আমারে কি রাখবেন গুরু চরণদাসী
(৭৪)
আমারে কি রাখবেন
গুরু চরণদাসী।
ইতরপনা কার্য
আমার
ঘটে অহর্নিশি
ৼ
জঠর যন্ত্রণা
পেয়ে
এসেছিলাম কড়াল
দিয়ে
সে সকল গিয়াছি
ভুলে
এ ভবে আসি ৼ
চিনলি না মন
গুরু কি ধন
জানলি না তার
সেবা সাধন
ঘুরতে বুঝি
হল রে মন
এবার চুরাশী
ৼ
গুরু যার আছে
সদায়
শমন বলে তার
কিসের ভয়
লালন বলে মনরে
আমায়
করিলি দুষি
ৼ
প্রথম স্তবক: চরণদাসীর আকাঙ্ক্ষা
ও নিজের পাপবোধ
"আমারে
কি রাখবেন গুরু চরণদাসী। ইতরপনা কার্য আমার ঘটে অহর্নিশিৼ"
- আমারে
কি রাখবেন: আমাকে
কি রাখবেন (আশ্রয় দেবেন)?
- গুরু
চরণদাসী: হে গুরু, তোমার চরণদাসী (চরণের
সেবিকা বা দাস)।
- ইতরপনা
কার্য: ইতরপনা কার্য (হীন, খারাপ বা নিকৃষ্ট কাজ)।
- আমার
ঘটে: আমার দ্বারা ঘটে বা করা হয়।
- অহর্নিশি: দিনরাত (সবসময়)। মূলভাব: লালন
গুরুকে প্রশ্ন করছেন যে, তিনি
কি তাকে নিজের চরণদাসী হিসেবে গ্রহণ করবেন? কারণ তিনি দিনরাত হীন ও খারাপ কাজ করে থাকেন। এটি নিজের পাপবোধের
কারণে গুরুর করুণা লাভের বিষয়ে সংশয় প্রকাশ।
দ্বিতীয় স্তবক: জঠর যন্ত্রণা ও
প্রতিজ্ঞা ভুলে যাওয়া
"জঠর
যন্ত্রণা পেয়ে এসেছিলাম কড়াল দিয়ে সে সকল গিয়াছি ভুলে এ ভবে আসি ৼ"
- জঠর
যন্ত্রণা পেয়ে: জঠর (মায়ের গর্ভে) যন্ত্রণায় থেকে।
- এসেছিলাম
কড়াল দিয়ে: কড়াল (প্রতিজ্ঞা বা শপথ) দিয়ে
(এই পৃথিবীতে) এসেছিলাম।
- সে
সকল গিয়াছি ভুলে: আমি
সেই সকল প্রতিজ্ঞা ভুলে গেছি।
- এ
ভবে আসি: এই ভবে (সংসারে) এসে। মূলভাব: লালন বলছেন যে, মাতৃগর্ভের যন্ত্রণায় তিনি
প্রতিজ্ঞা করেছিলেন যে, সংসার
থেকে মুক্তি চাইবেন, কিন্তু পৃথিবীতে এসে তিনি
সেই প্রতিজ্ঞা ভুলে গেছেন এবং জাগতিক কাজে লিপ্ত হয়েছেন।
তৃতীয় স্তবক: গুরুকে না চেনা ও
চৌরাশির ভয়
"চিনলি
না মন গুরু কি ধন জানলি না তার সেবা
সাধন ঘুরতে বুঝি হল রে মন এবার
চুরাশীৼ"
- চিনলি
না মন: হে মন, তুই চিনতে পারলি না।
- গুরু
কি ধন: গুরু (একজন প্রকৃত গুরু) কী মূল্যবান ধন (সম্পদ)।
- জানলি
না তার সেবা সাধন: তাঁর
(গুরুর) সেবা সাধন (সেবার মাধ্যমে সাধনার পদ্ধতি) তুই জানলি না।
- ঘুরতে
বুঝি: বোধহয় (তোকে) আবার ঘুরতে
হবে।
- হল
রে মন: হে মন।
- এবার
চুরাশী: এবার চৌরাশি (চৌরাশি
লক্ষ যোনি, অর্থাৎ জন্ম-মৃত্যুর চক্র)। মূলভাব: লালন তাঁর মনকে তিরস্কার করছেন, কারণ
সে গুরুর মহিমা এবং সেবা-সাধনের পদ্ধতি চিনতে পারেনি। এর ফলস্বরূপ, তাকে আবার জন্ম-মৃত্যুর চক্রে (চৌরাশিতে) ঘুরতে হতে পারে।
চতুর্থ স্তবক: গুরুর আশ্রয় ও
মনের প্রতি আক্ষেপ
"গুরু
যার আছে সদায় শমন বলে তার কিসের ভয় লালন বলে মনরে আমায় করিলি দুষিৼ"
- গুরু
যার আছে: যার একজন প্রকৃত গুরু আছেন।
- সদায়: সর্বদা (যার আশ্রয়)।
- শমন
বলে তার: শমন (মৃত্যু বা যমরাজ) তাকে বলে।
- কিসের
ভয়: কিসের ভয় (কেন সে ভয়
পাবে)? (অর্থাৎ, যার গুরু আছেন, তার মৃত্যুভয় থাকে না)।
- লালন
বলে মনরে: লালন বলেন, হে মন।
- আমায়: আমাকে।
- করিলি
দুষি: তুই দুষি (দোষী
বা পাপী) করে দিলি। মূলভাব: যার গুরু আছেন, তার
মৃত্যুভয় থাকে না। কিন্তু লালন তাঁর মনকে দোষী মনে করছেন, কারণ মনের ইতরপনার কারণে তিনি গুরুর কৃপা লাভে ব্যর্থ হয়েছেন।
মূল বার্তা:
এই গানটিতে লালন ফকির নিজের দুর্বলতা ও মনের ইতরপনার কারণে গুরুর করুণা থেকে
বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন। তিনি তাঁর
মনকে তিরস্কার করে বলছেন যে, মন গুরুর মহিমা না চেনার
কারণে তাকে জন্ম-মৃত্যুর চক্রে ঘুরতে হবে। লালন আক্ষেপের সঙ্গে বলছেন যে, মন তাকে দোষী করে দিয়েছে এবং গুরুর আশ্রয় না পাওয়ায় তিনি মুক্তি থেকে
বঞ্চিত হবেন। এটি একজন ভক্তের অন্তরের গভীর আকুলতা, আক্ষেপ
ও আত্মসমর্পণের প্রকাশ।