cover

cover

আমার এ ঘর খানাই কে বিরাজ করে

 


(৭২)

আমার এ ঘর খানাই কে বিরাজ করে।

আমি জনম ভরে একদিন

দেখলাম নারে

 

নড়ে চড়ে ইশান কোণে

দেখতে পাই নে এই নয়নে

হাতের কাছে যার,

ভবের হাট বাজার

ধরতে গেলে হাতে পাই নে তারে।

সবে বলে প্রাণ-পাখি

শুনে চুপে চোপে থাকি

জল কি হুতাশন,

মাটি কি পবন

কেউ বলে না একটা নির্ণয় করে

 

আপন ঘরের খবর হয় না

বাঞ্ছা করি পরকে চেনা

লালন বলে,

পর বলতে পরমেশ্বর

সে কিরূপ আমি কিরূপ রে


প্রথম স্তবক: ঘরের রহস্য ও আত্মিক সত্তা

"আমার এ ঘর খানাই কে বিরাজ করে। আমি জনম ভরে একদিন দেখলাম নারেৼ"

  • আমার এ ঘর খানাই: আমার এই ঘরখানায় (মানবদেহরূপী গৃহে)
  • কে বিরাজ করে: কে বিরাজ করে (অবস্থান করে)?
  • আমি জনম ভরে: আমি জনম ভরে (সারা জীবন)
  • একদিন দেখলাম নারে: একদিনও তাকে দেখতে পেলাম না। মূলভাব: লালন আক্ষেপ করছেন যে, তাঁর নিজের দেহের ভেতরেই এক সত্তা বাস করছে, অথচ তিনি সারা জীবন চেষ্টা করেও তাকে দেখতে পেলেন না

দ্বিতীয় স্তবক: রহস্যময় প্রাণ-পাখি

"নড়ে চড়ে ইশান কোণে দেখতে পাই নে এই নয়নে হাতের কাছে যার, ভবের হাট বাজার ধরতে গেলে হাতে পাই নে তারে। সবে বলে প্রাণ-পাখি শুনে চুপে চোপে থাকি জল কি হুতাশন, মাটি কি পবন কেউ বলে না একটা নির্ণয় করে ৼ"

  • নড়ে চড়ে ইশান কোণে: সেই সত্তা ইশান কোণে (যোগশাস্ত্র অনুযায়ী মানবদেহের ঊর্ধ্বে অবস্থিত একটি স্থান বা ব্রহ্মরন্ধ্র, যা আধ্যাত্মিক কেন্দ্র) নড়েচড়ে বা বিচরণ করে
  • দেখতে পাই নে এই নয়নে: কিন্তু এই (জাগতিক) চোখে তাকে দেখতে পাই না
  • হাতের কাছে যার: যিনি হাতের কাছেই থাকেন (অর্থাৎ, শরীরের ভেতরেই)
  • ভবের হাট বাজার: এই ভবের (পৃথিবীর) হাট-বাজার (জাগতিক বিষয়)
  • ধরতে গেলে হাতে পাই নে তারে: তাঁকে ধরতে গেলে হাতে পাই না
  • সবে বলে প্রাণ-পাখি: সবাই তাকে প্রাণ-পাখি (জীবনরূপী পাখি) বলে
  • শুনে চুপে চোপে থাকি: আমি শুনে চুপচাপ থাকি (কারণ আমি নিজে কিছু জানি না)
  • জল কি হুতাশন, মাটি কি পবন: সে কি জল (পানি), হুতাশন (আগুন), মাটি না পবন (বায়ু)?
  • কেউ বলে না একটা নির্ণয় করে: কেউ একটিও নির্ণয় করে (নির্দিষ্ট করে) বলে না। মূলভাব: এই সত্তা দেহের ভেতরেই থাকলেও জাগতিক চোখে তাকে দেখা যায় না। সবাই তাকে প্রাণ-পাখি বললেও, তার প্রকৃত স্বরূপ কী, তা নিয়ে কেউ নিশ্চিত নয়, এবং তাই লালনও বিভ্রান্ত

তৃতীয় স্তবক: পরের খবর জানার আকাঙ্ক্ষা ও আত্মজিজ্ঞাসা

"আপন ঘরের খবর হয় না বাঞ্ছা করি পরকে চেনা লালন বলে, পর বলতে পরমেশ্বর সে কিরূপ আমি কিরূপ রে ৼ"

  • আপন ঘরের খবর হয় না: আমার আপন ঘরের (নিজের দেহ বা আত্মার) খবর (জ্ঞান) হয় না
  • বাঞ্ছা করি পরকে চেনা: (অথচ) আমি পরকে (অন্যকে, এখানে পরম সত্তা) চেনার আকাঙ্ক্ষা (বাঞ্ছা) করি
  • লালন বলে, পর বলতে পরমেশ্বর: লালন ফকির বলেন, 'পর' বলতে তো পরমেশ্বরকে বোঝানো হয়
  • সে কিরূপ আমি কিরূপ রে: (তাহলে) তিনি (পরমেশ্বর) কী রূপ এবং আমি (আত্মা) কী রূপ? মূলভাব: লালন এখানে আত্ম-উপলব্ধির গুরুত্বের ওপর জোর দিয়েছেন। নিজের ভেতরের সত্তাকে না চিনে বাইরের পরম সত্তাকে চিনতে চাওয়ার আকাঙ্ক্ষাকে তিনি হাস্যকর মনে করছেন এবং সেই সঙ্গে প্রশ্ন করছেন, পরমাত্মা ও আত্মার মধ্যে সম্পর্ক ও পার্থক্য কী?

মূল বার্তা:

এই গানটিতে লালন ফকির আত্মানুসন্ধানের অপরিহার্যতা তুলে ধরেছেন। তিনি বলেছেন যে, মানবদেহের মধ্যেই এক রহস্যময় সত্তা (প্রাণ-পাখি) বাস করে, যার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে কেউ নিশ্চিত নয়। সেই সত্তার খবর না জেনে বাইরের পরম সত্তাকে চেনার আকাঙ্ক্ষা করা অর্থহীন। লালনের চূড়ান্ত প্রশ্ন হলো, পরমাত্মা ও আত্মার স্বরূপ কী এবং তাদের মধ্যে সম্পর্ক কেমন, যা আত্মজ্ঞানের মাধ্যমে সমাধান হতে পারে

 


Powered by Blogger.