আমার চরণ ছাড়া কর না হে দয়াল হরি
(৬৫)
আমার চরণ ছাড়া
কর না হে
দয়াল হরি;
আমি অধম পামর
বটে
দোহাই দেই তোমারি
ৼ
চরণের যোগ্য
মন নয়
তবু মন ওই রাঙাচরণ
চায়
দয়াল চাঁদের
দয়া হইলে
পারে যায় অপারি
ৼ
অনিত্য সুখের
সব ঠাঁই
তাই দিয়ে জীব
ভুলায়
চরণ দিতে হে
গোঁসাই
কেন কর চাতুরী
ৼ
ক্ষম অধীন দাসের
অপরাধ
শীতল চরণ দেও
হে দীননাথ
লালন বলে ঘুরাইও
না হে
করে মায়াকারি
ৼ
প্রথম
স্তবক: চরণাশ্রয় প্রার্থনা
"আমার চরণ ছাড়া কর না
হে দয়াল হরি; আমি অধম পামর বটে দোহাই দেই তোমারিৼ"
- আমার চরণ ছাড়া: আমাকে
(তোমার) চরণ (আশ্রয়) থেকে বিচ্ছিন্ন।
- কর না হে: করো
না, হে।
- দয়াল হরি: দয়াল
হরি (করুণাময় ঈশ্বর)।
- আমি অধম পামর: আমি অধম (হীন)
এবং পামর (পাপী) বটে (নিশ্চয়ই)।
- দোহাই দেই তোমারি: আমি
তোমারই দোহাই (শপথ, মিনতি) দিচ্ছি। মূলভাব: ভক্ত নিজেকে হীন ও পাপী স্বীকার করে দয়াল হরিকে আকুলভাবে অনুরোধ
করছেন যেন তিনি তাকে নিজের চরণাশ্রয় থেকে বঞ্চিত না করেন।
দ্বিতীয়
স্তবক: চরণ লাভের আকাঙ্ক্ষা ও করুণার মহিমা
"চরণের যোগ্য মন নয় তবু মন ওই রাঙাচরণ চায় দয়াল চাঁদের দয়া হইলে পারে
যায় অপারিৼ"
- চরণের যোগ্য: (তোমার) চরণের যোগ্য।
- মন নয়: আমার
মন নয়। (অর্থাৎ, আমার মন এত পবিত্র নয় যে
তোমার চরণের যোগ্য হতে পারে)।
- তবু মন ওই: তবুও
আমার মন সেই।
- রাঙাচরণ চায়: রাঙাচরণ (রক্তিম সুন্দর চরণ, এখানে
ঈশ্বরের চরণকমল) চায়।
- দয়াল চাঁদের: দয়াল
চাঁদ (দয়ালু ঈশ্বর, চাঁদের মতো সুন্দর ও স্নিগ্ধ)।
- দয়া হইলে: তাঁর
দয়া হলে।
- পারে যায় অপারি: (অসীম
সংসার সাগর) পারে
যায় (পার হওয়া যায়) অপারি (যাকে
পার হওয়া কঠিন, এই ভব-সংসার)। মূলভাব: যদিও ভক্তের মন ঈশ্বরের চরণের অযোগ্য, তবুও তার মন সেই চরণই চায়। সে জানে যে, দয়াল ঈশ্বরের করুণা হলেই এই বিশাল সংসার সাগর পাড়ি দেওয়া সম্ভব।
তৃতীয়
স্তবক: অনিত্য সুখ ও গোঁসাইয়ের চাতুরী
"অনিত্য সুখের সব ঠাঁই তাই দিয়ে জীব ভুলায় চরণ দিতে হে গোঁসাই কেন কর চাতুরীৼ"
- অনিত্য সুখের: (এই জগতের) অনিত্য (ক্ষণস্থায়ী)
সুখের।
- সব ঠাঁই: সব
স্থান (বা বিষয়)।
- তাই দিয়ে জীব: তাই
দিয়ে (সেই অনিত্য সুখের মোহ দিয়ে) জীবকে।
- ভুলায়: ভুলিয়ে
রাখেন (বিভ্রান্ত করে রাখেন)।
- চরণ দিতে হে: (কিন্তু) চরণ (আশ্রয়) দিতে, হে।
- গোঁসাই: গোঁসাই (গুরু বা ঈশ্বর)।
- কেন কর চাতুরী: কেন চাতুরী (ছলনা
বা বিলম্ব) করছো? মূলভাব: ভক্ত বলছেন, জগতের
সকল সুখই ক্ষণস্থায়ী, এবং এই অনিত্য সুখ দিয়েই
জীবকে ভুলিয়ে রাখা হয়। তাই ঈশ্বরের কাছে প্রশ্ন, নিজের চরণাশ্রয় দিতে তিনি কেন এত ছলনা বা বিলম্ব করছেন?
চতুর্থ
স্তবক: অপরাধ ক্ষমা ও মায়ামুক্তির প্রার্থনা
"ক্ষম অধীন দাসের অপরাধ শীতল চরণ দেও হে
দীননাথ লালন বলে ঘুরাইও না হে করে
মায়াকারি ৼ"
- ক্ষম অধীন দাসের: (আমার) অধীন (বিনয়ী)
দাসের।
- অপরাধ: অপরাধ
(ত্রুটি, ভুল) ক্ষমা করো।
- শীতল চরণ দেও: (তোমার) শীতল চরণ (শান্তি
ও আশ্রয় প্রদানকারী চরণ) দাও।
- হে দীননাথ: হে দীননাথ (দীন-দুঃখীর
নাথ, ঈশ্বর)।
- লালন বলে ঘুরাইও: লালন
ফকির বলেন, (আর) ঘুরিয়ে (সংসারচক্রে)
মেরো না, হে।
- না হে: না, হে।
- করে মায়াকারি: মায়া
করে (মায়াজাল বিস্তার করে)। মূলভাব: ভক্ত
নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা চেয়েছেন এবং দীননাথের শীতল চরণ প্রার্থনা করেছেন।
তিনি লালনের মাধ্যমে আকুতি জানাচ্ছেন যেন ঈশ্বর তাকে আর মায়ার জালে ফেলে
সংসারচক্রে ঘুরিয়ে না মারেন, বরং
মুক্তি দেন।
মূল
বার্তা:
এই
গানটি একজন ভক্তের ঈশ্বর (দয়াল হরি, দয়াল চাঁদ, দীননাথ) এর প্রতি সম্পূর্ণ
আত্মসমর্পণের ভাব প্রকাশ করে। ভক্ত নিজের
হীনতা ও পাপ স্বীকার করে ঈশ্বরের চরণাশ্রয় প্রার্থনা করছেন, যা তাকে সংসার সাগর পার করে দেবে। তিনি জাগতিক ক্ষণস্থায়ী সুখের প্রতি
অনীহা প্রকাশ করে ঈশ্বরের কাছে জানতে চাইছেন কেন তিনি তাকে চরণ দিতে দেরি করছেন।
পরিশেষে, ভক্ত তার সকল অপরাধের ক্ষমা চেয়ে ঈশ্বরের শীতল চরণ এবং
মায়া থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আকুতি জানাচ্ছেন।