আজ আমার অন্তরে কি হলো ও গো সই
(৪৬)
আজ আমার অন্তরে
কি হলো
ও গো সই।
আজ ঘুমের ঘোরে
চাঁদ গৌর হেরে
ও গো আমি যেন
আমি নই ৼ
আজ আমার গৌরপদে
মন হরিল
আর কিছু লাগে
না ভালো
সদায় মনের চিন্তা
ঐ;
আমার সর্বস্ব
ধন গৌরধন, সে ধন সাধন
কিসে পাই গো
তাই শুধাই ৼ
যদি মরি গৌর
বিচ্ছেদ বানে
গৌর নাম শুনাইও
কানে
সর্বাঙ্গে লেখ
নামের বই;
এই বর দে গো
সবে, আমি জনমে জনমে
যেন ঐ গৌরপদে
দাসী হই ৼ
বন পুড়ে তা
সবাই দেখে
মনের আগুন কে-বা
দেখে
আমার রসরাজ
চৈতন্য বৈ;
গোপীর এমনি
দশা, ও কি মরণ দশা
অবোধ লালন তোর
সে-ভাব কই ৼ
প্রথম স্তবক: চাঁদ গৌর দর্শনে
আত্মহারা
"আজ আমার অন্তরে কি হলো ও গো
সই। আজ ঘুমের ঘোরে চাঁদ গৌর হেরে ও গো আমি যেন আমি নই ৼ"
- আজ আমার অন্তরে কি হলো: আজ আমার (ভক্তের) হৃদয়ে কী এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটল।
- ও গো সই: ওগো
সখী (সম্বোধন, ভক্তের মনের অবস্থা
প্রকাশের জন্য)।
- আজ ঘুমের ঘোরে চাঁদ গৌর হেরে: আজ ঘুমের ঘোরের মধ্যে আমি চাঁদ গৌরকে (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু, যিনি চাঁদের মতো উজ্জ্বল ও সুন্দর) দর্শন করে।
- ও গো আমি যেন আমি নই: ওগো, আমি যেন আর আমি নেই। অর্থাৎ, প্রিয়তমের
দর্শনে ভক্তের নিজস্ব সত্তা বিলীন হয়ে গেছে, তিনি আত্মহারা হয়ে গেছেন।
দ্বিতীয় স্তবক: গৌর পদে মন
নিবেদন
"আজ আমার গৌরপদে মন হরিল আর কিছু
লাগে না ভালো সদায় মনের চিন্তা ঐ; আমার সর্বস্ব ধন গৌরধন, সে ধন সাধন কিসে পাই গো তাই শুধাই ৼ"
- আজ আমার গৌরপদে মন হরিল: আজ আমার মন গৌরপদে (শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর চরণকমলে) সম্পূর্ণভাবে হরণ হয়ে গেল বা আবদ্ধ
হয়ে পড়ল।
- আর কিছু লাগে না ভালো: (ফলে)
পৃথিবীর আর কোনো কিছুই আমার ভালো লাগে না।
- সদায় মনের চিন্তা ঐ: সর্বদা
আমার মনের একমাত্র চিন্তা হলো সেই গৌরকে নিয়েই।
- আমার সর্বস্ব ধন গৌরধন: আমার সমস্ত ধনসম্পদ হলো সেই গৌরধন (গৌররূপী ধন)।
- সে ধন সাধন কিসে পাই গো তাই শুধাই: সেই ধন (গৌর প্রেম) আমি কোন সাধনার মাধ্যমে লাভ করব, হে সখী, আমি তাই জিজ্ঞাসা করছি।
তৃতীয় স্তবক: গৌর বিচ্ছেদের
আকুতি ও প্রার্থনা
"যদি মরি গৌর বিচ্ছেদ বানে গৌর নাম
শুনাইও কানে সর্বাঙ্গে লেখ নামের বই; এই বর দে গো সবে, আমি জনমে জনমে যেন ঐ গৌরপদে দাসী হই ৼ"
- যদি মরি গৌর বিচ্ছেদ বানে: যদি আমি গৌর (মহাপ্রভু) বিচ্ছেদের (বিরহের) বাণে (তীরে) আঘাতপ্রাপ্ত
হয়ে মারা যাই।
- গৌর নাম শুনাইও কানে: (আমার
মৃত্যুর পর) তোমরা আমার কানে শুধু গৌর নাম শোনাবে।
- সর্বাঙ্গে লেখ নামের বই: আমার সারা শরীরে (যদি সম্ভব হয়) যেন গৌর নামের বই লেখা হয় (অর্থাৎ
গৌর নামে আমাকে আবৃত করে রাখা হয়)।
- এই বর দে গো সবে: হে
সবাই, আমাকে এই বর (আশীর্বাদ) দাও।
- আমি জনমে জনমে যেন ঐ গৌরপদে দাসী হই: আমি যেন জনম জনম ধরে সেই গৌরপদে (গৌরচন্দ্রের চরণকমলে) দাসী হয়ে
থাকতে পারি। এটি ভক্তের চরম আত্মনিবেদন এবং পুনর্জন্মের আকাঙ্ক্ষা।
চতুর্থ
স্তবক: মনের আগুনের যন্ত্রণা ও লালনের আক্ষেপ
"বন পুড়ে তা সবাই দেখে মনের
আগুন কে-বা দেখে আমার রসরাজ চৈতন্য বৈ; গোপীর এমনি দশা, ও কি মরণ দশা অবোধ লালন তোর সে-ভাব কই ৼ"
- বন পুড়ে তা সবাই দেখে: বনের আগুন জ্বললে তা সবাই দেখতে পায় (বাহ্যিক কষ্ট)।
- মনের আগুন কে-বা দেখে: (কিন্তু)
হৃদয়ের বা মনের
আগুন (বিরহ যন্ত্রণা, প্রেমজনিত দহন) কে আর দেখতে পায়? (এটি
ভক্তের ভেতরের অব্যক্ত কষ্টকে বোঝায়)।
- আমার রসরাজ চৈতন্য বৈ: আমার রসরাজ চৈতন্য (আনন্দময়
চৈতন্য মহাপ্রভু) ছাড়া আর কেউ তা বোঝে না বা দেখতে পায় না।
- গোপীর এমনি দশা, ও
কি মরণ দশা: (প্রেমের কারণে) ব্রজের
গোপীদেরও এমনই দশা হয়েছিল, ও
কী মরণ দশা (মৃত্যুর সমান কষ্টদায়ক অবস্থা)।
- অবোধ লালন তোর সে-ভাব কই: হে অবোধ (নির্বোধ) লালন, তোর
মধ্যে সেই (গোপীদের মতো) ভাব বা প্রেম কোথায়? (লালন এখানে নিজের বিনয় প্রকাশ করে, নিজের প্রেমকে গোপীদের প্রেমের তুলনায় অপূর্ণ বলে আক্ষেপ করছেন)।
মূল বার্তা:
এই
গানটি শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভুর প্রতি
একনিষ্ঠ প্রেমের চরম প্রকাশ। ভক্ত
এখানে স্বপ্নযোগে গৌরকে দেখে আত্মহারা হয়েছেন এবং তাঁর প্রতি এমনভাবে আসক্ত
হয়েছেন যে জাগতিক কোনো কিছুই আর তাঁর কাছে মূল্যবান নয়। তিনি আমৃত্যু এবং
জন্মান্তরেও গৌর পদে দাসী হয়ে থাকার বর চেয়েছেন এবং গৌর বিচ্ছেদের গভীর মানসিক
যন্ত্রণাকে 'মনের আগুন' হিসেবে বর্ণনা করেছেন। শেষে লালন নিজেকে অবোধ বলে গোপীদের অতুলনীয় প্রেমের
সাথে নিজের প্রেমের তুলনা করে বিনয়ের সাথে আক্ষেপ করেছেন।