক অস্তিত্বের মাঝেই সেই নদীর
মধ্যে এক যুগল 'মীন' (প্রাণশক্তি বা আত্মার প্রতীক) বিরাজ করে।
চতুর্থ
স্তবক: আবহায়াতের মর্ম ও সিরাজ সাঁইয়ের আদেশ
"আবহায়াতের মর্ম যেজন
পায় উপাসনার সীমা তারই হয় সিরাজ
সাঁইয়ের আদেশ হয় অধীন লালন তাই ভণে
ৼ"
- আবহায়াতের মর্ম: আবহায়াতের
মর্ম (গভীর রহস্য বা প্রকৃত অর্থ)।
- যেজন পায়: যে
ব্যক্তি লাভ করে বা উপলব্ধি করে।
- উপাসনার সীমা: তার
(সেই ব্যক্তির) উপাসনার (আরাধনার) সীমা (চূড়ান্ত পর্যায় বা পূর্ণতা) হয়।
- তারই হয়: তার
দ্বারাই সম্ভব হয়।
- সিরাজ সাঁইয়ের: (লালনের
গুরু) সিরাজ সাঁইয়ের।
- আদেশ হয়: আদেশ
হয় বা নির্দেশ হয়।
- অধীন লালন তাই: অধীন (বিনয়ী) লালন (ফকির) সেই কথা।
- ভণে: ভণনা
করেন বা গেয়েছেন। মূলভাব: যে ব্যক্তি আবহায়াতের প্রকৃত রহস্য উপলব্ধি করতে
পারে, তার উপাসনা পূর্ণতা লাভ
করে। লালন তার গুরু সিরাজ সাঁইয়ের আদেশে এই গভীর তত্ত্বটি বর্ণনা করছেন।
মূল
বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির গুরু (জিন্দা পীর) কে
আবহায়াতের নদীর সন্ধানদাতারূপে চিত্রিত
করেছেন। এই নদী থেকে প্রাপ্ত অমৃত পান করলেই অমরত্ব লাভ সম্ভব। এই নদী কেবল কোনো
ভৌগোলিক স্থানে অবস্থিত নয়, বরং এটি মানবদেহের ভেতরের
এক সূক্ষ্ম প্রাণশক্তি বা
আধ্যাত্মিক উৎসের রূপক। লালন বলছেন যে, এই দুর্গম সাধন পথের রহস্য উন্মোচন করতে পারলে এবং আবহায়াতের মর্ম উপলব্ধি
করতে পারলেই উপাসনা সার্থক হয় এবং অমরত্ব লাভ করা যায়।