cover

cover

আমার মন বেবাগী ঘোড়া বাগ মানে না দিবারাতে

 


(৭৩)

আমার মন বেবাগী ঘোড়া

বাগ মানে না দিবারাতে

মুর্শিদ, আমার বুটের দানা

খায় না ঘোড়ায় কোন মতে

 

বিছমিল্লায় দিয়ে লাগাম

একশ ত্রিশ তাহার পালান

হাদিস মতে কশনী কসে

চড়লাম ঘোড়ায় সোয়র হতে

 

বিছমিল্লার গম্ভু ভারি

নামাজ-রোজা তাহার সিঁড়ি

খায় রাতে দিনে পাঁচ আড়ি

ছিঁড়ল দড়া আচম্বিতে

 

লালন কয় রয়ে সয়ে

কত ঘোড়সোয়ারী যাচ্ছে বেয়ে

পারে যাব কি আছি বসে

শুধু আমার কোড়া হাতে


প্রথম স্তবক: বেবাগী ঘোড়া ও বুটের দানা

"আমার মন বেবাগী ঘোড়া বাগ মানে না দিবারাতে মুর্শিদ, আমার বুটের দানা খায় না ঘোড়ায় কোন মতে ৼ"

  • আমার মন বেবাগী ঘোড়া: আমার মন হলো এক বেবাগী (নিয়ন্ত্রণহীন, অবাধ্য) ঘোড়া
  • বাগ মানে না: সে বাগ মানে না (লাগাম মেনে চলে না)
  • দিবারাতে: দিনরাত (সবসময়)
  • মুর্শিদ, আমার: হে মুর্শিদ (গুরু)
  • বুটের দানা: আমার বুটের দানা (ভালো কাজের উপদেশ বা ধর্মীয় বিধান, অর্থাৎ বুট বা ছোলার দানা যেমন পুষ্টিকর)
  • খায় না ঘোড়ায়: ঘোড়া (মন) তা খায় না
  • কোন মতে: কোনোভাবেই। মূলভাব: লালন বলছেন যে, তাঁর মন একটি অবাধ্য ঘোড়ার মতো, যা গুরুর দেওয়া ধর্মীয় বা আধ্যাত্মিক উপদেশ (বুটের দানা) কোনোভাবেই মানতে চায় না

দ্বিতীয় স্তবক: লাগাম ও কশনী

"বিছমিল্লায় দিয়ে লাগাম একশ ত্রিশ তাহার পালান হাদিস মতে কশনী কসে চড়লাম ঘোড়ায় সোয়র হতে ৼ"

  • বিছমিল্লায় দিয়ে লাগাম: বিসমিল্লাহ (আল্লাহর নামে, যা সব কাজের শুরু) দিয়ে (আমি মনের ঘোড়ার) লাগাম দিলাম
  • একশ ত্রিশ তাহার পালান: তার পালান (ঘোড়ার পিঠে বসার গদি) হলো একশো ত্রিশ (ইসলামী শাস্ত্রানুযায়ী স্রষ্টার বিভিন্ন নাম বা গুণ, অথবা সুফী সাধনার বিশেষ সংখ্যা)
  • হাদিস মতে কশনী কসে: হাদিস মতে (হাদিসের নির্দেশ অনুযায়ী) কশনী (ঘোড়ার পিঠের বাঁধন) কষে (শক্ত করে বেঁধে)
  • চড়লাম ঘোড়ায়: আমি ঘোড়ায় চড়লাম
  • সোয়র হতে: একজন সোয়ার (সওয়ারি বা চালক) হতে। মূলভাব: লালন বলছেন, তিনি ইসলামের পবিত্র বিধান অনুযায়ী মনকে বশে আনার চেষ্টা করেছিলেন

তৃতীয় স্তবক: নামাজ-রোজা ও ছিঁড়ে যাওয়া দড়া

"বিছমিল্লার গম্ভু ভারি নামাজ-রোজা তাহার সিঁড়ি খায় রাতে দিনে পাঁচ আড়ি ছিঁড়ল দড়া আচম্বিতেৼ"

  • বিছমিল্লার গম্ভু ভারি: বিসমিল্লাহর গম্ভু (ঘোড়ার লাগামের সঙ্গে যুক্ত মুখের লোহার লাগাম) খুব ভারি (শক্তিশালী)
  • নামাজ-রোজা তাহার সিঁড়ি: নামাজ-রোজা (ইসলামের প্রধান ইবাদত) হলো তার সিঁড়ি (মনের ঘোড়ায় চড়ার সহায়ক)
  • খায় রাতে দিনে পাঁচ আড়ি: (কিন্তু সেই ঘোড়া) রাতে-দিনে পাঁচ আড়ি (অনেক বেশি, অসীম) খায়। এটি হয়তো পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের বা পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের খাবারের রূপক
  • ছিঁড়ল দড়া আচম্বিতে: (তবুও) আচমকা (আচম্বিতে) দড়া (লাগামের দড়ি) ছিঁড়ে গেল। মূলভাব: লালন বলেন যে, নামাজ-রোজা দিয়ে মনকে বশে আনার চেষ্টা সত্ত্বেও, মন রূপী ঘোড়া এতই শক্তিশালী যে তা সমস্ত ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণকে ভেঙে ফেলে

চতুর্থ স্তবক: ঘোড়সোয়ারী ও লালনের অসহায়ত্ব

"লালন কয় রয়ে সয়ে কত ঘোড়সোয়ারী যাচ্ছে বেয়ে পারে যাব কি আছি বসে শুধু আমার কোড়া হাতে ৼ"

  • লালন কয় রয়ে সয়ে: লালন বলেন, রয়ে-সয়ে (ধৈর্য ধরে) বা ধীরে ধীরে
  • কত ঘোড়সোয়ারী: কত ঘোড়সোয়ারী (সাধক বা মানুষ)
  • যাচ্ছে বেয়ে: (মনের ঘোড়ায় চড়ে) পার হয়ে যাচ্ছে (ভব সাগর)
  • পারে যাব কি: আমি কি পার হতে পারব? (প্রশ্নটি আক্ষেপের)
  • আছি বসে: আমি বসে আছি
  • শুধু আমার কোড়া হাতে: (অথচ) আমার হাতে কেবল কোড়া (চাবুক)। মূলভাব: অন্যান্য সাধকরা মনকে বশে এনে সংসার সাগর পাড়ি দিচ্ছে, কিন্তু লালন শুধু হাতে চাবুক নিয়ে বসে আছেন, কারণ তাঁর মনকে বশে আনা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি নিজের অপারগতা ও অসহায়ত্ব প্রকাশ করেছেন

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির মনের অস্থিরতা ও রিপুর ওপর নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতা প্রকাশ করেছেন। তিনি মনকে এক অবাধ্য ঘোড়ার সাথে তুলনা করেছেন, যা ইসলামের প্রধান ইবাদতগুলোকেও মানতে চায় না। তিনি আক্ষেপ করে বলছেন যে, অনেক সাধকই মনকে বশে এনে মুক্তি লাভ করছে, কিন্তু তিনি কেবল হাতে চাবুক নিয়ে অসহায়ের মতো বসে আছেন। এটি একজন সাধকের নিজের দুর্বলতা এবং আধ্যাত্মিক পথের কঠিনতার এক মর্মস্পর্শী বর্ণনা


Powered by Blogger.