আপন মনের বাঘে যাহারে খায় কোনখানে পলালে বাঁচা যায়
(৫৮)
আপন মনের বাঘে
যাহারে খায়।
কোনখানে পলালে
বাঁচা যায় ৼ
বন্ধ ছন্দ করিরে
এঁটে
ফস করে যায়
সকলি কেটে
অমনি সে গজরিয়ে
উঠে
সুখপাখিরে হানা
দেয় ৼ
মরার আগে মরতে
পারে
কোন বাঘে কি
করতে পারে
সেই মরা কী
আবার মরে
মরিলে সে অমর
হয় ৼ
অনুরাগী জ্যান্তে
মরা
গুরুপদে মন
নোঙ্গর করা
লালন তমনি পতঙ্গের
ধারা
অগ্নিমুখো ধেয়ে
যায় ৼ
প্রথম
স্তবক: মনের বাঘ ও পরিত্রাণের পথ
"আপন মনের বাঘে যাহারে খায়। কোনখানে পলালে বাঁচা
যায় ৼ"
- আপন মনের বাঘে: নিজের মনের বাঘ (এখানে
কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য - এই ষড়রিপু বা মনের রিপু-প্রবৃত্তি, যা মানুষকে ক্ষতিগ্রস্ত করে) দ্বারা।
- যাহারে খায়: যে
ব্যক্তি (বা যার আত্মসত্তা) খেয়ে ফেলে বা গ্রাস করে।
- কোনখানে পলালে: কোথায়
পালালে বা আশ্রয় নিলে।
- বাঁচা যায়: বাঁচা
সম্ভব? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, মনের বাঘ থেকে পালানোর কোনো স্থান নেই, একে দমন করতে হবে।)
দ্বিতীয়
স্তবক: রিপুর শক্তি ও সুখপাখির হানি
"বন্ধ ছন্দ করিরে এঁটে ফস করে যায় সকলি
কেটে অমনি সে গজরিয়ে উঠে সুখপাখিরে
হানা দেয় ৼ"
- বন্ধ ছন্দ করিরে: (যদি)
বন্ধ করার বা নিয়ন্ত্রণের ছন্দ (প্রক্রিয়া বা কৌশল) গ্রহণ করি।
- এঁটে: এঁটে
(কষে, দৃঢ়ভাবে) (বাঁধার চেষ্টা
করি)।
- ফস করে যায়: (তবুও মনের বাঘ) হঠাৎ করে
(ফস করে) চলে যায় বা বেড়িয়ে আসে।
- সকলি কেটে: সব
(নিয়ন্ত্রণ বা বাঁধন) কেটে ফেলে।
- অমনি সে গজরিয়ে: তখনই
সে (মনের বাঘ) গর্জন করে।
- উঠে: ওঠে।
- সুখপাখিরে হানা: (এবং) সুখপাখিকে (শান্তি, আনন্দ বা আত্মিক সুখকে) আক্রমণ (হানা) দেয়। মূলভাব: মনের
রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন; একটু
অসতর্ক হলেই সে প্রবল হয়ে ওঠে এবং আত্মিক শান্তি নষ্ট করে।
তৃতীয়
স্তবক: মরার আগে মরা ও অমরত্ব
"মরার আগে মরতে পারে কোন বাঘে কি করতে
পারে সেই মরা কী আবার মরে মরিলে
সে অমর হয় ৼ"
- মরার আগে মরতে পারে: যে
ব্যক্তি মরার আগে মরতে (আত্ম-অহংকার বা জাগতিক আকাঙ্ক্ষা থেকে নিজেকে সম্পূর্ণরূপে বিলীন করতে, অর্থাৎ 'ফানা' বা আধ্যাত্মিক মৃত্যু বরণ করতে) পারে।
- কোন বাঘে কি: কোনো
(মনের) বাঘ কি।
- করতে পারে: তার
কী ক্ষতি করতে পারে? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, পারে না)।
- সেই মরা কী: সেই
মৃত্যু (আধ্যাত্মিক মৃত্যু) কি।
- আবার মরে: আবার
মারা যায় (বা বিনাশ হয়)? (প্রশ্নটি
বোঝায় যে, হয় না)।
- মরিলে সে অমর: (এইভাবে) মরতে পারলে সে
(ব্যক্তি) অমর হয়। মূলভাব: জাগতিক
কামনা-বাসনা থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করতে পারলেই মনের রিপু নিষ্ক্রিয় হয়ে
যায় এবং সাধক অমরত্ব লাভ করে।
চতুর্থ
স্তবক: অনুরাগী ও লালনের আত্মনিবেদন
"অনুরাগী জ্যান্তে মরা গুরুপদে মন নোঙ্গর
করা লালন তমনি পতঙ্গের ধারা অগ্নিমুখো
ধেয়ে যায় ৼ"
- অনুরাগী জ্যান্তে মরা: প্রকৃত অনুরাগী (প্রেমিক
ভক্ত বা সাধক) হলো সেই ব্যক্তি যে জ্যান্তে মরা (জীবিত থাকা অবস্থাতেই
জাগতিক বিষয়ের প্রতি মৃত বা উদাসীন)।
- গুরুপদে মন: (তার) মন গুরুপদে (গুরুর
চরণে বা উপদেশে)।
- নোঙ্গর করা: নোঙ্গর
করা থাকে (স্থির, অবিচল ও নিবেদিত)।
- লালন তমনি পতঙ্গের: লালন
(নিজেকে) ঠিক তেমনি পতঙ্গের (ফড়িং বা মথ) মতো।
- ধারা: (যার) ধারা বা স্বভাব (যে
আগুনের দিকে ধেয়ে যায়)।
- অগ্নিমুখো ধেয়ে যায়: (সেই) অগ্নিমুখের (জ্ঞানাগ্নি
বা প্রেমের আগুনের) দিকে ধেয়ে যায়। মূলভাব: প্রকৃত
অনুরাগী জীবিত থেকেও জাগতিক মোহের প্রতি মৃত থাকে এবং গুরুর চরণে তার মন
স্থির থাকে। লালন নিজেকে সেই পতঙ্গের সাথে তুলনা করেছেন, যা জ্ঞান বা প্রেমের আগুনে নিজেকে বিলীন করে দিতে প্রস্তুত।
মূল
বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির বলেছেন যে, মনের রিপুগুলোই মানুষের
সবচেয়ে বড় শত্রু, যা থেকে পালানোর কোনো উপায় নেই। এই রিপুগুলোকে জয় করতে হলে 'মরার আগে মরা' অর্থাৎ জাগতিক কামনা-বাসনা থেকে
নিজেকে সম্পূর্ণভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে। এই আত্মবিলীনতাই অমরত্ব লাভের পথ। লালন
নিজেকে এক অনুরাগীরূপে উপস্থাপন করেছেন, যিনি
গুরুর চরণে সমর্পিত হয়ে জ্ঞান ও প্রেমের আগুনে আত্মাহুতি দিতে প্রস্তুত, যেমন পতঙ্গ আগুনে ঝাঁপ দেয়।