আমার হয় না রে সে মনের মত মন
(৬৮)
আমার হয় না
রে সে মনের মত মন।
আমি জানব কিসে
রাগের করণ ৼ
পড়ে রিপুর ইন্দ্রভালে
মন বেড়ায় রে
ডালে ডালে
দুই মনে এক
মন হইলে
এড়ায় শমন ৼ
রসিক ভক্ত যারা
মনে মন মিলাল
তারা
শাসন করে তিনটি
ধারা
পেল রতন ৼ
কিসে হবে নাগিনী
বস
সাধব কবে অমৃত
রস
সিরাজ সাঁই
কয় বিষেতে নাশ
হলি লালন ৼ
প্রথম স্তবক: মনের অক্ষমতা ও
জ্ঞানের অভাব
"আমার
হয় নারে সে মনের মত মন।আমি জানব কিসেরাগের করণ ৼ"
- আমার
হয় না রে: আমার
হয় না (আমার পক্ষে সম্ভব নয়)।
- সে
মনের মত মন: সেই মনের মতো মন (যে
মন ঈশ্বরকে পেতে চায়, যে মন স্থির ও শান্ত)।
- আমি
জানব কিসে: আমি
কী করে জানব?
- রাগের
করণ: রাগের করণ (রাগের কারণ, অর্থাৎ ঈশ্বর প্রেমের মূল
রহস্য বা সাধন পদ্ধতি)। মূলভাব: লালন আক্ষেপ করছেন যে, তাঁর মন শান্ত ও স্থির নয়, তাই
ঈশ্বর প্রেমের মূল রহস্য বা সাধন পদ্ধতি তাঁর পক্ষে জানা সম্ভব নয়।
দ্বিতীয় স্তবক: রিপুর প্রভাবে
মনের অস্থিরতা
"পড়ে
রিপুর ইন্দ্রভালেমন বেড়ায় রেডালে ডালেদুই মনে একমন হইলেএড়ায় শমন ৼ"
- পড়ে
রিপুর ইন্দ্রভালে: রিপুর (কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য - এই ষড়রিপু) ইন্দ্রজালে (মায়াজাল
বা ফাঁদে) পড়ে।
- মন
বেড়ায় রে: মন
(অস্থির হয়ে) ঘুরে বেড়ায়।
- ডালে
ডালে: (যেমন পাখি) ডালে ডালে (এক
স্থান থেকে অন্য স্থানে)।
- দুই
মনে এক মন হইলে: যদি দুই মন (দ্বিধাবিভক্ত
মন, জাগতিক ও আধ্যাত্মিক মনের দ্বন্দ্ব) এক মন (ঐক্যবদ্ধ, স্থির ও একাগ্র) হয়।
- এড়ায়
শমন: তবেই শমনকে (মৃত্যু
বা যমকে) এড়ানো যায় বা মুক্তি লাভ করা যায়। মূলভাব: রিপুর
প্রভাবে মন অস্থির হয়ে ওঠে। কেবল যখন এই অস্থির মন স্থির ও একাগ্র হয়, তখনই মুক্তি লাভ করা সম্ভব।
তৃতীয় স্তবক: রসিক ভক্তের সাধনা
"রসিক
ভক্ত যারামনে মন মিলালতারাশাসন করে তিনটিধারাপেল রতন ৼ"
- রসিক
ভক্ত যারা: যে
সকল ব্যক্তি রসিক
ভক্ত (পরম সত্তার প্রেমরসে মগ্ন
সাধক)।
- মনে
মন মিলাল তারা: তারা মনে মন (মনের
সঙ্গে পরম সত্তার মনকে) মিলিয়ে দিয়েছে।
- শাসন
করে তিনটি ধারা: তারা তিনটি ধারাকে (ইড়া, পিঙ্গলা, সুষুম্না – যোগশাস্ত্রের তিনটি প্রধান
নাড়ী অথবা সত্ত্ব, রজ, তম – তিনটি
গুণ) শাসন করে (নিয়ন্ত্রণ করে)।
- পেল
রতন: (এবং এর ফলস্বরূপ) রতন (মূল্যবান
রত্ন, অর্থাৎ পরম জ্ঞান বা
মুক্তি) লাভ করেছে। মূলভাব: প্রকৃত রসিক সাধকরা মনকে পরম সত্তার সঙ্গে একাত্ম
করে এবং যোগিক সাধনার মাধ্যমে দেহের তিনটি প্রধান ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে পরম
রত্ন (মুক্তি) লাভ করে।
চতুর্থ স্তবক: লালনের আক্ষেপ ও
গুরুর উপদেশ
"কিসে
হবে নাগিনীবসসাধব কবে অমৃতরসসিরাজ সাঁইকয় বিষেতে নাশহলি লালন ৼ"
- কিসে
হবে: কী করে হবে?
- নাগিনী
বস: নাগিনীকে (মনরূপী বিষধর সাপ বা রিপুকে) বশ করা।
- সাধব
কবে: কবে আমি সাধন করব?
- অমৃত
রস: অমৃত রস (মুক্তির আনন্দ বা দিব্য প্রেম)।
- সিরাজ
সাঁই কয়: (লালনের গুরু) সিরাজ সাঁই বলেন।
- বিষেতে
নাশ: (হে লালন) তুমি বিষেতে (রিপুর
বিষে বা মনের গরলে) নাশ (নষ্ট) হয়ে গেলে।
- হলি
লালন: হে লালন। মূলভাব: লালন প্রশ্ন করছেন যে, তিনি
কীভাবে মনরূপী নাগিনীকে বশ করবেন এবং কবে অমৃতরস লাভ করবেন। তাঁর গুরু সিরাজ
সাঁই উত্তর দিচ্ছেন যে, রিপুর
বিষের কারণে লালন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এটি লালনের প্রতি গুরুর এক কঠোর কিন্তু
করুণাময় সতর্কবাণী।
মূল বার্তা:
এই গানে লালন ফকির অস্থির মন এবং রিপুর প্রভাবকে তার আধ্যাত্মিক পথের
প্রধান বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তিনি
রসিক ভক্তদের উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন যে, মনকে
স্থির ও একাগ্র করে এবং দেহের তিনটি প্রধান ধারাকে নিয়ন্ত্রণ করে পরম জ্ঞান লাভ
করা সম্ভব। পরিশেষে, তিনি গুরু সিরাজ সাঁইয়ের মুখে
নিজের ব্যর্থতার কথা শুনে আক্ষেপ করেছেন যে, রিপুর
বিষের কারণে তিনি ক্রমশ নষ্ট হয়ে যাচ্ছেন এবং অমৃতরস থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।