cover

cover

আপন খবর না যদি হয় যার অন্ত নাই

 


(৫৭)

আপন খবর না যদি হয়।

যার অন্ত নাই

তার খবর কে পায়

 

আত্মারূপে কেবা, ভান্ডেতে করে সেবা

দেখ দেখ যে বা

হও মহাশয়

 

কেবা চালায় হারে, কেবা চলে ফেরে

কেবা জাগে ধড়ে

কেবা ঘুমায়

 

অন্য গোলমাল ছাড়, মনরে আত্মতত্ত্ব ঢোঁড়

লালন বলে তত্ত্ববিদের

কাজ নয়


প্রথম স্তবক: নিজেকে না চেনার ফল

"আপন খবর না যদি হয়। যার অন্ত নাই তার খবর কে পায় ৼ"

  • আপন খবর: নিজের (সত্তা বা প্রকৃত স্বরূপের) খবর (তথ্য বা জ্ঞান)
  • না যদি হয়: যদি না থাকে বা না জানা যায়
  • যার অন্ত নাই: যার (পরম সত্তার) কোনো শেষ বা সীমা নেই
  • তার খবর কে পায়: তার (সেই অসীম পরম সত্তার) খবর বা জ্ঞান কে পাবে? মূলভাব: নিজেকেই যদি চিনতে না পারি, তাহলে অসীম পরম সত্তাকে চেনা অসম্ভব। আত্মজ্ঞানই পরম জ্ঞান লাভের প্রথম ধাপ

দ্বিতীয় স্তবক: দেহের ভেতরের সেবক আত্মা

"আত্মারূপে কেবা, ভান্ডেতে করে সেবা দেখ দেখ যে বা হও মহাশয় ৼ"

  • আত্মারূপে কেবা: কে সেই শক্তি বা সত্তা, যিনি আত্মারূপে (প্রাণসত্তা হিসেবে)
  • ভান্ডেতে: এই ভান্ডেতে (দেহরূপী পাত্র বা ভান্ডে)
  • করে সেবা: সেবা করছেন বা কাজ করছেন (অর্থাৎ, দেহকে সচল রাখছেন)
  • দেখ দেখ যে: তুমি দেখে নাও
  • বা হও মহাশয়: অথবা (এই জ্ঞান লাভ করে) তুমি মহাশয় (মহান ব্যক্তি বা জ্ঞানী) হও। মূলভাব: দেহের ভেতরে যে আত্মা দেহকে পরিচালিত করছে, তাকে চিনলেই মহান হওয়া যায়

তৃতীয় স্তবক: দেহের ক্রিয়ার মূলে কে?

"কেবা চালায় হারে, কেবা চলে ফেরে কেবা জাগে ধড়ে কেবা ঘুমায়ৼ"

  • কেবা চালায়: কে (এই দেহকে) চালাচ্ছেন?
  • হারে: (এক ধরণের সম্বোধন, আক্ষেপ বা জিজ্ঞাসা)
  • কেবা চলে ফেরে: কে (এই দেহের মাধ্যমে) চলাফেরা করছেন?
  • কেবা জাগে ধড়ে: কে এই ধড়ে (জড়দেহে) জেগে থাকে?
  • কেবা ঘুমায়: কে (এই দেহের মাধ্যমে) ঘুমায়? মূলভাব: দেহের সকল ক্রিয়ার পেছনে যে চালিকা শক্তি (আত্মা) আছে, সেই রহস্যময় সত্তাকে জানতে চাওয়া হয়েছে

চতুর্থ স্তবক: আত্মানুসন্ধানের আহ্বান

"অন্য গোলমাল ছাড়, মনরে আত্মতত্ত্ব ঢোঁড় লালন বলে তত্ত্ববিদের কাজ নয় ৼ"

  • অন্য গোলমাল ছাড়: (হে মন) অন্য সব গোলমাল (জাগতিক কোলাহল, বিভ্রান্তি, অপ্রয়োজনীয় চিন্তা) ছেড়ে দাও
  • মনরে আত্মতত্ত্ব ঢোঁড়: হে আমার মন, আত্মতত্ত্ব (নিজের সত্তার রহস্য) ঢোঁড় (অনুসন্ধান করো, খুঁজে দেখো)
  • লালন বলে তত্ত্ববিদের: লালন ফকির বলেন, (নিজের আত্মাকে না চেনা) কোনো প্রকৃত তত্ত্ববিদের (জ্ঞানী বা দার্শনিক) কাজ নয়। মূলভাব: জাগতিক বিষয় ছেড়ে নিজের আত্মাকে অনুসন্ধান করাই প্রকৃত জ্ঞানী ও সাধকের কাজ

মূল বার্তা:

এই গানে লালন ফকির আত্মানুসন্ধান এবং নিজেকে চেনার ওপর চরম গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন যে, নিজের ভেতরের আত্মাকে (যে দেহকে চালায়, জাগিয়ে রাখে, ঘুম পাড়ায়) চিনতে পারলেই অসীম পরম সত্তাকে জানা সম্ভব। অন্যথায়, জাগতিক গোলমালে মগ্ন থাকলে এই মহৎ জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হতে হয়। লালন দৃঢ়ভাবে বলেছেন যে, নিজেকে না চেনা কোনো তত্ত্ববিদের কাজ নয়, বরং আত্মতত্ত্বের অনুসন্ধানই প্রকৃত জ্ঞানের পথ


Powered by Blogger.