আমার সাধ মেটে না লাঙ্গল চষে হারা হলাম দিশে
(৬৯)
আমার সাধ মেটে
না লাঙ্গল চষে
হারা হলাম দিশে।
জমি করব আবাদ
ঘটে বিবাদ
দুপুরে ডাকিনী
পুষে ৼ
পালে ছিল ছয়টা
এঁড়ে
দুটো কানা দুটো
খোঁড়া
আর দুটো গড়ে,
তাদের ধাক্কা
দিলে হুঁক্কা ছাড়ে
কখন যেন সর্বনাশে
ৼ
জমি করি পদ্মবিলে
মনমাতঙ্গ কাম
শরীলে
জমি গেল কসে,
জমির বাঁধ বনিয়াদ
ভেসে গেল
কাঁদি জমির
কূলে বসে ৼ
সুইলিশ লোহার
অস্ত্রখানি
ধার ওঠে না
বসে গুনি
টান দিলে যায়
খসে,
ফকির লালন বলে
না পাকাল দিলে
সে অস্ত্র কি
আসে বশে ৼ
প্রথম স্তবক: সাধনার ব্যর্থতা ও
দিশেহারা হওয়া
"আমার
সাধ মেটে না লাঙ্গল চষে হারা হলাম দিশে। জমি করব আবাদ ঘটে বিবাদ দুপুরে ডাকিনী পুষে
ৼ"
- আমার
সাধ মেটে না: আমার সাধ (ইচ্ছা
বা আকাঙ্ক্ষা) পূরণ হয় না।
- লাঙল
চষে: লাঙল চষা (সাধনা বা জীবনচর্চা)।
- হারা
হলাম দিশে: আমি দিশেহারা (লক্ষ্যভ্রষ্ট)
হয়ে গেছি।
- জমি
করব আবাদ: আমি জমি (দেহ
বা মন) আবাদ (চাষ) করব (অর্থাৎ, মনকে
সাধন-ভজনের জন্য প্রস্তুত করব)।
- ঘটে
বিবাদ: (কিন্তু) বিবাদ (ঝামেলা
বা বাধা) ঘটে।
- দুপুরে
ডাকিনী পুষে: (কারণ) আমি দুপুরে (রূপক অর্থে দিনের আলো বা জ্ঞান থাকার সময়) ডাকিনী (অশুভ শক্তি বা রিপু) পুষে (পালন
করে)। মূলভাব: লালন আক্ষেপ করছেন যে, তিনি মনকে সাধনার উপযোগী করতে চাইলেও পারছেন না, কারণ মনের মধ্যে রিপু বা কুপ্রবৃত্তি পুষে রেখেছেন।
দ্বিতীয় স্তবক: ছয়টি এঁড়ে ও
সর্বনাশের ভয়
"পালে
ছিল ছয়টা এঁড়ে দুটো কানা দুটো খোঁড়া আর দুটো গড়ে, তাদের
ধাক্কা দিলে হুঁক্কা ছাড়ে কখন যেন সর্বনাশেৼ"
- পালে
ছিল ছয়টা এঁড়ে: আমার পালে (দলে
বা নিয়ন্ত্রণে) ছয়টা
এঁড়ে (বলদ, এখানে ষড়রিপু—কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য—এর রূপক) ছিল।
- দুটো
কানা দুটো খোঁড়া: তাদের
মধ্যে দুটো কানা (অন্ধ, সত্য দেখতে পায় না), দুটো খোঁড়া (অচল, ভালো পথে চলতে পারে না)।
- আর
দুটো গড়ে: আর দুটো গড় (নিয়ন্ত্রণহীন
বা অবাধ্য)।
- তাদের
ধাক্কা দিলে: (যদি) তাদের ধাক্কা (বাধা)
দিই।
- হুঁক্কা
ছাড়ে: তারা হুঁকোর (হুঁকা)
মতো ধোঁয়া ছাড়ে (অর্থাৎ, ভীষণভাবে
ক্রুদ্ধ ও অশান্ত হয়ে ওঠে)।
- কখন
যেন সর্বনাশে: যেকোনো
মুহূর্তে সর্বনাশ (সম্পূর্ণ ধ্বংস) ঘটাতে পারে। মূলভাব: লালন
বলছেন, মনের মধ্যে থাকা রিপুগুলো
নিয়ন্ত্রণহীন এবং বিপজ্জনক। তারা যেকোনো মুহূর্তে সাধকের সর্বনাশ ঘটাতে পারে।
তৃতীয় স্তবক: জমি, মন ও বাঁধের দুর্দশা
"জমি করি
পদ্মবিলে মনমাতঙ্গ কাম শরীলে জমি গেল
কসে, জমির বাঁধ বনিয়াদ ভেসে গেল কাঁদি জমির কূলে বসে ৼ"
- জমি
করি পদ্মবিলে: আমি পদ্মবিলে (পবিত্র
হৃদয়ের পদ্ম বা আধ্যাত্মিক স্থানে) জমি (দেহ বা মন) চাষ করি।
- মনমাতঙ্গ
কাম শরীলে: কিন্তু কাম (কামনা)
নামক মনমাতঙ্গ (মাতাল হাতি) শরীলে (শরীরের মধ্যে)।
- জমি
গেল কসে: জমি (সাধনার ক্ষেত্র) কষে (আঁটসাঁট হয়ে বা শক্ত হয়ে) যায়।
- জমির
বাঁধ বনিয়াদ: (এবং
এর ফলে) জমির বাঁধ (নিয়ন্ত্রণ) ও বনিয়াদ (মূল ভিত্তি) ভেঙে।
- ভেসে
গেল: ভেসে যায়।
- কাঁদি
জমির কূলে বসে: (তাই) আমি সেই জমির কূলে (সীমানায়)
বসে কাঁদি। মূলভাব: কামনা-বাসনার কারণে সাধনার ক্ষেত্র (মন) অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ে। ফলে
সাধনার ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায় এবং সাধক হতাশ হয়ে পড়ে।
চতুর্থ স্তবক: সুইলিশ ও পাকাল
দেওয়ার গুরুত্ব
"সুইলিশ
লোহার অস্ত্রখানি ধার ওঠে না বসে
গুনি টান দিলে যায় খসে, ফকির লালন বলে না পাকাল দিলে সে
অস্ত্র কি আসে বশে ৼ"
- সুইলিশ
লোহার অস্ত্রখানি: সুইলিশ (নিস্তেজ বা নিস্তেজকারী) লোহার তৈরি অস্ত্রখানি (লাঙলের ফলা, এখানে আত্মিক শক্তি বা জ্ঞান)।
- ধার
ওঠে না: তাতে ধার ওঠে না।
- বসে
গুনি: আমি বসে বসে এই কথা ভাবি।
- টান
দিলে যায় খসে: (যখন তা দিয়ে কাজ করতে) টান
দিই, তখন তা খসে (আলাদা হয়ে যায়)।
- ফকির
লালন বলে: ফকির লালন বলেন।
- না
পাকাল দিলে: যদি
তাতে পাকাল (পাকা বা অভিজ্ঞ হাতে ঘুরানো-ফেরানো) না দেওয়া হয়।
- সে
অস্ত্র কি আসে বশে: সেই
অস্ত্র কি বশে (নিয়ন্ত্রণে) আসে? (প্রশ্নটি
বোঝায় যে, আসে না)। মূলভাব: আত্মিক শক্তি বা জ্ঞানকে শাণিত ও কার্যকর করতে হলে গুরুর নির্দেশনায়
সঠিক অনুশীলন (পাকাল দেওয়া) প্রয়োজন। তা না হলে সেই শক্তি দুর্বল ও অকেজো
থাকে।
মূল বার্তা:
এই গানে লালন ফকির সাধকের মনের দুর্বলতা ও রিপু দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন যে, মনের মধ্যে থাকা রিপুগুলো (ছয়টা এঁড়ে) এতই শক্তিশালী যে তারা সাধকের
সাধনার ভিত্তি নষ্ট করে দেয়। তিনি রূপকের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছেন যে, আত্মিক শক্তিকে কাজে লাগাতে হলে কেবল ইচ্ছা থাকলেই হবে না, বরং গুরুর তত্ত্বাবধানে কঠোর অনুশীলন
(পাকাল দেওয়া) প্রয়োজন, যা ছাড়া মনকে বশে আনা বা সাধনার পথে সফল হওয়া সম্ভব নয়।