cover

cover

আগে গুরুরতি কর সাধনা

 


(২৭)

আগে গুরুরতি কর সাধনা।

ভব-বন্ধন কেটে যাবে

আসা-যাওয়া রবে না

 

প্রবর্তের গুরু চেন, পঞ্চতত্ত্বের খবর জান

নামে রুচি হলে জীবের কেন, দয়া হবে না।

প্রবর্তের কাজ না সারিতে,

চাও যদি মন সাধু হতে

ঠেকবি যেয়ে মেয়ের হাতে,

লম্ফতে আর সারবে না

 

প্রবর্তের কাজ আগে সার, মেয়ে হয়ে মেয়ে ধর

সাধন দেশে নিশান গাড়, রবে ষোলআনা।

রেখ শ্রীগুরুতে নিষ্ঠারতি,

ভজন পথে রেখ মতি

আঁধার ঘরে জ্বলবে বাতি,

অন্ধকার রবে না

 

মেয়ে হয়ে মেয়ের বেশে, ভক্তি সাধন কর বসে

আদি চন্দ্র রাখ কষে, কখনো তারে ছেড় না।

ডোব গিয়ে প্রেমানন্দে,

সুধা পাবে দন্ডে দন্ডে

লালন কয় জীবের পাপ খন্ডে,

আমার মুক্তি হলো না


প্রথম স্তবক:

"আগে গুরুরতি কর সাধনা। ভব-বন্ধন কেটে যাবে আসা-যাওয়া রবে না ৼ"

  • আগে গুরুরতি কর সাধনা: সবার আগে গুরুতে রতি অর্থাৎ গুরুর প্রতি গভীর প্রেম, ভক্তি ও নিষ্ঠা স্থাপন করে সাধন (আধ্যাত্মিক অনুশীলন) করো। এটি বাউল দর্শনে গুরুভক্তির সর্বোচ্চ গুরুত্বকে নির্দেশ করে
  • ভব-বন্ধন কেটে যাবে: তাহলে ভব-বন্ধন (জন্ম-মৃত্যুর চক্র, পার্থিব মায়াজাল) কেটে যাবে
  • আসা-যাওয়া রবে না: জন্ম-মৃত্যুর এই চক্রে আসা-যাওয়া বা বারবার জন্মগ্রহণ করা আর থাকবে না, অর্থাৎ মুক্তি লাভ হবে

দ্বিতীয় স্তবক:

"প্রবর্তের গুরু চেন, পঞ্চতত্ত্বের খবর জান নামে রুচি হলে জীবের কেন, দয়া হবে না। প্রবর্তের কাজ না সারিতে, চাও যদি মন সাধু হতে ঠেকবি যেয়ে মেয়ের হাতে, লম্ফতে আর সারবে না ৼ"

  • প্রবর্তের গুরু চেন: প্রবর্ত হলো সাধনার প্রথম ধাপ বা সূচনা। এই ধাপের জন্য সঠিক গুরুকে (যিনি প্রবর্তের পথ দেখাবেন) চিনে নাও
  • পঞ্চতত্ত্বের খবর জান: পঞ্চতত্ত্বের (মাটি, জল, অগ্নি, বায়ু, আকাশ বা প্রেম, ভক্তি, রস, আনন্দ, নিত্য বাউলদের সাধন-তত্ত্ব অনুযায়ী) খবর (রহস্য বা জ্ঞান) জানো
  • নামে রুচি হলে জীবের কেন, দয়া হবে না: যদি ঈশ্বরের নামের প্রতি বা আধ্যাত্মিক পথের প্রতি জীবের রুচি (আগ্রহ) হয়, তাহলে কেন তার প্রতি ঈশ্বরের দয়া হবে না? (এটি বোঝায় যে, রুচি বা আগ্রহ থাকলে ঈশ্বর অবশ্যই কৃপা করেন)
  • প্রবর্তের কাজ না সারিতে: প্রবর্ত (সাধনার প্রথম ও মৌলিক) ধাপের কাজ শেষ না করেই
  • চাও যদি মন সাধু হতে: হে মন, যদি তুমি সাধু (মুক্ত পুরুষ বা সিদ্ধ সাধক) হতে চাও
  • ঠেকবি যেয়ে মেয়ের হাতে: তাহলে তুমি মেয়ের হাতে ঠেকবে বা বাধাগ্রস্ত হবে। এখানে 'মেয়ে' রূপক অর্থে মায়া, প্রলোভন, জাগতিক আসক্তি বা এমনকি সাধনমার্গের কোনো বিঘ্নকারী শক্তিকে বোঝাতে পারে। এটি সাধনার অপূর্ণতার কারণে আসা বিপদের ইঙ্গিত
  • লম্ফতে আর সারবে না: তখন কেবল লম্ফঝম্প করে বা তাড়াহুড়ো করে আর তা শুধরানো যাবে না

তৃতীয় স্তবক:

"প্রবর্তের কাজ আগে সার, মেয়ে হয়ে মেয়ে ধর সাধন দেশে নিশান গাড়, রবে ষোলআনা। রেখ শ্রীগুরুতে নিষ্ঠারতি, ভজন পথে রেখ মতি আঁধার ঘরে জ্বলবে বাতি, অন্ধকার রবে না ৼ"

  • প্রবর্তের কাজ আগে সার: প্রবর্তের কাজ (অর্থাৎ, মৌলিক সাধন, শুদ্ধি ও প্রস্তুতি) আগে শেষ করো
  • মেয়ে হয়ে মেয়ে ধর: 'মেয়ে হয়ে' বলতে এখানে নিজেকে প্রকৃতির অংশ, বা সহজিয়া নারী শক্তিকে ধারণ করে। 'মেয়ে ধর' বলতে সেই অভ্যন্তরীণ শক্তিকে (নারীমূর্তিরূপিণী শক্তি) ধারণ করা বা নিয়ন্ত্রণ করা বোঝানো হয়েছে। এটি এক ধরণের দেহকেন্দ্রিক যোগিক সাধনার ইঙ্গিত
  • সাধন দেশে নিশান গাড়: তোমার সাধন দেশে (আধ্যাত্মিক উপলব্ধির স্থানে বা আত্মিক রাজ্যে) তোমার বিজয় নিশান (পতাকা) স্থাপন করো
  • রবে ষোলআনা: তাহলে তুমি পুরোপুরি সফল হবে, ষোল আনা (শতভাগ) সার্থকতা লাভ করবে
  • রেখ শ্রীগুরুতে নিষ্ঠারতি: শ্রীগুরুর প্রতি তোমার নিষ্ঠা ও রতি (গভীর ভক্তি) বজায় রাখো
  • ভজন পথে রেখ মতি: ভজনের পথে (সাধনা বা উপাসনার পথে) তোমার মনকে (মতি) নিবদ্ধ রাখো
  • আঁধার ঘরে জ্বলবে বাতি: (তাহলে) তোমার ভেতরের আঁধার ঘরে (অজ্ঞানের অন্ধকারাচ্ছন্ন হৃদয় বা মন) জ্ঞানের বাতি জ্বলবে
  • অন্ধকার রবে না: আর কোনো অন্ধকার (অজ্ঞানতা বা মোহ) থাকবে না

চতুর্থ স্তবক:

"মেয়ে হয়ে মেয়ের বেশে, ভক্তি সাধন কর বসে আদি চন্দ্র রাখ কষে, কখনো তারে ছেড় না। ডোব গিয়ে প্রেমানন্দে, সুধা পাবে দন্ডে দন্ডে লালন কয় জীবের পাপ খন্ডে, আমার মুক্তি হলো না ৼ"

  • মেয়ে হয়ে মেয়ের বেশে: নিজেকে মেয়ে রূপে (প্রকৃতি বা সাধনসঙ্গিনী রূপে) ধারণ করে। এটি বাউলদের বিশেষ সাধন পদ্ধতিকে ইঙ্গিত করে, যেখানে পুরুষ সাধকও নিজেকে নারীভাবে ভজন করেন
  • ভক্তি সাধন কর বসে: স্থির হয়ে বসে ভক্তি সাধন করো
  • আদি চন্দ্র রাখ কষে: আদি চন্দ্র (পরমাত্মা, দিব্য জ্যোতি বা সহজ চাঁদ) তাকে দৃঢ়ভাবে ধারণ করো। 'কষে রাখা' মানে শক্ত করে ধরে রাখা, যাতে তা হাতছাড়া না হয়
  • কখনো তারে ছেড় না: তাকে (আদি চন্দ্রকে) কখনো ছেড়ো না বা ছেড়ে দিও না
  • ডোব গিয়ে প্রেমানন্দে: প্রেমানন্দে (ঐশ্বরিক প্রেমের সাগরে) ডুব দাও
  • সুধা পাবে দন্ডে দন্ডে: তাহলে প্রতি মুহূর্তে (দণ্ডে দণ্ডে) সুধা (অমৃত, দিব্য আনন্দ) লাভ করবে
  • লালন কয় জীবের পাপ খন্ডে: লালন ফকির বলেন, (এভাবে সাধন করলে) জীবের পাপ খন্ডিত হয় (মুক্ত হয়)
  • আমার মুক্তি হলো না: (কিন্তু আক্ষেপ করে বলছেন) আমার মুক্তি হলো না। এটি লালনের বিনয় এবং নিজের প্রতি এক গভীর আত্ম-আক্ষেপ, যেখানে তিনি নিজের অপরিপূর্ণতাকে তুলে ধরেছেন

এই গানে লালন ফকির গুরুভক্তি, আত্মিক পরিশুদ্ধি এবং বিশেষ সাধন পদ্ধতির মাধ্যমে কীভাবে ভব-বন্ধন থেকে মুক্তি লাভ করা যায়, তার এক বিস্তৃত চিত্র তুলে ধরেছেন


Powered by Blogger.