আমার দিন কি যাবে এই হালে আমি পড়ে আছি অকূলে
(৬৬)
আমার দিন কি
যাবে এই হালে
আমি পড়ে আছি
অকূলে।
কত অধম পাপী
তাপী
অবহেলে ত্বরালে
ৼ
জগাই মাধাই
দুটি ভাই
কাদা ফেলে মারিল
গায়
তারেও তো নিলে।
আমি তোমার কেউ
নই দয়াল
তাই কি মনে
ভাবিলে ৼ
অহল্যা পাষানী
ছিল
সেও তো মানব
হলো
প্রভুর চরণ
ধুলে।
আমি পাপী ডাকছি
সদায়
দয়া হবে কোন
কালে ৼ
তোমার নাম লয়ে
যদি মরি
দোহায় দিই তবু
তোমারি
আর আমি যাব
কোন কূলে।
তুমি বৈ আর
কেউ নাই আমার
মূঢ় লালন কেঁদে
বলে ৼ
প্রথম স্তবক: অসহায়ত্ব ও আক্ষেপ
"আমার
দিন কি যাবে এই হালে আমি পড়ে আছি অকূলে। কত অধম পাপী তাপী অবহেলে ত্বরালেৼ"
- আমার
দিন কি যাবে এই হালে: আমার
জীবন কি এভাবেই এই
হালে (এই
অবস্থায়, দুঃখ-কষ্টে) কেটে যাবে?
- আমি
পড়ে আছি অকূলে: আমি অকূলে (কূলকিনারাহীন
মহাসমুদ্রে, অর্থাৎ সংসার সাগরে) পড়ে
আছি।
- কত
অধম পাপী তাপী: কত অধম (হীন), পাপী (পাপকারী) এবং তাপী (কষ্টে
জর্জরিত ব্যক্তি)।
- অবহেলে
ত্বরালে: (তুমি) অবহেলা না করে তাদের ত্বরালে (তাড়াতাড়ি
উদ্ধার করলে বা মুক্তি দিলে)। মূলভাব: ভক্ত আক্ষেপ করছেন যে, তিনি সংসার সাগরে ডুবে আছেন, অথচ
ঈশ্বর কত হীন ও পাপীকে অবলীলায় উদ্ধার করেছেন। তাঁর জীবনে কি এই করুণার দিন
আসবে না?
দ্বিতীয় স্তবক: জগাই-মাধাই ও
ভক্তের আত্মনিবেদন
"জগাই
মাধাই দুটি ভাই কাদা ফেলে মারিল গায় তারেও তো নিলে। আমি তোমার কেউ নই
দয়াল তাই কি মনে ভাবিলে ৼ"
- জগাই
মাধাই দুটি ভাই: জগাই-মাধাই নামে দুই ভাই (যারা চৈতন্য মহাপ্রভুর সময়ে অত্যন্ত
পাপী ছিল)।
- কাদা
ফেলে মারিল গায়: (তারা চৈতন্য মহাপ্রভুকে) কাদা ফেলে মেরেছিল।
- তারেও
তো নিলে: (তবুও) তুমি তাদেরও তো
(তোমার চরণে) নিলে (উদ্ধার করলে)।
- আমি
তোমার কেউ নই দয়াল: আমি
কি তোমার কেউ নই, হে দয়াল (দয়ালু ঈশ্বর)?
- তাই
কি মনে ভাবিলে: তুমি
কি মনে এই কথা ভেবেছ? মূলভাব: ভক্ত জগাই-মাধাইয়ের মতো মহাপাপীর উদ্ধারের উদাহরণ
দিয়ে ঈশ্বরের কাছে জিজ্ঞাসা করছেন, তিনি
কি তাঁর কোনো আপনজন নন, যে
কারণে তাঁর প্রতি করুণা করা হচ্ছে না?
তৃতীয় স্তবক: অহল্যার উদাহরণ ও
করুণার অপেক্ষা
"অহল্যা
পাষানী ছিল সেও তো মানব হলো প্রভুর চরণ ধুলে। আমি পাপী ডাকছি সদায় দয়া হবে কোন কালে ৼ"
- অহল্যা
পাষানী ছিল: অহল্যা (রামায়ণের চরিত্র) একজন পাষানী (পাথরের নারী) ছিল।
- সেও
তো মানব হলো: সেও
তো মানব হলো (মানুষের রূপ ফিরে পেল)।
- প্রভুর
চরণ ধুলে: প্রভুর (শ্রীরামের) চরণ স্পর্শ করার কারণে।
- আমি
পাপী ডাকছি সদায়: আমি
পাপী হয়েও (তোমাকে) সদায় (সব সময়) ডাকছি।
- দয়া
হবে কোন কালে: আমার
প্রতি তোমার দয়া (করুণা) কোন
কালে (কখন) হবে? মূলভাব: অহল্যার
মতো পাথরেরও মুক্তি হয়েছিল ঈশ্বরের চরণস্পর্শে। ভক্ত সেই উদাহরণ টেনে বলছেন, তিনি তো প্রতিনিয়ত ঈশ্বরকে ডাকছেন, তাহলে
তার প্রতি করুণা কেন হচ্ছে না?
চতুর্থ স্তবক: নাম জপ ও চরম
অসহায়ত্ব
"তোমার
নাম লয়ে যদি মরি দোহায় দিই তবু তোমারি আর আমি যাব কোন
কূলে। তুমি বৈ আর কেউ নাই আমার মূঢ়
লালন কেঁদে বলে ৼ"
- তোমার
নাম লয়ে: তোমার নাম জপ করে।
- যদি
মরি: যদি আমি মারাও যাই।
- দোহায়
দিই তবু তোমারি: তবুও
আমি তোমারই দোহাই (শপথ, মিনতি) দেব।
- আর
আমি যাব কোন কূলে: (কারণ) আমি আর কোন কূলে (কোনো
আশ্রয় বা পথে) যাব?
- তুমি
বৈ আর কেউ নাই আমার: তুমি
ছাড়া আর কেউ নেই আমার।
- মূঢ়
লালন কেঁদে বলে: মূঢ় (নির্বোধ বা সরল) লালন কেঁদে
এই কথা বলেন। মূলভাব: ভক্তের চরম আত্মসমর্পণের ভাব এখানে প্রকাশিত। তিনি
বলছেন, আমৃত্যু তিনি কেবল ঈশ্বরের
নামই জপ করবেন। কারণ তিনি জানেন যে, ঈশ্বর
ছাড়া তার আর কোনো আশ্রয় নেই। এই অসহায়ত্বের কারণেই তিনি কেঁদে কেঁদে এই কথা
বলছেন।
মূল বার্তা:
এই গানে লালন ফকির ঈশ্বরকে উদ্দেশ্য করে নিজের হীনতা ও অক্ষমতার কথা
স্বীকার করেছেন। তিনি জগাই-মাধাই ও
অহল্যার মতো পাপীদের উদ্ধারের উদাহরণ দিয়ে প্রশ্ন করছেন, কেন তার প্রতি করুণা করা হচ্ছে না। গানের শেষাংশে তিনি চরম অসহায়ত্বের
মধ্যে ঈশ্বরের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে বলছেন যে, ঈশ্বর ছাড়া তার আর কোনো আশ্রয় নেই। এটি এক ভক্তের নিবিড় বিরহ এবং করুণা
লাভের তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ।