আপন ছুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়
(৫৫)
আপন ছুরাতে
আদম গঠলেন দয়াময়।
তা নইলে কি
ফেরেস্তারে
সেজদা দিতে
কয় ৼ
আল্লা আদম না
হইলে
পাপ হইত সেজদা
দিলে
শেরেকী পাপ
যারে বলে
এ দীন দুনিয়ায়
ৼ
দুষে সেই আদম
ছফি
আজাজীল হল পাপী
মন তোমার লাফালাফি
সেরূপ দেখা
যায় ৼ
আদমি সে চেনে
আদম
পশু কি তার
জানে মরম
লালন কয় আদ্য
ধরম
আদম চিনলে হয়
ৼ
প্রথম
স্তবক: আপন সুরতে আদম সৃষ্টি
"আপন ছুরাতে আদম গঠলেন দয়াময়। তা নইলে কি ফেরেস্তারে সেজদা দিতে কয়
ৼ"
- আপন ছুরাতে: নিজের
(আল্লাহর) সুরতে (রূপ, আকৃতি বা গুণাবলির
প্রতিচ্ছবিতে)। অর্থাৎ, আল্লাহ
তাঁর নিজেরই আদলে বা গুণাবলির প্রকাশ ঘটিয়ে।
- আদম গঠলেন দয়াময়: আদমকে (প্রথম মানব, এখানে মানবজাতি বা
মানবদেহের মধ্যে সুপ্ত পরম সত্তা) গঠন (সৃষ্টি) করলেন দয়াময় (আল্লাহ)।
- তা নইলে কি: যদি
তা না হতো (যদি আদম আল্লাহর নিজস্ব সুরতে গঠিত না হতো)।
- ফেরেস্তারে: ফেরেশতাদেরকে
(ফেরেশতাকুলকে)।
- সেজদা দিতে: সিজদা
(প্রণিপাত বা শ্রদ্ধা জ্ঞাপন) করতে।
- কয়: কি
বলতেন? (প্রশ্নটি বোঝায় যে, আদম যেহেতু আল্লাহরই প্রতিচ্ছবি, তাই
ফেরেশতাদের তাঁকে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। এটি আদমের শ্রেষ্ঠত্ব
বোঝায়।)
দ্বিতীয়
স্তবক: আদম ও আল্লার অভিন্নতা
"আল্লা আদম না হইলে পাপ হইত সেজদা দিলে শেরেকী পাপ যারে
বলে এ দীন দুনিয়ায়ৼ"
- আল্লা আদম না হইলে: যদি
আল্লাহ এবং আদম (আল্লাহর গুণাবলির ধারক হিসেবে) অভিন্ন না হতেন বা একে অপরের
প্রতিচ্ছবি না হতেন।
- পাপ হইত সেজদা দিলে: তাহলে
(ফেরেশতাদের) আদমকে সিজদা করা পাপ হতো।
- শেরেকী পাপ: এটি শিরক (আল্লাহর
সাথে অন্য কাউকে অংশীদার করা বা সমকক্ষ ভাবা) নামক গুরুতর পাপ হতো।
- যারে বলে: যাকে
বলা হয়।
- এ দীন দুনিয়ায়: এই
দিন-দুনিয়ায় (পৃথিবীতে)। মূলভাব: আদম আল্লাহরই প্রকাশ বা প্রতিচ্ছবি হওয়ায় তাঁকে
সিজদা করা শিরক নয়; বরং এটি আল্লাহরই মহিমাকে
সিজদা করার সমতুল্য।
তৃতীয়
স্তবক: আদমের বৈশিষ্ট্য ও মনের অস্থিরতা
"দুষে সেই আদম ছফি আজাজীল হল পাপী মন তোমার লাফালাফি সেরূপ
দেখা যায় ৼ"
- দুষে সেই আদম ছফি: (যিনি)
সেই আদম ছফিকে (আদম-কে, 'ছফি' অর্থ নির্বাচিত বা পবিত্র) অবজ্ঞা বা নিন্দা করে।
- আজাজীল হল পাপী: আজাজীল (ইবলিশের পূর্ব নাম, যে
আদমকে সিজদা করতে অস্বীকার করেছিল) পাপী হলো।
এটি ইবলিশের অহংকার এবং বিদ্রোহের দিকে ইঙ্গিত।
- মন তোমার লাফালাফি: (হে)
মন, তোমার যে লাফালাফি (অস্থিরতা, চঞ্চলতা বা অহংকার)।
- সেরূপ দেখা যায়: (তাতে)
সেই (আজাজিলের মতো) রূপ দেখা যায়। মূলভাব: যে
মন প্রকৃত আদমকে (নিজের ভেতরের দিব্য সত্তাকে) চিনতে অস্বীকার করে, তার মধ্যে ইবলিশের মতো অহংকার ও চঞ্চলতা দেখা যায়।
চতুর্থ
স্তবক: আদম চেনার গুরুত্ব
"আদমি সে চেনে আদম পশু কি তার জানে
মরম লালন কয় আদ্য ধরম আদম
চিনলে হয়ৼ"
- আদমি সে চেনে আদম: আদমি (প্রকৃত মানুষ, মানবিক গুণাবলি সম্পন্ন
ব্যক্তি) সেই আদমকে (নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তা বা 'ইনসান-ই-কামিল'কে) চিনতে পারে।
- পশু কি তার: পশু (যুক্তিহীন বা কেবল প্রবৃত্তির দ্বারা চালিত সত্তা) কি তার।
- জানে মরম: মরম (গভীর রহস্য বা মর্ম) জানতে পারে? (প্রশ্নটি
বোঝায় যে, পশু এই রহস্য জানে না, শুধু প্রকৃত মানবই জানে)।
- লালন কয় আদ্য ধরম: লালন
ফকির বলেন, আদি ধর্ম (মূল ধর্ম বা সর্বজনীন ধর্ম)।
- আদম চিনলে হয়: আদমকে (নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তা বা 'মানুষ'কে) চিনলেই হয় বা প্রতিষ্ঠিত হয়। মূলভাব: প্রকৃত
মানুষই নিজের ভেতরের ঐশ্বরিক সত্তা ('আদম') কে চিনতে পারে, যা সকল ধর্মের মূল। আদমকে
চেনাই প্রকৃত ধর্ম।
মূল
বার্তা:
এই
গানটিতে লালন ফকির বলেছেন যে, মানবদেহ আল্লাহরই নিজস্ব
গুণাবলির প্রতিচ্ছবিতে সৃষ্ট, এবং এই কারণেই ফেরেশতাদের
আদমকে সিজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। তিনি সতর্ক করেছেন যে, আদমকে (নিজের ভেতরের
ঐশ্বরিক সত্তাকে) অবজ্ঞা করা ইবলিশের পাপের মতো। লালনের মতে, নিজেকে (আদমকে) জানা বা উপলব্ধি করাই হলো আদি এবং প্রকৃত ধর্ম, যা কেবল একজন 'আদমি' বা প্রকৃত মানুষের পক্ষেই সম্ভব, পশুর
পক্ষে নয়।