আগে তুই না জেনে মন দিসনে নয়ন করি হে মানা
(২৮)
আগে তুই না
জেনে মন দিসনে নয়ন
করি হে মানা।
নয়ন দিলে যাবা
জন্মের
আর ফিরে আসবে
না ৼ
নিবায় বেলায়
কত ছন্দি
নিয়ে করে কপাট
বন্দি
ফিরে দেখায়
না;
তোর মত ভোলানি
ছন্দ
জগতে কেউ জানে
না ৼ
দেখেছি তার
রাঙা-চরণ
না দেখেই ভুলে
ছিল মন
করে বন্দনা;
লালন বলে ঐ
রাঙা-চরণ
আমার ভাগ্যে
হইল না ৼ
প্রথম স্তবক:
"আগে তুই
না জেনে মন দিসনে নয়নকরি হে মানা।নয়ন দিলে যাবা জন্মেরআর ফিরে আসবে না ৼ"
- আগে তুই না জেনে: হে মন, তুমি
আগে ভালোভাবে না জেনে।
- মন দিসনে নয়ন: মন দিও না, বা
দৃষ্টিপাত করো না,
বা নিজেকে সঁপে দিও না।
- করি হে মানা: আমি (তোমাকে) নিষেধ করছি।
- নয়ন দিলে যাবা জন্মের: একবার যদি সেখানে
(মোহ বা ভুল পথে) দৃষ্টি দাও বা নিজেকে সঁপে দাও, তাহলে জন্মের জন্য
(চিরকালের জন্য) চলে যাবে।
- আর ফিরে আসবে না: এবং আর ফিরে আসতে পারবে না, অর্থাৎ
মোহ থেকে মুক্ত হতে পারবে না। এটি অবিবেচকের মতো ভুল পথে পা বাড়ালে যে
চিরস্থায়ী ক্ষতি হয়,
তা বোঝায়।
দ্বিতীয় স্তবক:
"নিবায়
বেলায় কত ছন্দিনিয়ে করে কপাট বন্দিফিরে দেখায় না;তোর মত ভোলানি ছন্দজগতে কেউ জানে
না ৼ"
- নিবায় বেলায়: যখন সব শেষ হয়ে যায় বা
যখন আলো নিভে যায় (মৃত্যুর সময় বা সুযোগ শেষের সময়)।
- কত ছন্দি: কত ছলনা বা কৌশল।
- নিয়ে করে কপাট বন্দি: নিয়ে (নানা প্রলোভন দিয়ে)
মনের বা জীবনের দরজা বন্ধ করে দেয়।
- ফিরে দেখায় না: (একবার বন্দি হয়ে গেলে) আর ফিরে আসার পথ
দেখায় না।
- তোর মত ভোলানি ছন্দ: তোমার (মনের) মতো ছলনাময়ী
কৌশল।
- জগতে কেউ জানে না: এই জগতে আর কেউ জানে না।
এখানে মনকে উদ্দেশ্য করে বলা হচ্ছে যে তার নিজেরই এমন ছলনাময় দিক আছে যা
তাকে ভুল পথে নিয়ে যায়।
তৃতীয় স্তবক:
"দেখেছি
তার রাঙা-চরণনা দেখেই ভুলে ছিল মনকরে বন্দনা;লালন বলে ঐ রাঙা-চরণআমার ভাগ্যে
হইল না ৼ"
- দেখেছি তার রাঙা-চরণ: (আমি) তাঁর (গুরু বা পরম
সত্তার)
রাঙা-চরণ (পবিত্র চরণ, যা
ভক্তির প্রতীক) দেখেছি।
- না দেখেই ভুলে ছিল মন: (কিন্তু) না দেখেই আমার মন
ভুল পথে চলেছিল,
বা মোহগ্রস্ত ছিল।
- করে বন্দনা:
(এখন সেই রাঙা-চরণের) বন্দনা (পূজা বা স্তুতি) করছে।
অর্থাৎ, পূর্বে মন ভুল পথে থাকলেও এখন সে সত্যকে চিনতে পেরেছে।
- লালন বলে ঐ রাঙা-চরণ: লালন ফকির বলেন, সেই
রাঙা-চরণ।
- আমার ভাগ্যে হইল না: আমার ভাগ্যে লাভ হলো না, বা
তাকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব হলো না। এটি লালনের বিনয় এবং নিজেকে অপূর্ণ
সাধক হিসেবে উপস্থাপনের এক মর্মস্পর্শী প্রকাশ, যেখানে তিনি ভাগ্যের
ওপর দোষারোপ করে নিজের আক্ষেপ প্রকাশ করছেন।
এই
গানটিতে লালন মনকে সতর্ক করছেন যেন সে অবিবেচকের মতো মায়ার ফাঁদে পা না দেয়।
তিনি জীবনের ক্ষণস্থায়ীতা এবং মোহগ্রস্ত হওয়ার বিপদ সম্পর্কে সাবধান করেছেন। একই
সাথে, তিনি গুরু বা পরম সত্তার প্রতি ভক্তি এবং আত্মিক উপলব্ধির গুরুত্ব তুলে
ধরেছেন, কিন্তু আক্ষেপ করছেন যে তার নিজের পক্ষে সেই পরম সত্যকে সম্পূর্ণভাবে ধারণ
করা সম্ভব হয়নি।