আপন ঘরের খবর নে না
(৫৬)
আপন ঘরের খবর
নে না।
অনায়াসে দেখতে
পাবি
কোনখানে কার
বারামখানা ৼ
কমল কোঠা কারে
বলি
কোন মোকাম তার
কোথায় গলি
কোন সময় (তার
উপর) পড়ে ফুলি
মধু খায় সে
অলিজনা ৼ
ওশ্ব্য জ্ঞান
যার সক্ষ মক্ষ্য
(সূক্ষ্ম জ্ঞান
যার ঐক্য মুখ্য)
সাধকের উপলক্ষ
অপরূপ তার বৃক্ষ
দেখলে জীবের
জ্ঞান থাকে না
(দেখলে চোখের
পাপ থাকে না) ৼ
শুষ্ক নদীর
সুখ-সরোবর
তিলে তিলে হয়
গো সাঁতার
লালন কয় কীর্তিকর্মার
কি কারখানা
ৼ
প্রথম
স্তবক: আপন ঘরের খবর ও বারামখানা
"আপন ঘরের খবর নে না। অনায়াসে দেখতে পাবি কোনখানে কার বারামখানা ৼ"
- আপন ঘরের খবর: তুমি
(হে মন) আপন ঘরের (নিজের দেহরূপী ঘরের বা ভেতরের সত্তার) খবর (গভীর রহস্য) নে না (জেনে
নাও)।
- অনায়াসে দেখতে পাবি: যদি
তা করতে পারো, তাহলে অনায়াসে (সহজেই)
তুমি দেখতে পাবে।
- কোনখানে কার বারামখানা: কোথায় (মানবদেহের কোন সূক্ষ্ম স্থানে) কার বারামখানা (কার বিশ্রামস্থল বা নিবাস)? এখানে 'কার' বলতে পরম সত্তা বা পরমাত্মাকে বোঝানো হয়েছে।
দ্বিতীয়
স্তবক: কমল কোঠা ও অলিজনা
"কমল কোঠা কারে বলি কোন মোকাম তার কোথায়
গলি কোন সময় (তার উপর) পড়ে ফুলি মধু খায় সে অলিজনা ৼ"
- কমল কোঠা কারে বলি: কমল
কোঠা (পদ্মাসনযুক্ত কক্ষ, যোগশাস্ত্রের চক্রগুলির প্রতীক) কাকে বলে?
- কোন মোকাম তার কোথায় গলি: তার (সেই কমল কোঠার) কোন
মোকাম (স্থান বা স্তর) এবং কোথায় গলি (সূক্ষ্ম
পথ) রয়েছে?
- কোন সময় (তার উপর) পড়ে ফুলি: কখন (সাধনার কোন স্তরে) তার (কমল কোঠার) উপর ফুলে (পাপড়ি) পড়ে বা প্রস্ফুটিত
হয়?
- মধু খায় সে অলিজনা: এবং
সেই (প্রস্ফুটিত পদ্মের) মধু (দিব্য আনন্দ বা অমৃতরস) কে পান করে বা অলিজনা (ভ্রমর, এখানে সাধক) সে মধু খায়?
তৃতীয়
স্তবক: সূক্ষ্ম জ্ঞান ও জ্ঞানীর উপলব্ধি
"ওশ্ব্য জ্ঞান যার সক্ষ মক্ষ্য (সূক্ষ্ম জ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য) সাধকের উপলক্ষ অপরূপ
তার বৃক্ষ দেখলে জীবের জ্ঞান থাকে না (দেখলে
চোখের পাপ থাকে না) ৼ"
- ওশ্ব্য জ্ঞান যার সক্ষ মক্ষ্য: যার ওশ্ব্য
জ্ঞান (ঐশ্বরিক জ্ঞান) সক্ষ (লক্ষ্য)
এবং মক্ষ্য (প্রধান বিষয়)। এটি সাধকের সূক্ষ্ম জ্ঞানের প্রতি ইঙ্গিত। (দ্বিতীয়
পঙক্তিটি এর ব্যাখ্যাস্বরূপ)।
- (সূক্ষ্ম জ্ঞান যার ঐক্য মুখ্য): অর্থাৎ, যার কাছে সূক্ষ্ম জ্ঞান (গভীর
আধ্যাত্মিক জ্ঞান) একত্ব (পরম সত্তার সাথে একাত্মতা) অর্জনের জন্য মুখ্য (প্রধান)।
- সাধকের উপলক্ষ: (সেই
সূক্ষ্ম জ্ঞানই) সাধকের
উপলক্ষ্য (লক্ষ্য)।
- অপরূপ তার বৃক্ষ: (সেই
জ্ঞান দ্বারা সাধক দেখেন) এক অপরূপ (অসাধারণ) বৃক্ষ (জীবন বৃক্ষ বা সৃষ্টি)।
- দেখলে জীবের জ্ঞান থাকে না: সেই বৃক্ষ দেখলে জীবের (সাধারণ মানুষের) জ্ঞান (জাগতিক জ্ঞান বা বিবেচনা)
থাকে না (অর্থাৎ, সে মুগ্ধ ও অভিভূত হয়ে
যায়)।
- (দেখলে চোখের পাপ থাকে না): অথবা, (সেই অপরূপ রূপ দেখলে) চোখের পাপ (দোষ
বা মলিনতা) থাকে না (অর্থাৎ, দৃষ্টি
পবিত্র হয়ে যায়)।
চতুর্থ
স্তবক: শুষ্ক নদীর সরোবর ও সৃষ্টির রহস্য
"শুষ্ক নদীর সুখ-সরোবর তিলে তিলে হয় গো
সাঁতার লালন কয় কীর্তিকর্মার কি কারখানাৼ"
- শুষ্ক নদীর: (যে নদী) শুষ্ক (শুকিয়ে
গেছে বা প্রাণহীন)। এটি হয়তো জাগতিক অস্তিত্বের শুষ্কতা বা অসারতাকে বোঝায়।
- সুখ-সরোবর: (সেই শুষ্ক নদীর মধ্যেই
লুকিয়ে আছে) সুখ-সরোবর (আনন্দের হ্রদ বা উৎস)। এটি মানবদেহের ভেতরের সুপ্ত আনন্দের উৎস।
- তিলে তিলে হয় গো সাঁতার: (সেই
সরোবরে) তিলে তিলে (ধীরে ধীরে বা ক্রমান্বয়ে) সাঁতার কাটতে হয় (সাধন অনুশীলন করতে হয়)।
- লালন কয় কীর্তিকর্মার: লালন ফকির বলেন, (এ
সবই) কীর্তিকর্মার (মহান স্রষ্টার, যিনি সকল কাজের কর্তা)
- কি কারখানা: কী
আশ্চর্য কারখানা (সৃষ্টি কৌশল বা লীলা)।
মূল
বার্তা:
এই গানে
লালন ফকির মানবদেহকেই সকল রহস্যের আধার হিসেবে তুলে ধরেছেন। তিনি বলছেন যে, নিজের ভেতরের 'আপন ঘর'কে জানতে পারলে 'কমল কোঠা' এবং 'স্বর্ণশিখর' এর মতো যোগিক কেন্দ্রগুলোর খবর পাওয়া যায়, যেখানে
দিব্য জ্ঞান ও অমৃতরস বিদ্যমান। তিনি জোর দিয়েছেন যে, এই সূক্ষ্ম জ্ঞানই সাধকের লক্ষ্য এবং এটি অর্জিত হলে জাগতিক জ্ঞান তুচ্ছ
হয়ে যায়। পরিশেষে, তিনি এই সকল অলৌকিক লীলাকে মহান সৃষ্টিকর্তার (কীর্তিকর্মা) এক আশ্চর্য কারখানা বলে বর্ণনা করেছেন।