cover

cover

আপন মনের গুণে সকলি হয় পিঁড়েয় পায় পেঁড়োর খবর

 


(৫৯)

আপন মনের গুণে সকলি হয়।

পিঁড়েয় পায় পেঁড়োর খবর

কেউ দূরে যায়

 

রামদাস রামদাস বলে

সে তো মুচির ছেলে

গঙ্গা মায়ের এমনি নীলে

এলো চাম-কঠোরায়

 

জাতে সে জুলা কুবীর

উড়িষ্যায় তাহার জাহির

বারো জাত তার হাঁড়ির

তুড়ানি খায়

 

না বুঝে ঘর ছেড়ে

জঙ্গলে বাঁধে কুঁড়ে

লালন কয় রিপু ছেড়ে

যাবি কোথায়


প্রথম স্তবক: মনের গুণ ও দূরত্বের বিভ্রম

"আপন মনের গুণে সকলি হয়। পিঁড়েয় পায় পেঁড়োর খবর কেউ দূরে যায়ৼ"

  • আপন মনের গুণে: মানুষের নিজের মনের গুণ (বা বৈশিষ্ট্য, ক্ষমতা বা অবস্থা) দ্বারাই
  • সকলি হয়: সবকিছু (ভালো-মন্দ, উপলব্ধি-অজ্ঞানতা) ঘটে থাকে
  • পিঁড়েয় পায়: (কেউ কেউ) পিঁড়েয় (ঘরের কোণে, নিজেদের সীমিত পরিধিতে বা নিজের মধ্যেই) বসেই লাভ করে
  • পেঁড়োর খবর: পেঁড়োর (অসীম, ব্যাপক বা পরম সত্তার) খবর (জ্ঞান বা উপলব্ধি)
  • কেউ দূরে যায়: (আর) কেউ কেউ (এই খবর পেতে) অনেক দূরে (বাইরের জগতে বা তীর্থে) যায়। মূলভাব: আত্মোপলব্ধির জন্য মনের গুণই আসল; কিছু লোক নিজেদের মধ্যেই পরম সত্তাকে খুঁজে পায়, আর কিছু লোক বৃথা বাইরে ঘুরে বেড়ায়

দ্বিতীয় স্তবক: রামদাস ও গঙ্গা মায়ের লীলা

"রামদাস রামদাস বলে সে তো মুচির ছেলে গঙ্গা মায়ের এমনি নীলে এলো চাম-কঠোরায়ৼ"

  • রামদাস রামদাস বলে: (যাকে সবাই) রামদাস, রামদাস বলে (শ্রদ্ধা করে বা যার নাম জপ করে)
  • সে তো মুচির ছেলে: সে তো ছিল একজন মুচির ছেলে (নিম্নবর্ণের ব্যক্তি)। এটি জাতিভেদের ঊর্ধ্বে ভক্তির মহিমাকে বোঝায়
  • গঙ্গা মায়ের: গঙ্গা মায়ের (গঙ্গাদেবী বা পবিত্রতার প্রতীক)
  • এমনি নীলে: এমনই লীলায় (অলৌকিক খেলায় বা মহিমায়)
  • এলো চাম-কঠোরায়: (সে নিজেই) চাম-কঠোরায় (চামড়ার থলিতে, অর্থাৎ নিজ দেহের মধ্যে বা মুচির কাজ করতে করতে) সেই দিব্যভাব লাভ করল বা ঈশ্বরকে পেল। মূলভাব: জাতিভেদের ঊর্ধ্বে গিয়ে ভক্তির দ্বারাই একজন নিম্নবর্ণের ব্যক্তিও ঈশ্বরকে লাভ করতে পারে, যেমন মুচির ছেলে রামদাস পেয়েছিলেন

তৃতীয় স্তবক: কবির ও জাতিভেদের ঊর্ধ্বে

"জাতে সে জুলা কুবীর উড়িষ্যায় তাহার জাহির বারো জাত তার হাঁড়ির তুড়ানি খায়ৼ"

  • জাতে সে জুলা কুবীর: জাতিতে সে ছিল জুলা (মুসলমান তাঁতি), কবীর (মহাজ্ঞানী সাধক কবীর দাস)। এটি আবারও জাতিভেদের ঊর্ধ্বে সাধনার উদাহরণ
  • উড়িষ্যায় তাহার জাহির: উড়িষ্যায় তার (মহিমা) জাহির (প্রকাশিত) হয়েছিল
  • বারো জাত তার: বারোটি জাতের (বিভিন্ন জাতি বা সম্প্রদায়ের মানুষ)
  • হাঁড়ির তুড়ানি খায়: তার (কবীর দাসের) হাঁড়ির তুড়ানি (রান্নার পর হাঁড়িতে লেগে থাকা ভাতের ফ্যান বা উচ্ছিষ্ট) খায়। এটি বোঝায় যে, কবীর এমন একজন সিদ্ধ পুরুষ ছিলেন যাঁর জাতিগত পরিচয় মুছে গিয়েছিল এবং সকল বর্ণের মানুষ তাঁকে শ্রদ্ধা করত ও তাঁর প্রসাদ গ্রহণ করত। মূলভাব: সাধক কবীর জাতিতে তাঁতি হয়েও তাঁর সাধনার গুণে এমন মহিমা অর্জন করেছিলেন যে সকল জাতি তাঁকে শ্রদ্ধা করত, যা জাতিভেদের অর্থহীনতা প্রমাণ করে

চতুর্থ স্তবক: রিপু জয় ও প্রকৃত আশ্রয়

"না বুঝে ঘর ছেড়ে জঙ্গলে বাঁধে কুঁড়ে লালন কয় রিপু ছেড়ে যাবি কোথায় ৼ"

  • না বুঝে ঘর ছেড়ে: (কেউ কেউ) না বুঝেই (নিজের প্রকৃত স্বরূপ বা সাধন পথ) ঘর ছেড়ে (সংসার ত্যাগ করে)
  • জঙ্গলে বাঁধে কুঁড়ে: জঙ্গলে (নির্জন স্থানে) গিয়ে কুঁড়ে (ঝুপড়ি) বাঁধে (সন্ন্যাসী হয়)
  • লালন কয় রিপু ছেড়ে: লালন ফকির বলেন, (কিন্তু যদি) রিপু (কাম, ক্রোধ, লোভ ইত্যাদি) না ছাড়ো
  • যাবি কোথায়: তাহলে (এই রিপুদের ছেড়ে) তুমি কোথায় যাবে বা প্রকৃত শান্তি পাবে? মূলভাব: কেবল সংসার ত্যাগ করে জঙ্গলে গেলেই হবে না; যদি মনের রিপুকে দমন না করা হয়, তাহলে কোনো লাভ নেই, কারণ রিপুরা সেখানেই অনুসরণ করবে

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির প্রকৃত সাধনার জন্য মনের গুণ এবং রিপু দমনের ওপর জোর দিয়েছেন। তিনি রামদাস ও কবীরের মতো সাধকদের উদাহরণ দিয়ে দেখিয়েছেন যে, জাতি, ধর্ম বা সামাজিক অবস্থান সাধনার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নয়। শুধু বাহ্যিক সংসার ত্যাগ করে জঙ্গলে গেলেই মুক্তি মেলে না; আসল কাজ হলো মনের ভেতরের রিপুগুলোকে জয় করা। নিজেকে জানা এবং রিপুকে নিয়ন্ত্রণ করাই মুক্তি ও পরম জ্ঞান লাভের পথ


Powered by Blogger.